দেখি শেরিল আমার নিয়ে এসে বসাল স্টাডিতে। দেওয়াল জুড়ে চামড়ায় বাঁধানো থাক থাক বই। এক কোণ থেকে হুস হুস করে নামছে স্লিট এয়ারকণ্ডিশনারের ঠাণ্ডা, মিষ্টি হাওয়া। দেখছি এদেশে শীতেও এসি লাগে সাহেব-মেমদের। আমি এটিকেট বজায় রাখতে বললাম, আপনার স্টাডিরুমটি অপূর্ব।
শেরিল খুশি হয়ে বলল, বলছ? তবে এটা আমার নয়, আর্চির স্টাডি। দেখো টেবিলে ওর সব স্যুভেনির। বয়সকালে ও-ও কিছু ক্রিকেট খেলেছে ইংল্যাণ্ডে। আর ওর খুব গর্ব যে ওর নাম হুবহু মিলে যায় অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটিং গ্রেট আর্চি ম্যাকল্যারেনের সঙ্গে। আর জান তো ইংল্যাণ্ডে ছেলেবেলায় ওর প্রাণের বন্ধুটির কী নাম ছিল?
জিজ্ঞেস করলাম, কী নাম?
সে ছেলে জীবনেও ক্রিকেট খেলেনি, পরে নামকরা বটানিস্ট হয়েছিল। নাম ডোনাল্ড ব্র্যাডম্যান!
অসম্ভব আমোদ বোধ করে আমরা দুজনেই এবার হা হা হি হি করে হাসতে শুরু করলাম। আর তখন বেয়ারা মৃদু নক করে ঘরে ঢুকে জিজ্ঞেস করল, ম্যাডাম ড্রিঙ্কস?
ওহ হো! আমি তো তোমায় ড্রিঙ্ক অফার করতেই ভুলে গেছি। আমার দিকে চেয়ে বলে উঠল শেরিল। বলো, বলো, তোমায় কী অফার করব? ওর গলায় দারুণ উত্তেজনা।
আমি বললাম, আপনার ড্রিঙ্ক?
—আমি একটা জিন অ্যাণ্ড টনিক নেব।
—আমি একটা হুইস্ক-সোডা পেলেই খুশি হব।
শেরিল বেয়ারাকে বলল, সাবকো এক স্কচ অ্যাণ্ড সোডা। মেরা জো ইউজুয়াল।
বেয়ারা চলে যেতে বললাম, আমার চেয়ারম্যান কোথায়? তাঁকে দেখছি না।
শেরিল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ওয়েল, টুডে ইজ স্যাটার্ডে। তোমার চেয়ারম্যানের ক্লাব নাইট।
তা হলে আপনি আমার জন্য বাড়িতে থেকে গেলেন।
শেরিল সঙ্গে সঙ্গে প্রোটেস্ট করল, ওহ, নো, ডিয়র। আই অ্যাম অফুলি টায়ার্ড অফ ক্যালকাটা ক্লাব। একই মুখ, একই বাজে বকবক, একই রকম মদ গেলা। আর, ডোন্ট মাইণ্ড মাই সেয়িং ইট, কী খারাপ ইংরেজি বলে ক্যালকাটার ব্যবসায়ীরা। আমি জানি না আর্চি কী করে ওই ইংরেজি সহ্য করে দিনের পর দিন। আমার তো মনে হয় আমি ইংরেজি ভুলেই যাব ওদের সঙ্গে থাকলে। শুনেছিলাম তোমাদের ফিলম ডিরেক্টর সটিয়াজিট রে অসম্ভব ভালো ইংরেজি বলতেন। কিন্তু আমি এসে ওঁকে পাইনি, উনি নার্সিংহোমে ছিলেন আর সেখানেই মারা গেলেন। পরে টিভিতে ওঁর ইংরেজি শুনে মুগ্ধ হয়ে গেছি।
বেয়ারা ড্রিঙ্ক বানিয়ে দিয়ে চলে গেল। আমরা নিজের নিজের গ্লাস তুলে চিয়র্স করলাম। আমি বললাম, তা হলে কী করে সময় কাটে বাড়িতে?
