হঠাৎ কপালে একটা মৃদু, নারী-করের স্পর্শ। আমি ধড়মড়িয়ে উঠে দেখি একটা ফুলছাপ ফ্রক পরা, সোনালি চুল তরুণী মেম। মুখ দিয়ে ফস করে বেরিয়ে গেল, হু আর ইউ? সুন্দর, লালিত্যপূর্ণ মেয়েলি কণ্ঠে উত্তর এল, অন হুজ গ্রেভ ইউ আর স্লিপিং। আমার হৃদপিন্ড উঠে এসেছে গলায়, তার মানে তুমি নেটালি ওয়েস্টন?
-হ্যাঁ।
–তার মানে তুমি মৃতা?
—হ্যাঁ।
–আ…মি…আ…মি কি কোনো দোষ করেছি?
—সামান্য একটু। আমার কবরে বসে অন্য মেয়ে নিয়ে ভেবেছ এতদিন।
—হ্যাঁ, হ্যাঁ, শেলির কথা ভেবেছি। ওকে যে আমি ভালোবাসি খুব…
—শি ইজ আ বিচ!
—এ কী অসভ্য কথা বলছ একটা ভালো মেয়ে সম্পর্কে?
—ভালো মেয়ে, মাই ফুট! তুমি তো সন্ধ্যেবেলা করে আসো। তার আগে বিকেল থেকে কত ছেলের সঙ্গে যে কত কী করে। সবার সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার ডেট করে। সবাইকে বলে আমার কবরে বসতে, এখানে বসলে নাকি তারা লুই ডিকোস্টা হয়ে যায়। তুমি জান, হু ইজ লুই ডিকোস্টা? হিজ মাই ওয়ান অ্যাণ্ড ওনলি লাভার। বাট হি বিট্রেড মি। বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল।
ভীষণ কৌতূহলে টান-টান হয়ে বললাম, কীরকম? নেটালি আমার কোল ঘেঁষে বসে বলল, ও ইংল্যাণ্ড পালিয়ে যেতে চেয়েছিল নাইট ক্লাবে গান গাওয়া ছেড়ে। বললাম, সে তো ভালো খারাপটা কী? ও ধরা-ধরা গলায় ফের শুরু করল, সেটা ঠিকই ছিল। সেই পর্যন্ত ঠিকই ছিল। কিন্তু ও প্যাসেজ মানি নিল একটা আমেরিকান সেলারের থেকে। বিনিময়ে চুক্তি করল শিপি চ্যাপকে একদিন থাকতে দেবে আমার সঙ্গে।
নিজের অজান্তেই আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেল, ও মাই গড। আর এই প্রথম লক্ষ করলাম যে, নেটালি ওয়েস্টন অসামান্য সুন্দরী। আমি সহানুভূতি জানাতে ওর কোমল, সুন্দর হাতটা নিজের হাতে নিলাম। ও মিষ্টি করে বলল, থ্যাঙ্ক ইউ। তারপর ফের শুরু করল—
ও আমেরিকান মরিলকে নিয়ে আর প্রচুর মদ, সিগারেট নিয়ে আমাদের ক্রিক লেনের বাড়িতে এল। খুব নাচলাম, গাইলাম আমরা। টোনি ব্লেনটের সামওয়ান এলস ইজ ইন ইওর আরমস টুনাইট’ গাইল লুই। আমি বুঝেছিলাম আমি খুব বেহেড হয়ে পড়ছি। লুই একটার পর একটা লাইট নিভিয়ে দিচ্ছিল। তারপর কখন যে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেল আমি জানি না। যখন ঘোর ভাঙল দিস ডার্টি অ্যামেরিকান ওয়াজ রেপিং মি। আমি শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে আটকাবার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু পারছিলাম না। হি ওয়াজ জাস্ট টু স্ট্রং।
এই সময় নেটালি কান্নায় ভেঙে পড়ল। ভাবতে পারি, যে ছেলেটিকে আমি প্রাণ দিয়ে ভালোবেসেছিলাম সে-ই আমায় তুলে দিল যার-তার হাতে। আমার জীবনের প্রথম লাভমেকিং হল রেপের মাধ্যমে।
আমি ক্রমাগত মাথা ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে বললাম, ইটস ব্যাড! ইটস অফুল! আই কান্ট ইমাজিন দিস।
নেটালি বলল, পরের দিন সকালে আমি মুখ ধুতে গিয়ে হাতের শিরা কেটে ফেললাম। নোট রেখে দিলাম, আমার মৃত্যুর জন্য লুই ডিকোস্টা দায়ী।
আমি ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠছিলাম। শেষে বললাম, আমি লুই ডিকোস্টা নই।
—আমি জানি। কিন্তু আমার কবরে, যে বসে প্রেমের কথা ভাবে সে-ই তখনকার মতো লুই।
—তুমি কি এখনও লুইকে ভালোবাসো?
