কোম্পানির চেয়ারম্যান আর্চি ম্যাকল্যারেন আমরা হাত ঝাঁকাচ্ছেন আর এসব বলছেন। আমার বাঁ-হাতে ম্যান অব দ্য ম্যাচের ট্রফিটা ধরা, আর মনের পর্দায় ক্রমাগত ওই রান আউটটা খেলে যাচ্ছে।
শালা সন্দীপ! দেখছিস যখন ক্রিজ ছেড়ে ছুটে বেরিয়ে গেছি কী আক্কেলে গেড়ে বসে রইলি ক্রিজে?
হে ভগবান, শুধু একটা রানের জন্য জীবনের প্রথম সেঞ্চুরিটা খোয়ালুম! কেন, এগারো রানে দাঁড়ানো হারামির বাচ্চাটা ওর উইকেট স্যাক্রিফাইস করতে পারত না?
সাহেবের হাত এবার আমার পিঠে। দুটো মৃদু চাপড়। শুনলাম বলছেন, ইউ হ্যাভ ডান আস প্রাউড…ওয়…ওয়…ওয়টস ইয়োর নেম?
রান আউটটা ফের মনের পর্দায় দেখতে দেখতে বললাম, অপু, অপু সেনগুপ্টা।
ইয়েস, ইয়েস, অপু সেনগুপ্টা।
আমি প্রাইজের টেবিল থেকে সরে এলাম। প্লেয়ারদের ভিড়ে মিশে যেতে চাইছি, হঠাৎ বৃদ্ধ চেয়ারম্যানের তরুণী স্ত্রী শেরিল এসে ওর হাতটা বাড়িয়ে দিল—ওহ, ইউ আর আ পার্ফেক্ট ওপনার, যেভাবে দলকে টানলে। তোমার কিছু কিছু স্ট্রোক আমাকে মনে করিয়ে দিল দেশের মাটিতে দেখা ডেভিড গাওয়ারকে।
আমি শেরিলের হাতটা চেপে ধরেছি। বললাম, থ্যাঙ্ক ইউ, ম্যাডাম। এ তো মস্ত কমপ্লিমেন্ট দিলেন আপনি।
আমার মনের চোখে আর কোনো রান আউট নেই। আমি শেরিলকেই দেখছি। হালকা নীল সুতির ফ্রকে নীল চোখ তরুণীর থেকে চোখ সরাতে পারছি না। আমার হাতে ধরা ওর দুধে-আলতা নরম হাতটা।
শেরিল বলল, আমি যতটাই খুশি আজ আমাদের ড্র অ্যাণ্ড ম্যাকবেরি কাম্পানির জয়ে ততটাই দুঃখিত তোমার সেঞ্চুরি মিস-এ।
আমি হাতে ধরে রাখা ওর হাতটায় মৃদু চাপ দিলাম—তা হলে বুঝুন আমার কষ্টটা। ওটা পেলে আমি হয়তো আপনাকেই উৎসর্গ করতাম।
ওহ, রিয়েলি! আমার হাতের মধ্যে শেরিলের হাতটা কেঁপে উঠল। আমি ফের একটা চাপ দিলাম। এবার একটু বাড়িয়ে।
শেরিল হাসছে। হয়তো মনের চোখে দেখছে আমি সেঞ্চুরি কমপ্লিট করে শচীন তেণ্ডুলকরের মতো ওর দিকে ব্যাট তুলে ধরেছি।
আমি ওর হাতটা কিন্তু ধরেই আছি, যেন ক্রিকেট ব্যাট।
ও মাথা ঘুরিয়ে স্বামীকে খুঁজল, হয়তো এটাই বলতে যে, সেঞ্চুরি হলে সেটা ওকেই উৎসর্গ করা হত।
কিন্তু চেয়ারম্যান সাহেব ততক্ষণে বিয়ারের মাগ হাতে নিয়ে বিপক্ষের ফিলপট অ্যাণ্ড ফিপস দলের হেরো খেলোয়াড়দের সান্ত্বনা দিতে ব্যস্ত।
আমি ফের কী ভেবে শেরিলের হাতটা মৃদুভাবে ঝাঁকাতে লাগলাম। আমার মনে আছে অফিসের বড়োবাবু মুখার্জিদার উপদেশ—গুলি মারো কাজকে, কাজ করে আর আমাদের কী হল? খেলতে হলে খেলে যাও ক্রিকেট মাঠে আর…
এই পর্যন্ত বলেই মুখার্জিদা থেমে যায়। কিন্তু যা বলার তাতেই বলা হয়ে যায়। ডু অ্যাণ্ড ম্যাকবেরিতে ওঠার লড়াই দু-জায়গায়। ক্রিকেট মাঠ আর…
তুমি যুবক আছ, ট্রেনি এগজিকিউটিভ আছ, ব্যাটিং-এর হাত আছে…মুখার্জিদা বলছিল এই সে দিনও।
আমি এখনও হাত ছাড়িনি শেরিলের। কে একটা বিয়র এনে ধরিয়ে দিয়েছে মেমকে, সেটা নিয়ে ও বলল, ওয়ান ফর হিম, প্লিজ!