শেরিল একটু অবাক হল যেন—কেন, এত বই দেখছ। আমার রেকর্ড, সিডি আছে কয়েক হাজার। আমি পিয়ানোও বাজাই একটু-আধটু। আর এখন তো সারাবছর ক্রিকেট লেগে আছে। আমি শচীন তেণ্ডুলকরের ব্যাটিং দেখি, যখন যেখানে খেলে।
আমি ভিতরে ভিতরে খুব অবাক হচ্ছি, আর খুশিও হচ্ছি। আমার উঠে গিয়ে হাত ধরতে ইচ্ছে করছে শেরিলের। অথচ বসে আছি উলটো দিকের সোফায়। কাজেই একটা মুড নিলাম। হুইস্কিতে দুটো বড়ো চুমুক দিয়ে উঠে গিয়ে দাঁড়ালাম বইয়ের তাকের সামনে। বুঝতে পারছি না কী বই খোঁজা উচিত আমার। তবু একটা রিস্ক নিলাম; বললাম, আপনার এখানে এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং-এর সনেট আছে?
হোয়াট! এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং? শি ইজ মাই ফেভারিট পোয়েট আফটার জন ডান অ্যাণ্ড জেরার্ড ম্যানলি হপকিন্স!—পুলকিত বিস্ময়ে ফেটে পড়ছে শেরিল।
আমি মনের ভিতর শুনতে পেলাম মুখার্জিদার উল্লাস, হুররে! মার দিয়া ছক্কা! চালিয়ে যাও অপু! বেড় হার! বেড হার! সেঞ্চুরি!
শেরিল উঠে এসে আমার সামনের এক ব্ল্যাক থেকে বার করে ফেলল এলিজাবেথ ব্যারেট ব্রাউনিং, আর আমার হাতে লেদারবাউণ্ড ভল্যুমটা দিয়ে বলল, হিয়র!
আমি একটু অপ্রস্তুত হওয়ার ভাব করে বললাম, না, না, আমাকে কেন? আমি আপনার মুখে একটু ওঁর কবিতার রিডিং শুনতে চাই।
শেরিল অবাক হল, আমার রিডিং? কেন? বললাম, আমার হলে তো আপনাকেই উৎসর্গ করতাম। আপনি না হয় একটা রিডিং অফার করুন আমাকে।
আমার চালটা পছন্দ হয়েছে শেরিলের। বলল, দ্যাটস আ গুড ডিল। ঠিক আছে, পছন্দ করো কোনটা পড়ব।
আমি ঝটপট পাতা উলটে যেটা বার করে দিলাম তাতে ওর নীল, সামুদ্রিক চোখে যেন ঢেউ ওঠা শুরু হল। অনেকক্ষণ ধরে জিন অ্যাণ্ড টনিকটা খেতে খেতে চেয়ে রইল আমার দিকে। আমি নীরবে দৃষ্টি ফিরিয়ে দিতে দিতে হুইস্কি খেতে থাকলাম।
খানিক পর শেরিল নিজেই দুটো ড্রিঙ্ক তৈরি করল দু-জনের জন্যে। আমরা নতুন করে পানীয়ে চুমুক দিলাম। শেরিল বলল, আমার প্রথম স্বামী এড্রিয়ানের ওই কবিতাটা পছন্দ ছিল খুব। আমি আর কারও জন্য কখনো এটা পড়িনি।
জিজ্ঞেস না করে পারলাম না, কী হয়েছিল এড্রিয়ানের।
শেরিল গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে প্রায় অন্যমনস্কভাবে বলল, ফকল্যাণ্ডস যুদ্ধ থেকে ফেরেনি ও। শুধু ওর প্রিয় ক্যাসেটটা ফিরে এসেছিল, বিটলসদের ‘আই ওয়ন্ট টু হোল্ড ইয়োর হ্যাণ্ড।
আমার মনে হচ্ছে আমি আনন্দে, বিস্ময়ে এক্ষুনি মরে যাব। ঈশ্বর জানেন কেন আমি আজ আফটারশেভ মাখতে মাখতে, টাই বাঁধতে বাঁধতে গুনগুন করে গেয়ে উঠেছি আমি ‘আই ওয়ন্ট টু হোল্ড ইয়োর হ্যাণ্ড।
আমি জওহরলাল নেহরুর ভাষায় নিজেকে বলতে শুরু করেছি ভিতরে ভিতরে, ‘দিস ইজ মাই ট্রিস্ট উইথ ডেস্টিনি। শেরিলের সঙ্গে আজকের এই সাক্ষাৎ নিয়তির রচনা। এ হতই, এ ললাটলিখন। আবার পরে পরেই কানে ভেসে উঠছে মুখার্জিদার টিপস, বেড় হার, অপু। বেড হার।
