ময়ূখ ওই চুমুটাই খাচ্ছিল আমার হাতে যখন মিডলঅর্ডার ব্যাট চন্দন এসে একটা নতুন বিয়রের মাগ ধরল ঠোঁটে। আমি বিয়র গিলতে গিলতে শুনলাম বলছে, শালা, বাঁচালি! আমি তো আজ বেড়িয়ে কাত! নে, এই কালীঘাটের সিঁদুর মাখানো রুপোর টাকা, তোর কাজে আসবে।
ও টাকাটা টুপ করে ফেলে দিল আমার বুক পকেটে।
আমি এবার ময়ূখ, চন্দন, রাকেশ, আনন্দ, প্রভুদের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে বারের এক কোণে গিয়ে বসলাম। আর তখনই খেয়াল হল ম্যান অব দি ম্যাচ ট্রফিটা সেই যে মাটিতে নামিয়ে ছিলাম সেটা সেখানেই পড়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে লাফিয়ে উঠে আনতে যাব, দেখি সেটা পরমযত্নে বুকে করে আমার জন্য বয়ে আনছে মুখার্জিদা!
আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই হুংকার দিয়ে উঠল, বলিহারি ভায়া! যার জন্য বাইশ গজের মধ্যে অত ছোটাছুটি সেইটিই ময়দানে ফেলে চলে এসেছ। বলি মেমসাহেবের হাতের ছোঁয়া পেয়ে আদত জিনিসটাই ভুলে মেরে দিলে?
ইশ! হেঁকেমেকে এসব কী বলছে মুখার্জিদা? মেমসাহেবের ছোঁয়ামোয়া শুনলে বলবে কী লোকে? ওর হাত থেকে ট্রফিটা নিয়ে বললাম, তোমার মুখের কি কোনো আগল নেই মুখার্জিদা? কে কোত্থেকে কী শুনবে।
মুখার্জিদা একটা গোল্ডফ্লেক ধরিয়ে আমায় পাশের চেয়ারে বসে গলা নামিয়ে বলল, কে আর কী বলবে? সবাই তো সেব দেখলে।
আমি ত্রাসের সঙ্গে বলে উঠলাম, কী দেখল সবাই?
মুখার্জিদা একটা লম্বা রিং ভাসিয়ে বলল, কেন, ওই মেমের হাত ধরে চটকাচটকি।
-ইশ, কী যে বল না তুমি।
—আমি আবার কী বলি? যা দেখি, তাই বলি।
—তোমরা দেখছি এবার আমার চাকরিটাই খাবে।
—চাকরি খাবে! কে? একবার মেম যার হাত নিয়ে খেলেছে, ক্ষমতা আছে সাহেবের তার চাকরি খাওয়ার?
আমি লজ্জায় পড়ে বললাম, যাঃ! কী যে বল না!
জোরসে ধোঁয়া গিলল মুখার্জিদা। তারপর ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, এ আপিসে ছত্রিশ বছর হল আমার, যা বলছি শুনে যাও। এ মেম তো চতুর্থ পক্ষ, আমার সামনেই এক-একটা এল আর গেল। এর আগে কোনো গিন্নির এ খাতির দেখিনি। বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা কিনা। জানবে এই মেমই তোমার মই। অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেছ?
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেছি—কীসের অ্যাপয়েন্টমেন্ট?
—অ্যাপয়েন্টমেন্ট, অ্যাপয়েন্টমেন্ট। কীসের আবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট?
—ব্রেকফ্রাস্টের হতে পারে, লাঞ্চের হতে পারে, স্রেফ ড্রিঙ্কসের হতে পারে? হয়েছে?
—বেশ গর্ব হচ্ছে এ বার আমার। বলেই ফেললাম, হ্যাঁ, হয়েছে।
–হয়েছে? এবার স্তম্ভিত মুখার্জিদা। কীসের হল শুনি?
ছদ্ম নিরাসক্তির ভাব দেখিয়ে বললাম, ডিনারের।
আর যায় কোথায়। টিটোট্যালার মুখার্জিদা উত্তেজনার বশে আমর বিয়রের মাগ তুলে সপাসপ তিন ঢোক মেরে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, সেঞ্চুরি! সেঞ্চুরি!
