আমি মনে মনে ওর বিছানা দেখছি। ওর পোশাক খুলে ফেলছি। ওকে আমার নিজস্ব ভেনাস করে এনেছি প্রায়…হঠাৎ শুনি শেরিল পড়তে শুরু করেছে কবিতাটা—
How do I love thee? Let me count the ways.
I love thee to the depth and breadth and height
My soul can reach…
একটু আগেই ও বলেছিল যে কবিতাটা প্রথম স্বামী এড্রিয়ান ছাড়া আর কারও জন্য পড়েনি। কিন্তু এই পাঠ শুনতে শুনতে কেন আমার মনে হচ্ছে এই পাঠ শুধু আমার জন্য…শুধু আমার জন্য?
আমি সিপ করছি হুইস্কিতে ঠিকই, কিন্তু মুহূর্তের জন্যও ওর মুখ থেকে চোখ সরাচ্ছি না। শেরিল পড়তে পড়তে বই থেকে চোখ তুলতেই আমার চোখ খুঁজে পাচ্ছে। শুধু কবিতা নয়, ও আমার সঙ্গে কমিউনিকেট করছে চোখের ভাষাতেও। আর আমি? আমি ওর প্রিয় কবিতাটির প্রতি তত ধ্যান দিচ্ছি না যতটা দিচ্ছি শেরিলের চোখ, ঠোঁট, কণ্ঠস্বর, সোনালি চুল, নরম হাত, উন্নত বুক…আমি মনের চোখে ফের ওকে বিবস্ত্র করছি…
কীরকম মনে হল?—হঠাৎ শুনি শেরিলের গলা।
—অপূর্ব!
—অপূর্ব! ইটস অ্যান এক্সপিরিয়েন্স। আই রিয়েলি মিন ইট।
আমার হঠাৎ খুব ইচ্ছে হল এগিয়ে গিয়ে শেরিলের মুখটা দু-হাতের মধ্যে নিয়ে একটা চুমো দেওয়ার। আমি হুইস্কির গ্লাসে শেষ চুমুকটা দিয়ে দাঁড়িয়েও পড়েছি। শেরিল বলল, তুমি কি ডিনারের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়লে? না না, একেবারেই না। আমি আপনার হাত ধরব ভাবছিলাম, টু থ্যাঙ্ক ইউ।
শেরিল ছোট্ট হেসে বলল, ব্যাস? আর কী বলতে?
আমার গলা আটকে এসেছে। সত্যি তো! হ্যাণ্ডশেক করে, থ্যাঙ্কস দিয়ে কী বলতাম? কী বলা উচিত? আই লাভ ইউ? আই উড লাইক টু কিস ইউ? লাভ মি শেরিল। আমার ভালোবাসো। তোমার ঠোঁট দাও। তোমার…
ক্রিং ক্রিং ক্রিং! চাপা স্বরে শেরিলের মোবাইলটা বেজে উঠল। কোথায় ছিল মালটা এতক্ষণ? দেখি সোফার পাশে ফেলে রাখা একটা ছোট্ট এরিকসন মোবাইল তুলে নিল শেরিল—হ্যালো! হ্যাঁ, বেশ কিছুক্ষণ। তোমার স্টাডিতে। হ্যাঁ, হুইস্কি। একটু কবিতা পড়লাম। দেরি। হবে? আমরাই ডিনার সারব? ফাইন। হ্যাঁ, দেখাব। বাই! লাভ!!
মোবাইলটা ক্লিক অফ করে শেরিল আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তোমার চেয়ারম্যান।
-সে তো বুঝতেই পারলাম।
—বলছিল তোমাকে আমার স্টাডিটা দেখাতে।
—আপনার স্টাডি এনি স্পেশিয়্যালিটি?
—গেলেই দেখতে পাবে।
এবার শেরিল এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে নিয়ে চলল ভিতরের দিকে ওর নিজস্ব স্টাডিতে।
মেহগিনি প্যানেল করা ছোট্ট স্টাডি, কোণে একটা ওয়র্ড প্রসেসর। বইয়ের তাকের সামনে, আশ্চর্য! ধূপবাতি জ্বলছে কয়েকটা। একি স্টাডি, না পূজার ঘর?
