বলতে নেই, আজ যে মেমের হাত এতক্ষণ চেপে ধরেছিলাম তার অনুপ্রেরণা কিন্তু মুখার্জিদার ওই সব বেমক্কা টিপস। না হলে আমি যে-অপু সেনগুপ্ত কলেজে, ইউনিভার্সিটিতে এক দন্ডের বেশি দু-দন্ড কোনো মেয়ের চোখে চোখ রাখতে পারলাম না, দাদার সুন্দরী শালিটাকে সিস্টেম্যাটিক্যালি প্রপোজ করতে পারলাম না, সেই আমি কী করে এক চেয়ারম্যানের গিন্নির হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম অতক্ষণ। কে জানে কেন কী ভেবে এগিয়ে গেলাম একটার পর একটা চার-ছক্কা হেঁকে। মনের কোনো অন্তস্থল থেকে কে যেন আশ্বাস জোগাচ্ছিল, মেমকে তুই পেয়ে গেছিস। এগিয়ে পড়। নো ব্যাকফুট। ওনলি কভার ড্রাইভ। দিস ওম্যান ইজ ফর ইউ। শি ইজ ইয়োর্স। ইয়োর সেঞ্চুরি।
আমি ভাবতে ভাবতে নিজের মধ্যে ডুবে গিয়েছিলাম। চটকা ভাঙল মুখার্জিদার আলতো টোকায় শোন অপু, তুই জানতে চাচ্ছিলি তোকে বাজির ঘোড়া ধরেছিলুম কেন। তাই তো?
মুখার্জিদা আমাকে তুমি করেই বলে, এখন দেখছি খুব স্নেহের সঙ্গে ‘তুই’ করে বলছে।
আমার বেশ উষ্ণতা জাগল ওর প্রতি। বললাম, বলো।
মুখার্জিদার মুখটা কীরকম কান্নায় ভেঙে পড়ছিল। হাতের সিগারেট অ্যাশট্রেতে ঠুসে দিতে দিতে বলল, ছোটন বোস, রাজা চৌধুরিকেও টিপস দিয়েছিলুম। মই পেয়ে সড়সড় করে উপরে চড়ে গেল, এই মুখার্জিদার জন্যে কিসসু করলে না। তুই একটু দেখিস আমাকে বাপু।
মনে মনে ভাবলাম, তা হলে এই অভিসন্ধিতেই আমার উপর বাজি ধরা, টিপস সাপ্লাই? ঘোড়েল লোক তুমি চাঁদু।
মুখে বললাম, আমি আর তোমার কী করব? তোমার চাকরির আয়ু তো ছ-মাস। এক্সটেনশন চাও? সে তো এ কোম্পানিতে রদ হয়ে গেছে চার বছর হল।
মুখার্জিদা ফের সিগারেট ধরাল—সে কি আর জানিনে অপু? সে আমি চাইও না। তুমি
শুধু ডিনারের এক ফাঁকে আমার বড়ো ছেলেটার জন্য মেমকে একটু বোলো। যা হোক। একটা ক্লেরিকাল লেভেলে যদি নিয়ে নেয়। এতদিন সার্ভিস দিলাম কোম্পানিকে, এইটুকু কি আশা করতে পারি না, বল? কিন্তু আমাদের হয়ে বলবেটা কে? যত্তো হালফিলে এগজিকিউটিভ শুধু নিজেদের জন্য সাহেবদের কানে ফুসফাস করছে। কাজের নামে লবডঙ্কা। টাই-সুট পরে করিডোর দিয়ে দৌড়োচ্ছে সারাক্ষণ। ফাইলে গন্ডা গন্ডা ভুল ছাড়ছে, আর আমাকে বলছে মেরামত করে দিতে। তুই তো জানিস এসব।
একেবারেই মিথ্যে বলেনি মুখার্জিদা। কোম্পানির এই নতুন এগজিকিউটিভ ব্রিড অতি খাজা, মুখেই জগৎ মারছে। যা সব দেখেশুনে আমি নিজেও মেমের হাত ধরার লাইন নিইনি কি? যদ্দেশে যদাচার। ইংরেজি সাহিত্যের একনিষ্ঠ ছাত্রকে রাস্তা ধরতে হয়েছে ক্রিকেটের। দর্শনের বিশ্রুত অধ্যাপক বাবা জীবিত থাকলে হয়তো বারকয়েক ঘাড় নেড়ে বলতেন, অপু, ইটস নট ক্রিকেট। এটা ঠিক নয়।
