রাগের মাথায় জোরে জোরে নিরু বলল, ছাই করে! সব মেয়েই ওই সব বলে। কোনো মেয়েরই কোনো মনুষ্যত্ব নেই। তারপর একটু থেকে বলল, শুধু মা ছাড়া।
হঠাৎ কোত্থেকে এক টিপ জল এসে পড়ল নিরুর নাকে। নিরু ওপরে চেয়ে দেখল কালো মেঘগুলো আকাশের এক পাশ থেকে হাওয়ায় ভেসে মধ্যিখানে চলে এসেছে। জলের ফোঁটাগুলো বাড়তে থাকলেই বৃষ্টি হয়ে যাবে। আর তখন পায়রাটার বাসায় ফেরার কোনো পথ থাকবে না।
নিরুর বুকের ধুকপুকুনি ক্রমেই বাড়ছে। ঝিল্লি, দাদার পায়রা। দাদা ট্রেনিং দিয়ে ওকে এখানে-ওখানে পাঠায়। দাদার আইডিয়াই নেই নিরু ওর পায়রাকে দিয়ে প্রেমপত্র পাঠানো শুরু করেছে নন্দিনীদের বাড়ি। পায়ে চিঠি বেঁধে চিলেকোঠার ছাদে চড়ে নিরু ঝিল্লিকে নন্দিনীদের চারতলার বারান্দাটা দেখায়। মুখে আদর করে ডাকে, ঝিল্লি ! ঝিল্লি ! ঘাড়ে, মাথায় নরম করে হাত বুলিয়ে দেয়। তখন আরামে, আবেগে নানান রকম ধ্বনি করে ঝিল্লি। তারপর একটু হাত আলগা দিলেই পতপত করে উড়ে যায় উত্তর-পশ্চিম কোণে নন্দিনীদের বাড়ির নিশানায়। নিরু তখন স্পাইরাল সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে চিলেকোঠার ছাদ থেকে। আর ঢুকে পড়ে চিলেকোঠার ওর পড়ার জায়গায়। খুলে বসে পড়ার বই, যার ওপর শুধু চোখ ভাসে। কান দুটো একটু একটু গরম হয়, মন শুধু গোনে মিনিট, মিনিট আর মিনিট…
খুব রাগ হচ্ছে নিরুর। নাক থেকে ও বৃষ্টির জল মুছল না। ঝিল্লি না ফিরলে মার আছে কপালে ওর। আর ফেরেও যদি নন্দিনীর চিঠি নিয়ে পায়ে সটান দাদার হাতে তাহলে… উঃ! কী নিরু সে-দৃশ্য ভাবতেও পারছে না। তাহলে শুধু মার নয়, রীতিমতো লাঞ্ছনা আছে কপালে। নিরু আস্তে করে আলসে থেকে নেমে গুটি গুটি হেঁটে গেল চিলেকোঠার ঘোরানো সিঁড়ির দিকে। যখন কানে ভেসে এল বাড়ির পিছনে অ্যাংলো-ইণ্ডিয়ান মেয়ে লোরেনের ফ্ল্যাট থেকে গ্রামের আওয়াজ। গমগমে আওয়াজে এলভিস প্রেসলি গাইছে লাভিং ইউ, জাস্ট লাভিং ইউ।
নিরুর আর চিলেকোঠার ছাদে চড়া হল না। ও চিলেকোঠাতেই ঢুকে পড়ে পিছন দিককার জানালা খুলে আসন করে বসল। ওর ঘর অন্ধকার, কিন্তু লোরেনের ঘরের আলো ফ্যাটফ্যাট করে জ্বলছে। লোরেন একটা বড়ো টার্কিশ তোয়ালে জড়িয়ে জামা ইস্তিরি করছে গানের ছন্দে ছন্দে। একটু পরেই হয়তো তোয়ালেটুকুও খসিয়ে দেবে শরীর থেকে যদি টের পায় নিরু ওকে দেখছে। নিরুকে দেখিয়ে দেখিয়ে বেলি ডান্স কি স্ট্রিপ টিজ করা ওর বদভ্যাস। নিরু জানে সেটা। নিরু বিব্রত হয়। সব দেখে আরও বেশি করে অসভ্যতা করে ফিরিঙ্গিটা। নিরুর দিদি বলে লোরেন সুইন্টনের জীবনের উচ্চাকাঙ্ক্ষাই হল বিখ্যাত বেলি ডান্সার হওয়া। হয়তো হয়েও যাবে কোনো দিন। শুধু নিরুই জানে কত বড়ো বেহায়া ওই লোরেন। কত বড়ো অসভ্য ও। কিন্তু এখন নন্দিনীর ওপর রাগ করে নিরু চোখ ভরে দেখতে চাইছে ওই অসভ্য মেয়েটাকেই। ষোলো