বুঝলাম ভুল বলেনি ছোকরা। গাড়ির থেকে নামতে নামতে শুনলাম ঝুনু অর্ডার দিচ্ছে বাচ্চুকে, গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করিসনি। এদিকে আমার হার্টের স্টার্ট বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কী বলব যদি হারামি বাপটাই বেরিয়ে এসে জিজ্ঞেস করে, কী চাই?
বেল দিতে একতলার দরজাটা অবিশ্যি খুলল শেলিই। একই সঙ্গে থমকে গেলাম দু-জনে আমরা। শেলিই প্রথম কথা বলল, কী ব্যাপার অরু? এতদিন পর, এত রাত্তিরে?
—আমি তো ভাবছিলাম এত রাত্তিরে তুমি দরজা খুললে…
—কেন, তোমার কি বাবাকে চাই?
—না না না না না। তোমাকেই।
–আমাকেই?
—হ্যাঁ, তোমাকে।
শেলি দরজার পাল্লা আর একটু হাট করে মেলে ধরে বলল, তাহলে এসো, ভেতরে এসো। আমি অগ্রপশ্চাৎ না ভেবেই বললাম, না না তুমিই বরং বাইরে এসো। ও বুঝল না ব্যাপারটা। বলল, সে কী! এই শীতের রাতে বাইরে দাঁড়িয়ে কথা বলতে হবে কেন? আর তুমি তো রীতিমতো কাঁপছ। তোমার কি ঠাণ্ডা লেগেছে?
-না, না, আমার গরম লেগেছে।
শেলি অবাক চোখে আমার দিকে চেয়ে রইল। আমি বললাম, তোমার সঙ্গে বাইরেই একটু দরকার।
শেলি তাও নড়তে চায় না।—আরে গায়ে চাদর নেই, আমার তো শীত করবে।
-শীত করবে না। আমি গাড়ির কাচ তুলে দেব।
এবার সত্যি সত্যি চমকে উঠেছে মেয়েটা।—গাড়ি! কার গাড়ি?
—ওই হল, একটা ট্যাক্সি।
–ট্যাক্সি? ট্যাক্সি কেন?
আর ওকে ধন্ধে রাখতে ইচ্ছে হল না। বলেই ফেললাম আসল কথাটা।
—তোমাকে কিডন্যাপ করব। ও কীরকম চুপ মেরে গেল। শেষে বলল, তোমার কি খুব টাকার দরকার? আমি লজ্জা বোধ করে বললাম, না, না তেমন কোনো ব্যাপার ঘটেনি। তোমার বাবাকে মিছিমিছি এর মধ্যে টানাটানি কোরো না। আমার…আমার…
—কী চাই?
–তোমাকে।
এবার অনেকটা সেই ঝুনুর ধারায় প্রায় মাথায় হাত দিয়ে দোরগোড়ায় বসে পড়ল শেলি। কী করো-না অরু, তুমি! এই সরল কথাটা অ্যাদ্দিন বলে যেতে পারলে না? এবার অভিমান এল আমার কণ্ঠে, কেন, সন্ধ্যের পর সন্ধ্যে ওই যে কবরের পাথরে বসে থেকেছি, একবারটি ভুল করেও ডেকেছ?
আমার কথা শেষ হয়নি, কিন্তু তোতলামি শুরু হয়ে গেছে শেলির। কী কী কী কী বললে? ওই কবরে বসে থাকা ছেলেটা তুমি?
.
-নয়তো কে? আজকেও তো বসেছি বাবলুদার সঙ্গে। বেশ তো বাবলুদাকে ডেকে কথা বললে, আমাকে দেখতেও পেলে না।
-আরে, আমরা তো ভাবতাম ওটা ওই অ্যাংলো মেয়েটার বয়ফ্রেণ্ড লুই ডিকোস্টা।
আমার মনে হল এটা পৃথিবীর চরম নিকৃষ্ট মিথ্যের একটা। এই নেভিব্লু,ফুল স্লিভস পুলওভার, আর এই সাদা ট্রাউজার্স তো পেটেন্ট করা পোশাক আমার। আমার গায়ের রং একটু ফর্সা ঠিকই তা বলে কোনো মতেই আমাকে অ্যাংলো ঠাওরানো উচিত না। আমি বললাম, এটা কেমন ধারা কথা তোমার শেলি? দেখছ আমাকে, আর ভাবছ আমি লুই ডিকোষ্টা।
শেলি প্রতিবাদ করল, আমি তোমাকে দেখে লুই ভাবছি এমনটা আবার হয় নাকি? তোমার চেহারা কি আমি এতই ভুলেছি। অগত্যা বললাম, ঠিক আছে, তুমি ওই জানলায় গিয়ে দাঁড়াও, আমি কবরটায় গিয়ে বসছি। দেখো তো ভুল ভাঙে কি না।
.