আমিও ঘাড় নাড়লাম, তবে হ্যাঁ’ বোঝতে। বললাম, তুমি ভেবো না মুখার্জিদা, আমি সুযোগ একটা জুটিয়ে নেবই, আর বলে দেব তোমার ছেলের কথা।
মুখার্জিদা আমার হাত দুটো ধরে গদগদ স্বরে বলল, আমি জানি। তোর পরিবারের কথা তো শুনেছি। বিশেষ করে তোর বাবার কথা। তোর ভালো হোক, অপু।
আমি বিয়র শেষ করে উঠে পড়লাম। মুখার্জিদার অফার করা একটা সিগারেট ধরিয়ে।
বিকেল চারটে থেকে সাড়ে ছটা যে কী করে বেজে গেল আমি টের পাইনি। মাঠ থেকে সটান বাড়ি এসে মার হাতে ট্রফি দিয়ে স্নানে ঢুকেছিলাম। একটু উষ্ণ জলে স্নান সেরে হুসহুস করে পাউডার ঢাললাম সারাদেহে। তারপর খুড়তুতো ভাই পিন্টুদার বিলেত থেকে এনে দেওয়া মসিয়ূর রশা ওদ তোয়ালেৎটা গালে এবং ঘাড়ে ভালো করে চড়ালাম। তারপর পুজোয় কেনা আকাশি নীল রঙের জন মিলার শার্ট আর ধূসর জিনসটা পরলাম। তারপর মেরুন রঙের টাই একটা গলায় ফাঁসিয়ে ভ্যান হয়সেনের মিডনাইট ব্লু ব্লেজারটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়ালাম। এক নাম না জানা সুখ তখন পাখা মেলেছে মনের ভিতর। গুনগুন করে ভাঁজছি তখন বিটলসদের সেই চিরনতুন গান ‘আই ওয়ন্ট টু হোল্ড ইয়োর হ্যাণ্ড। কখন মা একবাটি বোঁদে নিয়ে পাশে এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল নেই, ঘুরে গিয়ে ওঁর গালে চকাস করে একটা চুমু খেয়ে দিলাম। মা অবাক হয়ে গিয়ে বলল, এই যে বললি সেঞ্চুরি মিস করেছিস! তাও এত ফুর্তি।
বললাম, সেঞ্চুরির গুলি মারো মা। আমি ম্যান অব দ্য ডে। আজ আমিই রাজা।
মার ধন্ধ আরও বেড়েছে–তার মানে?
তার মানে আজ আমি যা চাইব তাই পাব।
তা তুই কী চাইছিস শুনি?
আমি চামচে করে ঝটপট কয়েক স্ট্রোকে বোঁদেগুলো উড়িয়ে দিয়ে বললাম, স্বর্গ!
যখন আলিপুর রোডে চেয়ারম্যান আর্চি ম্যাকল্যারেনের বাড়ির গেটে এসে আমার বিজনেস কার্ড দেখিয়ে ঢুকছি তখন মার বড়ো বড়ো বিস্ফারিত চোখ আমার মনের চোখে ভাসছে।
যখন বাড়ির হলের সামনে কাচের মস্ত দরজার কাছে এসে দাঁড়িয়েছি তখনও সেই চোখজোড়া আমার মনের চোখে। হঠাৎ ঘোর কাটল দুপুরে শোনা সেই সুরেলা কণ্ঠের ডাকে, হ্যাল্লো ডিয়র! ইউ আর জাস্ট অ্যাজ পাংচুয়াল অ্যাজ আ স্পোর্টসমান। ইটস জাস্ট সেভেন
বলতে না বলতেই হলের গ্র্যাণ্ডফাদার ক্লকে পেল্লায় এক ঢং পিটিয়ে সাড়ে সাতটা বাজল। শেরিল ওর ওই অপূর্ব ডান হাতটা দিয়ে আমার গন্ধে ভরপুর ডান হাতটা ঝাঁকিয়ে আমাকে নিয়ে চলল ভিতরের দিকে। আমিও সেট, হ্যাণ্ডশেক শেষ হতেই ওর বাঁ-হাতটা ধরে ফেলেছি। এ জিনিস ছাড়তে আছে, বাব্বা:। সাক্ষাৎ স্বর্গের মই। আমি একটু চাপও দিচ্ছি হাতে। আহা, কী সুখ!
