শেলির কাছে বাপটি অবিশ্যি ভগবান। হেঁড়ে গলায় ইংরেজিতে খিস্তি করে পাড়া ঠাণ্ডা করে রাখে। লোহালক্কড়ের দালালি করে বলে মাঝে মধ্যেই বাড়িতে পার্টি দেয়। আমাকে রাস্তায় দেখলেই বলে, তুমি কোন কলেজে পড়? তোমার সাবজেক্ট কী? কিন্তু কখনো বাড়িতে যেতে বলে না। পাছে সুন্দরী মেয়ের সঙ্গে আলাপ হয়, রোমান্স হয়। লোকটা ভুলেই গেল যে ছোটোবেলায় কত গেছি ওদের বাড়ি, খেলেছি ওর মেয়ের সঙ্গে। হারামি লোক তো এদেরই বলে। এই বয়সেও কী সেয়ানা নজর ছেলে-ছোকরাদের ওপর।
যে-কবরের ওপর বসে আমি শেলির দর্শনের অপেক্ষায় থাকি সেটা একটা অ্যাংলো মেয়ের কবর। মাত্র উনিশ বছর বয়সে মারা গিয়েছিল। ফলকে নাম খোদাই করা আছে ‘নেটালি ওয়েস্টন’। শেলির অপেক্ষায় থেকে আমি নেটালির চেহারা কল্পনা করি। কখনো অড্রে হেপবার্নের মতো করে ভাবি, কখনো রোসানা পোডেস্টা, কখনো ‘সাইকে’-র জেনেট লিলি আবার কখনো স্রেফ শেলি! এতে অন্ধকারে বসার ভয় কিছুটা কমে আর সময়ও কাটে অপেক্ষাকৃত দ্রুত। তারপর সেই জানালায় এসে কারণে, অকারণে শেলি দাঁড়ায় এই সব কল্পনা, পরিকল্পনা নিমেষে উবে যায়।
শেলি কিন্তু জানেও না যে এই অন্ধকারে আমি ওর অপেক্ষায় থাকি। এইভাবেই বসে ছিলাম যখন, হঠাৎ একদিন বাবলুদা পাশ থেকে শর্টকাট করে যেতে যেতে বলল, এ কী, অরু যে! কী করছ এখানে অন্ধকারে? কাঁচুমাচু মুখে বললাম, বড় ভালো লাগে এখানে একলা নির্জনে বসতে। বাবলুদা অনুভূতিটা বুঝল হয়তো। বলল, সেটা ঠিকই বলেছ। কনভেন্ট পার্কেও তো তিষ্ঠবার জো নেই। যা প্রেমিক-প্রেমিকার ভিড়। তা তুমি কোথায় পড়ছ এখন, বললাম,
প্রেসিডেন্সি।
-কী নিয়ে?
—ফিলোসফি।
—বিউটি!
গানবাজনার মতো আরও একটা অবান্তর বিষয়ে যে কেউ লিপ্ত হয়েছে তাতে বেশ মনে বল পেল বাবলুদা। বলল, অন্য সাবজেক্ট পাওনি বুঝি? বললাম, পেতাম হয়তো, চেষ্টা করিনি।
–কারণ?
—কারণ আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে মরণের পরে মানুষের কী হয়।
–সেটা ফিলোসফি অনার্স পড়লে জানা যায় বুঝি?
—তা যায় না। তবে মন, সত্তা, মানুষ, জ্ঞান, বস্তু এইসব বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করা যায়।
বাবলুদা হুম বলে কিছুক্ষণ চুপ মেরে বসল। তারপর গুনগুনিয়ে একটা সুর ভাঁজতে শুরু করল। বেশ লাগছিল, জিজ্ঞেস করলাম এটা কী সুর করছ বাবলুদা? বাবলুদা চোখ বুজে গুনগুন করতে করতেই এক ফাঁকে বলল, খাম্বাজ। বড়ো প্রেমের সুর।
আজ ঠিক সেই মুহূর্তে ওর ওই জানালা থেকে গেলাস ভাঙা রিনরিনে গলায় শেলিকে ডেকে উঠতে শুনলাম, বাবলুদা! কেমন আছ? বাবলুদা মাথা হেলিয়ে বোঝাল-ভালো। মুখ বুজে কিন্তু সেই সুর ভেঁজে যাচ্ছে। আর আমার বুকটা একেবারে হিম হয়ে গেল। তার মানে আমি যে এখানে সন্ধ্যের পর সন্ধ্যে ডিউটি দিয়ে যাই তা সব দেখতে পায় ও! অথচ একদিনও মুখ ফুটে ডাকল না। নাকি ও আমায় চিনতেও পারে না।
একটু পর জানালা থেকে শেলি মিলিয়ে গেল, খাম্বাজ গাইতে গাইতে বাবলুদাও উঠে হাঁটা দিল, আর আমি অসহায়ের মতো অন্ধকারে নেটালি ওয়েস্টনের কবরের পাথরে ছুরি দিয়ে আঁচড়ে আঁচড়ে লেখা ‘শেলি’ নামগুলোতে হাত বুলোতে লাগলাম। বুঝলাম শরীরটা বেশ গরম হয়ে উঠেছে, ঘাড়ের দিকটা দরদর করছে। সোজা হাঁটলাম ঝুনুর বাড়ির দিকে, ততক্ষণে রাত দশটা।
ঝুনু দরজা খুলেই বলল, কী রে তুই? বললাম, একটা সাহায্য করবি?
