শেরিল তো বটেই আমি নিজেও চমকে গেছি হঠাৎ ফসকে যাওয়া কথাটায়। আমার ভয় হল; এসব কী বলছি নিজের কোম্পানির চেয়ারম্যানকে নিয়ে?
শেরিল চমকে ছিল, কিন্তু পরক্ষণেই অন্য দিকে দৃষ্টি মেলে সামলে নিল নিজেকে। মেমরা কি এইভাবেই রাগ দমায়?
শেরিল বলল, তা হলে আজ সন্ধ্যায় এখানেই বিদায় জানানো যাক?
আমার বুকটা ধক করে উঠেছে। চোখের সামনে ভাসছে মুখার্জিদার মুখটা। ওর ছেলের জন্য কোনো চেষ্টাই করা হল না। বলব বলব করে ঠোঁট কাঁপছে, কিন্তু কোনো শব্দ হচ্ছে না। আমার চাউনিও লক্ষ্য হারিয়েছে। মদ কি এতই উলটোপালটা করতে পারে মগজ?
হঠাৎ শেরিল বলল, তুমি কিছু বলতে চাইছ, অপু।
অপু! অপু! শেরিল আমার নাম ধরে ডাকল? তা হলে ও রাগ করেনি নিশ্চয়। তা হলে তো আমি…
হ্যাঁ, বলেই ফেললাম—শেরিল…(ইচ্ছে করেই আর ম্যাডাম বললাম না)…শেরিল, আমাদের কোম্পানির একজন সিনিয়র পার্সন মিস্টার শশী মুখার্জি রিটায়ার করছে শীঘ্রই…
শেরিল বলল, আই সি…
বললাম, ওর ছেলেকে ফার্মে নেওয়ার জন্য কি চেয়ারম্যানকে বলা যায়?
শেষের দিকে আমরা গলাটা প্রায় ভেঙে এসেছিল লজ্জায় আর কিছুটা আত্মধিক্কারে। মুখার্জিদা আমাকে ইউজ করল নিজের ব্যক্তিগত স্বার্থে। সব শালাই সমান। আমিও এক ইডিয়ট, যে যা বোঝায় তাতেই নাচি। ছি! ছি! একটা অসাধারণ সন্ধ্যাকে কোথায় এনে ফেললাম!
আমি চোরের মতো চোখ তুলে চাইলাম মেমের দিকে। ও বলল, অপু দিস আই নেভার ডু। অফিসের কারও জন্য কোনো ফেভার আমি আদায় করি না আর্চির কাছে। এটা আমার নীতি নয়, আর ও-ও এটা একদম বরদাস্ত করতে পারে না। আর্চি বলে যে ওর আগের স্ত্রীদের এইরকম আবদার রাখতে ওকে অনেক অন্যায় করতে হয়েছে আগে। ওর সেসব ভালো লাগেনি। সো…।
শেরিল ওর মুখ-চোখের ভাষা আর দুই সুন্দর হাতের মুদ্রায় বুঝিয়ে দিল এ ব্যাপারে ওর কিছুই করার নেই। আমি কনিয়াকের গ্লাস টেবিলে নামিয়ে লজ্জিত স্বরে বললাম, আই আণ্ডারস্ট্যাণ্ড।
আমাকে হলের দরজা পেরিয়ে সিঁড়ির দরজা অবধি এগিয়ে দিতে এসেছে শেরিল। দরজাটা খোলার আগে সৌজন্যের সুরে বলল, সরি অপু। এরকম একটা অনুরোধ না করে অন্য কিছু বললে ভেবে দেখতে পারতাম।
সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে বললাম, শেরিল, এটা আমার কোনো অনুরোধই নয়। অফিসের একজন সিনিয়র লোক বলেছিল, তাই নিতান্ত বাধ্য হয়েই বলে ফেলেছি। এ আমি চাইনি। আমি চেয়েছিলাম, জান শেরিল, তোমার এই পরমাসুন্দর মুখটা আমার হাতের মধ্যে নিয়ে এই গোলাপি ঠোঁটে একটা দুটো তিনটে চারটে দশটা বিশটা ত্রিশটা এক-শোটা চুমু দিতে। যতক্ষণ না ওই গোলাপি ঠোঁট রক্তে লাল হয়ে যায়। তারপর তোমার গোটা শরীরটা জড়িয়ে ধরে তোমার বুক দুটো আমার বুকের মধ্যে পিষে ফেলে তোমার সমস্ত পোশাক ছিঁড়ে ফেলে তোমার নগ্ন শরীরে আমার সমস্ত কামনার জলছবি ছাপ ধরিয়ে তোমার মধ্যে লীন হয়ে গিয়ে…
—অপু! ইটস টেন। আর্চি যেকোনো মুহূর্তে এসে পড়বে। আমি চাই না দুপুরে ওই ব্যাটিং দেখার পর ও তোমার এই ড্রাঙ্ক চেহারা দেখুক।
-ইয়েস ম্যাডাম, ইয়েস। আই অ্যাম মেকিং আ ফুল অব মাইসেলফ। আমি এক্ষুনি চলে যাচ্ছি, ম্যাডাম। গুড নাইট!
