হঠাৎ বাবা লাহোরি চোখ খুলে, চোখের জল মুছতে মুছতে বললেন, বুঝলি বেটা, এই ছিল তোর জন্মরহস্য।
নন্দন মুগ্ধ স্বরে বলল, হ্যাঁ, বাবা।
বাবা লাহোরি ফের শুরু করলেন—সিলহটে হুকুমনামা পৌঁছে গিয়েছিল সলতানাত বছর বছর এভাবে কর বাকি ফেলা পছন্দ করছে না। দিল্লির আমিররা চান সিলহট করের বদলে কিছু জোয়ান পুরুষ পাঠাক হারেমে কাজ করার জন্য। ভালো গাইয়ে জোয়ান হলে ভালো দর উঠবে। কিছু খুবসুরত লেড়কি হলেও বহুত রুপৈয়া মকুব হবে।
চয়নের বাবা চরণদাসের ভয় হল তার ছেলের গানের গলাই তার কাল হবে। তার ওপর অপূর্ব বাঁশি বাজায় ছেলে। তার আরও খবর আছে গ্রামের স্বর্ণকার পরীক্ষিৎচন্দ্রের মেয়ে কুঞ্জরানির সঙ্গে চয়নের ভাব-ভালোবাসা জমেছে। এই সুযোগে ওদের বিয়ে ডেকে দিতে পারলে ছেলের খোজা হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।
চরণদাস পরীক্ষিৎকে গিয়ে তার শলা দিতেই আকাশ থেকে পড়ল বেনের ব্যাটা। পেঁয়ো চাষি খোয়াব দেখছে জহুরির বাড়িতে সম্বন্ধ করার। সেই রাতেই পরীক্ষিৎ খবর পাঠাল কাফি খাঁর কাছে চয়নের গানের কথা, বাঁশির কথা, চোখকাড়া চেহারার বর্ণনা দিয়ে। হপ্তা ঘুরতে না ঘুরতে চাষের মাঠ থেকে ঘুমন্ত চয়নকে তুলে পাচার করে দেওয়া হল দিল্লি। একমাত্র ছেলের শোকে চরণদাস ঝাঁপ দিল কুয়োয়।
—জানো, কুঞ্জ, ওরা হয়তো আমায় আফিম কি মদের নেশায় চুর করে রেখেছিল অতদিন। কীভাবে, কীভাবে যে দিল্লি এলাম কিছুই মনে পড়ে না আমার। যে-দিন সত্যি ঘোর কাটল দেখি চারধারে অচেনা মেয়েরা সব ঘোরাফেরা করছে, কিন্তু কাউকে আমার অ্যান্তোটুকু ভাল্লাগছে না।
—কিন্তু, চয়ন, দিল্লি আসার সব পথ, সব দিন, সব রাত আমার মনে আছে। মনে আছে সেই সব পুরুষকেও। যারা আমায় লুটেপুটে খেল শুধু তোমার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথা দিয়ে। কোঠাওয়ালি সুরৈয়া তো আমায় ছ-মাস বেশ্যা করে রেখে দিল ওর ওখানে।
-কিন্তু কেন? কেন তুমি এই পথ ধরলে কুঞ্জ? আমাদের গ্রামের ধাইমা চঞ্চরীকে দিয়েই তো বাচ্চাটা নষ্ট করে দিতে পারতে।
-তোমার সন্তানকে আমি মারব, চয়ন? দেহে প্রাণ থাকতে? এই সময় উচ্চতরালে কখনো পুরুষ কষ্ঠে, কখনো নারীকন্ঠে কান্না জুড়লেন বাবা লাহোরি। চোখের জলে গোটা বুক ভেসে গেল নন্দনদেবের।