আমি লাফিয়ে উঠে ওর মুখে তালু চাপা দিয়ে বললাম, চুপ! চুপ! মুখার্জিদা। মুখার্জিদা এবার তৃপ্তির শ্বাস ফেলে বলল, এই আমার থার্ড ভিক্টরি।
বললাম, তোমার ভিক্টরি মানে?
মানে প্রথমবার ছোটন বোসকে টিপস দিয়েছিলাম সাহেবের দ্বিতীয় গিন্নির বেলায়। সে কোন টং-এ উঠে গেছে দেখতেই পাচ্ছ। কমার্শিয়াল ম্যানেজার। সেকেণ্ড কেস রাজা চৌধুরি, এখন লণ্ডনে পোস্টেড। ওই একই মই। এই চতুর্থ পক্ষটি কেমন হবে অ্যাদ্দিন ঠাহর করতে পারছিলাম না। বড় সুন্দরী, বডড হাই ক্লাস। তার উপর নাকি ইংল্যাণ্ডের ক্রিকেটারদের সঙ্গে মাখামাখি ছিল। তাই তোমার খেলার সুনাম শুনে তোমার উপরই বাজি ধরলাম।
মনে হল অ্যালান ডোনাল্ডের বাম্পার গেল কানের পাশ দিয়ে। কী আবোলতাবোল বকছে মুখার্জিদা দু-ঢোক বিয়র টেনে। বললাম, আমার উপর আবার কী বাজি ধরলে মুখার্জিদা?
কেন, কোয়ার্টার ফাইনালে গন্টারমান অ্যাণ্ড পিপার্সের এগেনস্টে তোর ব্যাটিং দেখতে এসে ওই তিপান্ন নট আউট দেখে বলে যাইনি তুই আমার বাজির ঘোড়া?
-বলেছিলে বুঝি? আমি মনে করতে চেষ্টা করলাম।
—মনটা কোথায় থাকে তোমার, তেণ্ডুলকর। স্পন্সরশিপে সই করে বেড়াচ্ছ বুঝি সর্বক্ষণ!
-খেলার মাঠ আর অন্য কী সব খেলাটেলা, মইটইয়ের কথা বলেছিলে মনে আছে। তা বলে বাজি…
পথে এসো খোকা, পথে এসো। সব মনে পড়বে।
বললাম, সে যাকগে। ব্যাপারটা কী খুলে বলো। অত পেঁচিয়ে বলার দরকার নেই।
মুখার্জিদা দুটো দুর্ধর্ষ রিং ছাড়ল। অনেকক্ষণ দেখল ভেসে যাওয়া রিং দুটোকে। তারপর তৃতীয় একটা ছাড়তে ছাড়তে বলল, বেড হার।
আমি চমকে উঠে বললাম, মানে?
মানে শেরিল ম্যাকল্যারেনকে বিছানায় নাও। ওর চোখ তোমায় চেয়েছে।
মুখার্জিদা দিব্যি স্মোক করে যাচ্ছে, আমি নই, খেপেছে তোমার মেমসাহেব। কাজেই স্ট্রাইক হোয়াইল ইটস হট।
আমি সত্যিই এবার হাল ছেড়ে দিয়েছি। মুখার্জিদা বাস্তবিকই ইনকরিজিবল রাসকল একটা। মুখে কিসসু বাধে না বুড়োর।
আমি এ সবই ভাবছি, মুখার্জিদা গুম মেরে বসে আছে। হঠাৎ খেয়াল হল, না, লোকটা তো মশকরা করার লোক নয়। খেলতে হলে খেলে যাও ক্রিকেট মাঠে আর… এই জ্ঞান তো ওরই দেওয়া। মুখার্জিদা প্রথম শুনিয়েছিল ওই বিজ্ঞান বসের হাত থেকে কিসসু পাবে না, ওগুলো নিজের আখের গোছাতেই আছে। মেমের হাত ধরো। এই মুখার্জিদাই একদিন কে সি দাশের দোতলায় লুচি ভাঙতে ভাঙতে বলেছিল, বিলিতি কোম্পানিতে মেমেরাই সব। শুধু স্টাডি করো সেখানে পৌঁছোতে কী লাগে। ক্রিকেট, না ভালো বারটেণ্ডিং, না সারাক্ষণ ফাইফরমাশ খাটার অফুরন্ত এনার্জি।