হিম মানে আমি, অপু সেনগুপ্টা, আজকের ম্যান অব দ্য ম্যাচ। বস্তুত আজকের ম্যান অন দ্য স্পট। চেয়ারম্যানগিন্নি খুব মৃদু, সুরেলা গলায় বিয়রের রিকোয়েস্ট করল ঠিকই, কিন্তু সিসিএফসি মাঠে দাঁড়িয়ে ওঁর অনুরোধ মানেই তো আদেশ। বলার সঙ্গে সঙ্গে বিয়র হাজির; আমি হাত ছাড়ব না বলে বাঁ-হাতের ট্রফিটাই মাটিতে নামিয়ে রেখে বিয়রটা নিলাম। ডানহাতে শেরিলের ডানহাত ধরা। দু-জনে বাঁ-হাতে মাগ ঠোকাঠুকি করে ফেনাসুদ্ধ বড়ো বড়ো বিয়রের ঢোক গিললাম। বিয়রের ফেনায় মোটা সাদা গোঁফ হয়ে গেল মেমের।
ও বলল, ইউ ডিজার্ভ আ ডিনার অ্যাট আওয়ার প্লেস।
এবার ও-ই যেন একটু ঝাঁকাল আমার হাত। বললাম, দ্য সুনার দ্য বেটার।
ও হেসে ফেলল, ডোন্ট রাশ! ডিনার তো বানাতে হয়।
স্মার্টলি বলে দিলাম, চেয়ারম্যানের ডিনার টেবিলের উদবৃত্ত খেলেই আমার চলে যাবে।
খুব জোরে হেসে উঠল শেরিল, ওহ ইউ আর আ বিগ এন্টারটেনার অন অ্যাণ্ড অব দ্য ফিল্ড।
প্ররোচনার সুরে চাপা কণ্ঠে বললাম, বেটার অব ম্যান অন দ্য ফিল্ড। একবার নেমন্তন্ন করে দেখুন।
ওকে, বলো কবে আসতে চাও। পরের শনিবার?
বললাম, কেন, আজও তো একটা শনিবার?
ওহ গড! তুমি মিকি সিঙ্গল নেবার মতন দৌড়োচ্ছ। সত্যিই আজ সন্ধ্যেয় আসতে চাও?
বললাম, আমি নিরানব্বইয়ে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে ভালোবাসি না, ম্যাডাম। তাতে রান আউট হলেও খেদ নেই।
শেরিল আমার হাত থেকে ওর হাতটা আলতো করে ছাড়তে ছাড়াতে বলল, আই আণ্ডারস্ট্যাণ্ড। আজ তো দেখলামই।
আমি এবার প্যাভিলিয়নের দিকে পা বাড়াতে গিয়ে শুনলাম শেরিল নীচু স্বরে ইনভিটেশন দিচ্ছে, তা হলে সাড়ে সাতটার মধ্যে এসে যাও। বাড়ির ঠিকানা জান তো?
রহস্যের হাসি হেসে বললাম, আমি তো ডু অ্যাণ্ড ম্যাকবেরির স্টাফ। দ্যাটস পার্ট অব মাই জব।
আমি প্যাভিলিয়নে ফিরতেই বিয়রের পর বিয়র আসা শুরু হয়ে গেল। এটা কতটা খেলার জন্য আর কতটা শেরিল ম্যাকল্যারেনের সঙ্গে বিশ মিনিটের খোশগল্পের জন্য বুঝলাম না। টিম ক্যাপ্টেন ময়ূখ সেন এসে আমার আধ খাওয়া বিয়রটা হাত থেকে নিয়ে টেবিলে রেখে দু-টো হাত চেপে ধরল, তোর জবাব নেই, যা ব্যাটিং। আজ যেভাবে ধরেছিলি মেমের হাত। দে একটা চুমুই খাই ওই হাতে।