বাবা লাহোরি ফের কথায় ফিরে এলেন—চয়ন দেখে হারেমের শান, তার ঠাটবাট, প্রাচুর্য, রূপের হাট। কিন্তু মন পড়ে থাকে সিলেটের সেই সবুজ খেতে। সারারাত জেগে খিদমদগারি আর পাহারাদারি করে দিনেরবেলাটায় সে একটু ঘুমিয়ে নেয়। সুযোগ হলে ওর বাঁশিটাও একটু বাজিয়ে নেয়। সেজন্য মেয়েদের কাছে খুব কদর ওর; জেবউন্নিসা, নসরিন, রসিলাবাইরা তো সুযোগ পেলেই ওর গালে চুমো দিয়ে দিচ্ছে, গায়ে গা ঘষে দিচ্ছে, আর রাতেরবেলা গান শোনাতে ডাকছে। কিন্তু ওর পুরুষের কাজের অঙ্গটা নষ্ট করে দিয়েছে বলে নয়, ওর মন থেকেই কোনো সাড় নেই এইসব হিজিবিজি খেলাধুলোয়। ওর শুধু প্রাণে সাড়া দেয় যে-রাতে কাহিনিকার বুড়ো বাবা লাহোরি হারেমে আসেন গল্প শোনাতে। আহাহা! কী কথা! কী ব্যথা! কী চোখের জল বয় তখন হারেম জুড়ে! আর তখনই মেয়েদের সত্যিকারের চোখের জল দেখতে পায় চয়ন। কোনো কোনো মেয়ে তখন নিজেদের প্রেমের গল্প শোনানো শুরু করে বাবাকে। বাবা লাহোরি খাঁটি জহুরির মতো তখন সেইসব মণিমুক্তো কুড়োতে থাকেন তাঁর স্মৃতির ঝুলিতে। আর চয়নেরও বড়ো প্রাণ উশখুশ করে নিজের জীবনের প্রেমের কাহিনি শুনিয়ে দেয় রাতের কাহিনিকারকে।
এইভাবে দিন কাটে চয়নের, হারেমের মেয়েরা ঠাট্টা করে ডাকে ওকে জিব্রিল বলে, যে ফরিশতার পাখনায় কখনো পাপের ছায়া পড়ে না। আর ওদিকে বাপ পরীক্ষিৎচন্দ্রের নিষেধ অমান্য করে কুঞ্জরানি জন্ম দেয় এক অপরূপ পুত্রের, যার মুখ হুবহু তার বাপের মতো। তুই জানিস নন্দন, তোকে দেখেই আমি তোর পেহচান পেয়ে গিয়েছিলাম। তোর চোখ মুখ কপাল চুল বিলকুল চয়নের আদলে, আর তোর নীল চোখ তোর মায়ের। তোকে জন্ম দেবে বলে তোর ঠাকুরমার বাড়ি পালিয়ে গিয়েছিল কুঞ্জ, আর তোর জন্মের পর সমাজে বেইজ্জতির কথা ভেবে সেঁকো বিষ খেয়েছিল পরীক্ষিৎ।
—কুঞ্জ, যদি তুমি এলেই তা হলে এত দেরিতে কেন?
–তোমার ছেলেকে একটু বড়ো করে রাস্তায় বেরিয়েছিলাম, চয়ন।
—হায় রে, দিল্লির পথকে তুমি রাস্তা বলছ? এ তো নরকের সড়ক।
—কিন্তু আমার মনে হল আমি স্বর্গের দিকে হাঁটছি…।
সিলহট থেকে দিল্লি সত্যিই বড়ো দূর। যত রাস্তা তত মানুষ আর তত শয়তান। যে-ই রাতে একটু শোওয়ার জায়গা দিয়েছে কুঞ্জকে সে-ই ওর শরীর লুটেছে। যে নৌকা, বয়েল গাড়ি কি এক্কায় চড়িয়ে এগিয়ে দিয়েছে সে-ও। যে পথ বাতলেছে সে-ও। শেষে যে ওকে ইলাহাবাদের রাস্তায় জ্বরে কাতরাতে দেখল সে-ও প্রথমে জ্বরের ইলাজ করল, তারপর নিজের পিয়াস মেটাল, তারপর এনে তুলে দিল দিল্লির কোঠাওয়ালি সুরৈয়ার আখড়ায়।
—কিন্তু জানো, চয়ন, আমার কোনো কষ্ট নেই, দুঃখ নেই, লজ্জাও নেই, কারণ এই সবকিছুই আমি তোমাকে পাওয়ার মূল্য ভেবেছি। শংকরদেব শুনেছি বলেছিলেন, যাকে খুব চাওয়া যায় তার জন্য অনেক দিতে হয়।
—কিন্তু কী পেলে শেষে, কুঞ্জ? একটা ক্ষত হওয়া শরীর।