বছরের দুধ সাদা ওর পেলব ওই শরীর, ওই দুটো বুক, ওই কোমর, পা আর… লজ্জায় জিভ কাটল নিরু। মনে পড়ল সেদিনই কাকা বলছিল নিরুকে বোর্ডিঙে ভর্তি করে দেবে। অসভ্য ছেলে-মেয়েতে নাকি ভরে গেছে পাড়াটা। তাও তো কাকা নিরুর প্রেমপত্রের কথা জানে না! জানে না চিলেকোঠার পড়া করতে করতে কত খারাপ খারাপ জিনিস দেখে নিল নিরু! কাকা ভাবতেও পারবে না বাবা-মরা ছেলেটা সারাদিন একলা বসে বসে কত খারাপ খারাপ কথা ভাবে। হঠাৎ নন্দিনী, কাকা আর নিজের ওপর একই সঙ্গে অভিমান হল নিরুর। ও গজরাতে গজরাতে বলল, আমি খারাপ হয়ে যাব! আমি খারাপ হয়ে যাব! আমার কেউ ভালো করতে চেয়ো না। বলে খট করে জ্বালিয়ে দিল ঘরের বাতিটা। যাতে লোরেন টের পায় যে ওর একলা বালক দর্শক আসনে হাজির।
আলো জ্বলতেই লোরেন ঘাড় ঘুরিয়ে নিরুদের ছাদের দিকে তাকাল। ওর এক রাশ সোনালি চুলের পাপড়ি চোখের ওপর থেকে হাত দিয়ে পাশে সরিয়ে রাখল। একটা দুষ্ট, শয়তানি হাসিও হয়তো হাসল। তারপর গ্রামের দিকে সরে গিয়ে গানের আওয়াজ আরও জোর করে দিল। এলভিসের ‘জেলহাউজ বৃক’ গানটা গাঁক গাঁক করে চারপাশে ছড়িয়ে পড়তে লাগল। উত্তেজনা বোধ করে নিরু হঠাৎ করে বলেই বসল, হাই লোরেন! আই’ম হিয়ার! আর তখনই ঝাঁপিয়ে বৃষ্টি নামল।
বৃষ্টি নামলে খটখটাস খটখটাস করে কাঠের জানালা বন্ধ হওয়ার একটা চেনা শব্দ আছে এপাড়ায়। কিন্তু অনেকে দিনের গরমের পর আজকের এই প্রথম বৃষ্টিতে জানালা-টানালা সেভাবে বন্ধ হল না। নিরু নিজেও জানালা দেওয়ার কথা ভাবছে না। কিন্তু লোরেনই এগিয়ে এসেছে ওদের ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো টেনে দিতে। একই সঙ্গে সব জানালা আর দরজা। প্রথমে নীচের দরজার ভাগটা টেনে দিল মেয়েটা। তারপর জানালার অংশ টানতে টানতে নিরুর দিকে মুখ তুলে বলল, নিরু! ড্রপ ইন টুনাইট। ইটস মাই বার্থডে। তারপর ইস্তিরির টেবিল থেকে লম্বা সিল্কের গাউনটা তুলে ধরে বলল, মাই বার্থডে ড্রেস। ইজনট ইট বিউটিফুল? নিরু বলল, ইয়েস! কিন্তু বৃষ্টির ঝমঝমানিতে কিছু শোনা গেল না। নিরু সজোরে টেনে দিল ওর নিরিবিলি পড়ার ঘরের জানালার পাল্লা। তারপর ঘরের আলো নিভিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। যতক্ষণ না বৃষ্টি থামে।
কখন বৃষ্টি থেমেছে নিরুর হুঁশ নেই। জানালা-দরজার বন্ধ কুঠরিতে ওর হাঁপ ওঠার কথা, কিন্তু নিরু যেন নিরুর মধ্যেই নেই। রাগ হলে ছোটোবেলায় ফিট হয়ে যেত নিরু। তাই ভয়ে ভয়ে কেউ বড় একটা শাসন করে না ওকে। মার হাত ওঠে না ওর মুখের দিকে চাইলে। ঠিক যেন ওর বাবার মুখটি বসানো। নিরুর ওপর রাগ হলে কাকা চাকর-বাকরদের খামাখা গালিগালাজ করে। কিল, গাঁট্টা যা মারার দাদাই মারে। যে যখন নিরু ওর লাটাই ভাঙে কি পায়রাদের জ্বালায়। তখন রে রে করে দাদার দিকে ছুটে আসে চাকর চিন্তা, ভানু কি বড়োঠাকুর।