বইগুলোর আরও কাছাকাছি হতে দেখি যাবতীয় বই হয় শ্রীরামকৃষ্ণদেব নয়তো স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে। ক্রিস্টোফার ইশারউডের রামকৃষ্ণ অ্যাণ্ড হিজ ডিসাইপলস, রোম্যাঁ রোলাঁর দ্য গসপেল অব শ্রীরামকৃষ্ণ, সিস্টার নিবেদিতার দ্য মাস্টার অ্যাজ আই স’ হিম, স্বামীজির কমপ্লিট ওয়র্কস…
আমার গোটা দেহ শিরশির করছে। মেয়েটা কী? ওর কী ব্যাপার? মনে মনে ভাবছি এরপর কী জিজ্ঞেস করি? তাকিয়ে আছি বইগুলোর দিকেই, শুনি পাশ থেকে শেরিলের গলা —তুমি জিজ্ঞেস করছিলে না আমার সময় কাটে কী করে? এখন মনে হয় একটু আঁচ পাচ্ছ।
বললাম, হঠাৎ এই সব বই! আপনি কি গবেষণা করেন?
শেরিল বলল, না। এড্রিয়ানের মৃত্যুর পর জীবন যখন খাঁ খাঁ করছিল তখন একদিন আমার কাকার বাড়িতে আর্চির সঙ্গে দেখা। ওর তখন সদ্য স্ত্রীবিয়োগ হয়েছে। ও বলল ও একজন ভারতীয় দার্শনিককে পড়ছে। সোয়ামি ডিভেকানা। যোগ বিষয়ে ওঁর সব লেখা। ক দিন বাদে ও বেশ কয়েকটা বই এনে দিয়ে গেল আমাকে। আমি পড়তে পড়তে মুগ্ধ হয়ে বিভোর হয়ে গেলাম সোয়ামিজির রচনায়। যেদিন আর্চি ফের কলকাতায় চলে আসবে ছুটি শেষ করে, ওকে বইগুলো ফেরত দিতে গেলাম, শুনলাম ও এয়ারপোর্টের দিকে রওনা হয়ে গেছে। চলে গেলাম এয়ারপোর্ট, সেখানেই বই ফেরত দিলাম আর ও করল বিয়ের প্রপোজাল। আমি ওকে না বলতে পারিনি।
কী করে, কী করেই যেন গোটা পরিবেশটাই বদলে গেল। কী বলতে চাইছি, আর কী বলে বসছি বুঝেই উঠতে পারছি না। শেষে তৃতীয় ড্রিঙ্কের শেষে কীরকম নীরব হয়ে গেলাম আমরা। সেইভাবেই ডিনার শেষ হল। ডিনারের পর দু-জনে দুটো কনিয়াক নিয়ে ফের আর্চির বড়ো স্টাডিটায় গিয়ে বসলাম। শেরিল কাঠের বাক্স থেকে একটা ডাভিডফ সিগার বার করে ধরিয়ে দিল আমাকে। কনিয়াকের উষ্ণ আমেজ মাথায় ছড়াতে আমার মনে পড়তে শুরু করল মুখার্জিদার সব টিপস। ছেলের চাকরি। মেমকে বিছানায় নেওয়ার পরামর্শ। আমি একগাল চুরুটের ধোঁয়া ছেড়ে সোজা হয়ে বসলাম। রাত সাড়ে নটা। সময় বেশি নেই। যা করার এখনই মুখার্জিদার ল্যাঙ্গোয়েজে—ডু অর ডাই।
লম্বা নিস্তব্ধতা ভেঙে বললাম, আমার চেয়ারম্যানের মধ্যে তা হলে একটা আধ্যাত্মিক দিকও আছে।
শেরিল ঘাড় নাড়ল, নট রিয়েলি। ওর যখন যেটা ভালো লাগে তখন সেটা নিয়ে মশগুল হয়ে থাকে কিছুদিন। তারপ সব ছেড়েছুড়ে একেবারে অন্য রাস্তায়।
কোনো পার্মানেন্ট প্যাশন নেই বলছেন?—জিজ্ঞেস করলাম।
আছে, এই ক্রিকেট আর সন্ধ্যের মোদো আচ্ছা, বলল শেরিল। ওর গলায় কি একটা ক্ষোভ ধরা দিল?
বাজিয়ে দেখার জন্য একটা ঢিল ছুড়লাম—আপনার কি মনে হয় উনি যথেষ্ট মূল্য বোঝেন আপনার? আই মিন…আই মিন…ডাজ হি ডিজার্ভ ইউ?