–ভালোবাসতে-বাসতেই তো মারা গেছি, মৃত্যুর পর কি তা আর বদলায়?
—মৃত্যু কি কিছুই বদলে দেয় না?
–দেয়, কেবল ভালোবাসাকে ছাড়া।
আমি চুপ করে একটু ভাবলাম দার্শনিক পাস্কালের কথা— হৃদয়ের কিছু যুক্তি আছে যার তল পাওয়া যায় না। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করলাম, কোনো অনুশোচনা থাকলে মৃত্যুর পরও কি তা বহন করে যেতে হয়? নেটালি বলল, যদি না শুধরে নেওয়া যায়।
—কীরকম?
–যেমন ভালোবাসা থেকে দেহের মিলন কেমন হয় আমি জানলাম না।
—সেটা কি খুব বড়ো বেদনা?–খু-উ-ব!
—কিন্তু সে তো লুইকে ছাড়া সংশোধন করাও অসম্ভব।
নেটালি তার দুই দুধসাদা বাহুতে আমাকে আলিঙ্গন করে ঠোঁটে চুমু দিতে দিতে বলল, এখন তো তুমিই আমার লুই ডার্লিং। আমার সমস্ত অঙ্গে কী সুখ এখন, কত সুখ ছেয়ে আছে। মেয়েটার মধ্যেও। কত বিচিত্র সুন্দর ধ্বনি ওর মুখ থেকে। শুধু বলছে, আমাকে ভালবাসা দিয়ে মেরে ফেললো। আমি বলছি, আমাকে মারো। ও বলছে, আমাকে। আমি বলছি আমায়।
হঠাৎ শেলির কণ্ঠ দূরে কোত্থেকে, ‘অ্যাই গোয়ালা। অ্যাই রামু!’ আমি চোখ মেলে দেখি প্রত্যুষের আলোয় শেলি গোয়ালাকে ডাকছে ওর ওই সুরেলা, গেলাসের কাঁচভাঙা গলায়। হঠাৎ আমার দিকে চাইল। নেভি ব্লু সোয়েটার আর সাদা ট্রাউজার্সে ধুলো মাখামাখি হয়ে শুয়ে আছি নেটালি ওয়েস্টনের কবরে। মেয়েটা ঠিকই বলেছে, ওই জানালা দিয়ে আমায় চিনতে না পারা ওর ভণিতা। নিশ্চয়ই কাল সাঁট করে নিয়েছিল ঝুনুর সঙ্গে। ও আমাকে ওই জানালা দিয়ে দেখলে লুই ডিকোস্টা ভাবে। আমি এই পাথর থেকে ওকে দেখে কী ভাবি তা কি ও জানে? ওকে রেপ করারও প্রবৃত্তি আমার নেই এখন। আমি স্বর্গীয় প্রেম ও মিলনের স্বাদ পেয়েছি।
আমি কবর থেকে উঠে আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে হাঁটলাম।
লাভিং ইউ
সন্ধ্যে নেমে এল, নিরু ছাদের এক কোণে ঠায় বসে, কিন্তু ওর ঝিল্লি পায়রাটা এখনও ফিরে এল না। বুকের মধ্যে একটা ভয় দুপদুপ করছে নিরুর, টিপটিপ করে পাড়ার একেকটা বাড়িতে আলো জ্বলে উঠছে। কানে এখনও মাখামাখি হয়ে আছে খানিক আগে মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজের ‘হোঁ ও ও ও ও ও ও ও … আওয়াজটা। নিবু নিবু নীল আকাশের একটা পাশ মেঘে কালো হয়ে এসেছে। কাকা সকালে কাগজ পড়তে পড়তে বলেছিল, আজ রাতে বর্ষা নামবে। নিরুর খুব আহ্লাদ হয়েছিল তখন। অথচ এখন বৃষ্টির কথা ভেবে ওর কান্না পাচ্ছে। এই নিয়ে ওর তিন-তিনটে চিঠির উত্তর করল না নন্দিনী। যে কিনা শেষ চিঠিতেও কেঁদে-কঁকিয়ে লিখেছিল, তোমার চিঠির দেরি দেখলে আমার মরে যেতে ইচ্ছে করে।