শেরিল খুব উষ্ণভাবে ওর নরম হাতটা দিয়ে আমার হাতটা ধরল। কীরকম আবেগে জড়ানো কণ্ঠে বলল, খুব ভালো লাগল আজকের সন্ধ্যাটা। তোমার দুটো অনুরোধ রাখতে পারছি না। একটা রাখব, কথা দিচ্ছি।
আমি ওর চোখে চোখ রেখে প্রবল চাপ দিতে শুরু করেছি ওর হাতে। কথাটা বললেই ঝাঁপিয়ে পড়ব ওঁর ঠোঁটে, বুকে, শরীরে…
ও বলল, আমি আর্চিকে বলব মুখার্জির ছেলের চাকরির কথা। টেক কেয়ার। গুড নাইট!
আর্চি ম্যাকল্যারেনের বাড়ির গেটের বাইরে এসে আলিপুরের লম্বা, অন্ধকার রাস্তাটাকে উইকেটের সেই বাইশ গজ মনে হল। আমি আপ্রাণ ছুটছি সেঞ্চুরির শেষ রানটার জন্য, কিন্তু হতচ্ছাড়া সন্দীপ এক চুল নড়ছে না। এই একটি রানের জন্য আমার অনন্ত ছুট যেন শেষ হওয়ার নয়। শেরিলের ঠোঁটের এক বিঘত দূরে দাঁড়িয়ে পড়ে আমি রান আউট ৯৯।
রেপ
পৃথিবীর কোনো পুরুষেরই যেন দুর্ভাগ্য না হয়, যে তার প্রেয়সীর বাড়ি হল একটা কবরখানার উলটো ফুটে, মেয়েটির ঘরের জানালাও সেই কবরমুখো আর তাকে হাপিত্যেশ করে দাঁড়াতেই হয় কবরখানার এক কোণে। মানুষ যতই নির্ভীক হোক না কেন, একটা কবরের শীতল বেদিতে সন্ধ্যের পর সন্ধ্যে ভালোবাসায় ভেজা, দুরু দুরু বক্ষে শুধু একটা মুখের অপেক্ষায় বসে থাকা যে কী অস্বস্তিকর তা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব। অন্তত আমার ভাষায়।
শেলি কখন একবারটি জানালায় কুলফিওয়ালাকে ডাকবে, আমার সেই অপেক্ষা। তখন আমায় কুলফিওয়ালা হতে ইচ্ছে হয়। কবে, কোনদিন ফুচকাওয়ালাকে ডাকবে আমার সেই অপেক্ষা। একদিন ‘বিজু! বিজু!’ বলে বাড়ির ড্রাইভারকে ডাকতে লাগল, আর কী দমান দমে গেলাম। গাড়িওয়ালা মেয়েদের ভয়ানক দেমাক হয় দেখেছি, পদাতিক ছেলেদের ওরা বেশ করুণা করে লিফট দিতে চায়। আমার দুঃখটা বেশি। কারণ শেলির সঙ্গে যখন লোরেটোয় কিণ্ডারগার্টেনে পড়তুম তখন আমাদেরও গাড়ি ছিল। বেশ চকচকে ঝকঝকে অস্টিন অফ ইংল্যাণ্ড। শেলিদের মতো ভূতো কালো হাম্বার নয়। কিন্তু হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকে বাবা দেহরক্ষা করায় সে-গাড়ি চুলোয় গেছে। শেলির বাবা ইতিমধ্যে রেসে জ্যাকপট পেয়ে হাম্বার কিনেছে। একদম বাজে, জেলে যাওয়ার মতো লোক। কিন্তু গুণ একটাই–শেলির বাবা। কিছু কপাল না থাকলে এ মেয়ের বাপ হয় কেউ?
