বুঝেছি, বুঝেছি বলে মাথা নাড়তে নাড়তে নন্দনকে তার কথার মধ্যে আটকে দিলেন বাবা। তারপর বললেন, তোর কি মনে হয় এই রাতওয়ালি কাহানি চিরদিন চলতে পারে? শুনেছি যুদ্ধের পর রাতের বেলা সেকান্দার কাহিনি শুনে কাটাতেন। তা হলে বোঝ, কত দিনকার রেওয়াজ এটা। ছোটো বয়সে বিশ-পঁচিশ রাতের কাহিনিকার দেখেছি শহরে। এক ছিলেন আমার উস্তাদ মাধোদাস, আর আরেক ছিলেন বড়ে আব্বাস, যিনি শুধু জঙ্গ, যুদ্ধের গল্প শোনাতেন।
বাবাকে এবার কথার মধ্যে রুখে দিল নন্দন—কিন্তু সুরৈয়া বলেন কেউ কিন্তু আপনার মতো ছিলেন না। কারণ কেউ কোনোদিন আপনার মতো প্রেমের গল্প শোনাতে পারেননি।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে বাবা লাহোরি বললেন, জানি। আর এইসব ইশকের কিসসা ফাঁদতে গিয়েই তো নিজের সর্বনাশ ডেকে আনলাম।
নন্দন প্রশ্ন করল, কীরকম?
বাবা বললেন, প্রেমের গাথা গাইতে গিয়ে বুঝলাম যে, যুদ্ধের গল্প, মারদাঙ্গা হাতমারির কেচ্ছা, মজার গল্প, রহস্য কাহিনির মতো এসব কথা শুধু মাথা দিয়ে, কল্পনা করে বলা যায় না। বড়ো দিল আর দর্দ দিয়ে বানাতে হয় এসব কাহানি। তখন বুকের ভেতর আনচান করে, মাথার মধ্যে মনে হয় খুন ঝরছে। কিন্তু থামাও যায় না, এমনই নেশা।
নন্দন বলল, এই কাহানি বানানোর তরিকাটা কী বাবা?
বাবা লাহোরি বললেন, মানুষ চেনা, মানুষের মধ্যে মিশে যাওয়া।
-কীরকম?
তখন সূর্যোদয় হচ্ছে, দিনের প্রথম আলো এসে পড়ছে বাবা লাহোরির মুখের ওপর। নন্দন দেখল বাবা এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে নদীর পাড়ের একটা গাছের দিকে আঙুল তুলে দেখাচ্ছেন, আর বলছেন—
বেটা, ওই দ্যাখ ওই ইমলি পেড়! যা গিয়ে সালাম করে আয়, তারপর এই কিসসা শোন।
নন্দন উঠে গিয়ে গাছটার গোড়ায় মাথা ঠেকিয়ে প্রণাম করে এসে বৃদ্ধের সামনে বসে বলল, বলুন হুজুর।
বাবা লাহোরি খুব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, আজ থেকে একুশ বছর আগে তোর বাপ আর মাকে নদী থেকে তুলে ওই গাছের নীচে শুইয়েছিলাম।
নন্দনের মনে হল ওর সারাশরীর দিয়ে একটা লম্বা বিদ্যুৎ খেলে গেল। ও কষ্ট করে গলার কান্নাটা চাপল। মনে পড়ল কোঠাওয়ালি সুরৈয়ার কথাগুলো, লড়কা, কেউ যদি তোর বাপ মায়ের হদিশ দিতে পারে তো ওই বাবা লাহোরি। ও দিল্লির হারেমগুলোকে আয়নার মতো দেখতে পায়। আর ও যা দেখে তা জিন্দেগিতে ভোলে না।
বাবা লাহোরি ফের ওঁর কাহিনি শুরু করলেন—অনেক কোশিস করে হুঁশ ফেরালাম ঠিকই ওই মাশুক-মাশুকার, কিন্তু ওরা সমানে বলতে লাগল, বাবা, আমাদের রেয়াত করুন, আমরা মরতেই চাই।
বললাম, খুব গেহরি ইশক না থাকলে কখনো কোনো নারী-পুরুষ এভাবে মরতে চায় না। আর এরকম ইশক থাকলে কোনো মেহবুব-মেহবুবার মরা উচিত নয়। দেখছ না, নদীও তোমাদের ফেরত দিয়েছে!