আমি কবরে গিয়ে বসলাম, শেলি জানালায় গিয়ে দাঁড়াল, তারপর দু-জনেই ফের ফিরে গেলাম ওদের বাড়ির দরজায়। শেলি মাথা নেড়ে বলল, না, আমি জানালা থেকে তোমাকে দেখিনি। ওই লুই ছোকরাকেই দেখলাম।
আমার শিরদাঁড়া দিয়ে হিমেল হাওয়া বইতে শুরু করল। আমি আমতা আমতা করে বললাম, আমার একটি বন্ধুকে তোমাদের জানালায় দাঁড়াতে দেবে? ও দেখে বলুক তো কাকে দেখছে। শেলি বলল, ঠিক আছে। আমি কুনুকে ডেকে ওর সঙ্গে পাঠিয়ে দিলাম, আর নিজে গিয়ে বসলাম ওই পাথরে।
এরপর ঝুনু নেমে এসে বলল, না রে, তোকে তো দেখলাম না। এই একই পোশাকে একটা অ্যাংলো ছেলে বসে আছে দেখলাম। তোর সঙ্গে অবিশ্যি মিল আছে চেহারার।
আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, পৃথিবীর অন্তত একটি জানালা দিয়ে দেখলে সামনের কবরে বসা বা দাঁড়ানো আমি আর অরুণ মুখোপাধ্যায় নই, কোথাকার এক অ্যাংলো ছোকরা মাত্র, যার নাম হয়তো লুই ডিকোস্টা। গা গুলিয়ে উঠছিল ঠিকই, তবুও নিজেকে সংযত করে শেলিকে বললাম, এর পরেও কি আমি তোমাকে নিয়ে পালাতে পারি? শেলি বলল, তার দরকার হবে না। তুমি কাল বিকেল পাঁচটায় এসো, আমি তোমার সঙ্গে বাবার কথা বলিয়ে দেবো।
—তোমার বাবার আমাকে পছন্দ হবে না।
–কেন?
–উনি ফিলোসফির লোক পছন্দ করেন না।
-তোমায় বলেছেন?
–আমি বুঝতে পারি।
-তাহলে সন্ধ্যে হলে ওই কবরে বোসো। আমি বাবাকে জানালা থেকে দেখিয়ে বলব ওই অ্যাংলো ছেলেটিকে বিয়ে করতে চাই। হি ইজ সো হ্যাণ্ডসাম।
—এটা কি পাগলামি না কি? এর চেয়ে তো পালিয়ে যাওয়াই ভাল।
–তারপর তো পালাব।
–মানে?
—মানে বাবা জানবে আমি অ্যাংলোর সঙ্গে পালিয়েছি, অ্যাংলো পাড়ায় পাড়ায় খবর নেবে। আর তুমি আমাকে লুকিয়ে রাখবে মাস কয়েক। তারপর …
আমার খুব ইজ্জতে লাগল। মনে হল শেলি আমাকে নিয়ে একটা ইয়ার্কি কেঁদেছে। ঠিক এই সময় দোতলায় ওর বাবার বিশ্রী, গম্ভীর চিৎকার শোনা গেল। শেলি ‘আসি বলে দোর এঁটে ছুটে গেল ভেতরে, আমি ট্যাক্সিতে ফিরে দেখি দিব্যি স্টার্ট বন্ধ করে ঝুনু আর বাচ্চু নিট হুইস্কি পেঁদাচ্ছে বোতলে মুখ লাগিয়ে। আমি ওদের বাড়ি চলে যেতে বলে নিজে ধীর পায়ে হেঁটে গেলাম নেটালি ওয়েস্টনের কবরে। রাত কত খেয়াল নেই, ক্লান্ত শরীরটাকে শুইয়ে দিলাম বরফ শীতল পাথরের ওপরে, মনে মনে বললাম, শেলি, আমার সব ভালোবাসাই তুমি মাটিতে মিশিয়ে দিলে এক দিনেই। এর চেয়ে এই পাথরে বসে তোমায় দেখাটাই ঢের ভালো ছিল। কত বদলে গেছ, সেয়ানা হয়েছ তুমি। কত নওছল্লা শিখেছ, এক কথায় রাজি হলে আমার প্রস্তাবে। আর আমি কিনা দু-বছর ধরে এই পাথরে বসে তোমার জন্য ধ্যান করছি। আমি তোমাকে না-পেয়ে, না-পেয়ে কিডন্যাপ করতে চাইছি, আর তুমি বললে বাবার সঙ্গে দেখা করো। ওইটা একটা বাবা! লেদ মেশিনের মতো কর্কশ গলা, জুয়াড়ি, মদ্যপ, কালোয়ার, হেটার অফ ফিলোসফি…