—কী সাহায্য?
—শেলিকে ওর বাড়ির থেকে তুলব।
–তার মানে?
–কিডন্যাপ করব।
—কিডন্যাপ করবি? তুই!
–না তো কে?
–করে?
-রেপ করব।
ওরে শালা! বলে চৌকাঠেই বসে পড়ল পাড়ার উঠতি রংবাজ। এক হাত মাথায়, আরেক হাতে চৌকাঠ চেপে। অনেকক্ষণ পর মুখে কথা জোগাতে বলল, ব্যাটা তুই নাকি পাড়ার সোনা ছেলে। আর তোর তলে তলে এত? জানিস রেপ মানে কী?
—কারও ইচ্ছের বিরুদ্ধে যৌনসঙ্গম করা।
–ইচ্ছে-অনিচ্ছে সেকেণ্ডারি, আসল হচ্ছে সঙ্গম। তুই সঙ্গম করতে জানিস? চিৎকার করে উঠলাম, শাট আপ! আর রংবাজ ঝুনু সঙ্গে সঙ্গে চুপ মেরে গেল। খানিক পর বলল, কখন করবি? আজই? বললাম, এই মুহূর্তে। ও বলল, তা’লে দাঁড়া। মোটা বেল্টটা চড়িয়ে আসি।
রাস্তায় নেমেই ঝুনু বলল, ক্যাশকড়ি আছে তো কিছু? বললাম, কেন? ও বেশ অবাকই হল, আরে মরণ। বাচ্চুর ট্যাক্সিটা লাগবে না? এবার অবাক হয়ে আমি বললাম, ট্যাক্সি! ট্যাক্সি কীসের? রীতিমতো ঝাঝিয়ে উঠল ঝুনু, হাঁদা, তুই কি বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে রেপ করবি ভাবছিস? অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, তা ঠিক, তা ঠিক। তা বিশ-বাইশ হবে। ঝুনু আশ্বস্ত হয়ে বলল, ওতেই হবে। বাচ্চুকে পাঁচ টাকা ধরিয়ে দেব। গঙ্গার সাইডে ট্যাক্সি ভিড়িয়ে ওতে-আমাতে বিকে’র একটা পাঁইট চড়াব, পিছনের সিটে তুই যা করার করবি।
ঝুনু বর্ণিত সিনারিওটা মনে রগড়াতে রগড়াতে অর্ধেক আনন্দই যে উবে গেল। শেলিকে নিয়ে পিছনের সিটে আমি কী করব ওরা নিশ্চয়ই ব্যাকভিউ মিররে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখবে। শেলির লাল ঠোঁট, সাদা বুক, রেপ রেজিস্ট করার জন্য হাত-পা ছোড়াছুড়ি… সব! এই শেষের ব্যাপারগুলো মনে আসতে শরীরে মনে ফের বেশ জোর এল আমার। বললাম, আচ্ছা!
শেলিদের বাড়ির সামনে ট্যাক্সি হলট করতে ঝুনু বলল, যা ডেকে আন। আমি ফের একবার আশ্চর্য বোধ করলাম, আমি? তুই জানিস কতদিন যাবৎ আমার সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ নেই, কোন মুখে গিয়ে ডাকব? ঝুনু ওর স্বভাবমতো ফের একবার খেকিয়ে উঠল, তা আমার এই বিলা মার্কা খুমা দেখলে আদৌ বেরুবে? উলটে বাপ বেরিয়ে আসবে পাইপগান নিয়ে।