তিন দিন, তিন রাত ওরা আমার কুঠুরিতে ছিল, কিন্তু মুখে কোনো খাবার তুলল না। জলেরও কোনো পিয়াস দেখলাম না। পাশের ঘর থেকে শুনলাম কখনো চয়ন, কখনো কুঞ্জরানি নিজের নিজের দুঃখের কথা অন্যজনকে শুনিয়ে যাচ্ছে। সারাদিন, সারারাত। তিন দিন, দিন রাত।
এই তিন দিন, তিন রাত আমিও কোনো কাজে বেরোইনি। না খেয়েছি, না নাহিয়েছি, না শুয়েছি। শুধু দেওয়ালে কান পেতে শুনে গেছি ওদের কাহিনি। তারপর চৌহা দিনের ভোরে যখন এসে ইজাজত চাইল চলে যাওয়ার, আমি ওদের রাস্তা রুখতে পারিনি। আর জিজ্ঞেসও করিনি কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, কখনো ফিরবে কি না।
হায় আল্লা, তার পরের দিন ভোরে নদী ফের ফিরিয়ে দিল ওদের ধড় দুটো, বিলকুল নাঙ্গা, আর একের সঙ্গে অন্যটা এত গেহরাইসে ফঁসা, যে আমি দুটো শরীরকে একসঙ্গে কাঠের চিতায় তুলতে বাধ্য হলাম। আমার উস্তাদ মাধোদাসের কাছে সাত বছর যে-সংস্কৃত শিখেছিলাম তাও কাজে লাগালাম ওই সময়। সূর্যমন্ত্র বলে সূর্যাস্তের সময় আগুনে ভস্ম করে দিলাম আমার নায়ক-নায়িকাকে।
নন্দন বলল, বাবা, আমার সেই মাতৃপিতৃদেবের প্রেমের কথা বলুন এবার। ‘বলছি’ বলে বাবা লাহোরি চোখ বুজে গভীর শ্বাস টানলেন, লম্বা সময় ধরে সেই শ্বাস ধরে রাখলেন, আর শেষে যখন মুখ খুললেন মনে হল ওঁর বয়স ঝরে গেছে সত্তর বছর। এক তরতাজা নওজোয়ানের আওয়াজে বাবা গাইতে লাগলেন…তারপর কখনো যুবক, কখনো যুবতীর কণ্ঠে–
৩.
—জানো, কুঞ্জ পরপর তিন বছর যখন খরা চলল দেশে আমি ভয়ে বাবার চোখের দিকে চাইতে পারতাম না। বকেয়া কর দূরে থাক। আমাদের খাওয়া-পরাও বন্ধ হয়ে যাবার জোগাড়।
—আমি তোমার চোখের দিকে চাইলে তখন ঠিক বুঝতাম তোমার বুকের মধ্যে ঝড় বইছে। একবার তুমি বুকে জড়িয়ে ধরে আদর করলে, আর আমি তোমার বুকে কান পেতে বাজ পড়ার আওয়াজ পেলাম।
-সত্যি, কুঞ্জ?
–হ্যাঁ, চয়নদেব।
—তা হলে আমি কেন তোমার পেটে কান পেতে টের পাইনি তুমি মা হতে চলেছ?
—আমি তোমায় বুঝতে দিইনি, প্রিয়। দিতে চাইনি।
-কেন? কেন? কেন তুমি আমায় জানতে দাওনি, কুঞ্জ? তা হলে আমি তোমায় নিয়ে যে। দিকে দু-চোখ যায় পালিয়ে যেতাম।
—আমি কিন্তু পালাতে চাইনি, চয়ন।
—ধিক, কপাল আমার। শেষে তো সেটাই হল। এই সময় বাবা লাহোরি একবার পুরুষকণ্ঠে, একবার নারীকন্ঠে চোখের জল বইয়ে রব করে কাঁদলেন। নন্দনের মনে পড়ল সিলহটের সারারাতের কীর্তনযাত্রার কথা। বৃন্দাবন ছেড়ে কৃষ্ণ কাঁদতে কাঁদতে বিদায় নিচ্ছেন, আর সমস্ত গোপীকুল শোকে মুহ্যমান। রাধা গলায় ঘটি বেঁধে যমুনার ডোবার স্বপ্ন দেখছেন। নন্দন বাবা লাহোরির পিছনে যমুনার দিকে চাইল, একই মানুষের গলায় নারী-পুরুষের শোকের কী বিচিত্র প্রকাশ। নন্দনের তো কাহিনি শোনা নয়, বিশ্বদর্শন…আত্মদর্শন হচ্ছে।
