মাথা হেঁট করে বসে আজমলের ছেলেবেলার বান্ধবী নাজমুন, যে চোখে দেখতে পায় না, কিন্তু সব দৃশ্য অবিকল বর্ণনা করতে পারে আঁখদার মানুষের মতো। আজমল পড়ে থেতলে যেতেই ওর মরা মাথাটা কোলে তুলে এমন এক কান্না জুড়ল নাজমুন যে, সেই থেকে রাতের ঘুম থেকেও চমকে চমকে উঠত আমিনা। আর তখন ডাক পড়ত বালক নুসরত রজার— বাচ্চা, শুনেছি তোর বহুত কিসসা জানা আছে। আমায় কিসসা শুনিয়ে জাগিয়ে রাখ, না হলে ওই চুড়ৈল নাজমুনের কান্নার আওয়াজ আমার জান খেয়ে নেবে। বালক নুসরত বলল, কিন্তু নাজমুন তো সেইদিনই কাঁদতে কাঁদতে মরে গেছে। আমিনা বালককে কাছে টেনে নিয়ে বলল, মরে গেছে, কিন্তু কান্নাটা রেখে গেছে আমার জন্য।
বাবা লাহোরির মনের পরদায় ভাসছিল মিরাটের রইস ফজলে মিয়াঁর মুখটা, যিনি তাঁর প্রেমিকা খুবসুরত বাইয়ের গোপন প্রেমিকের ডান হাতের কড়ে আঙুলটা কেটে সোনায় বাঁধিয়ে গলায় মালা করে পরিয়েছিলেন খুবসুরতকে। বাবার চোখের সামনে ভাসল সেই ইটের দালান, যেখানে সেলিমকে ভালোবাসার জন্য জ্যান্ত কবর দেওয়া হয়েছিল আনারকলিকে। তিনি দেখলেন বেনারসের ঘাটে বসা বিধবা দামিনীর মুখ, যিনি স্বামী মিছরিলালের কুষ্ঠ সারিয়েছিলেন বিশ্বনাথ মন্দিরের সামনে রোজ বারো ঘণ্টা কপাল ঠুকে। অথচ তাঁর কপালে কোনো চোট হল না, লোকে বলতে শুরু করল ‘এবার বোধ হয় সিঁড়ির পাথরটাই ভেঙে পড়বে। বাবা লাহোরি দেখলেন সিপাহসালার ওয়াকি খানের হারেমের সুন্দরী গুলবদনের দুই নীল চোখ, কালাজ্বরে ইন্তেকালের আগে যে-চোখ দুটো উপড়ে নিয়ে বোয়ামে ভরে দিলেন ওয়াকি। বললেন, আমি চলে গেলে এই চোখের ইজ্জত করার লোক থাকবে না। অন্ধ হওয়ার পর গুলবদনের কাজ হয়েছিল—তখন তো ওঁর দিন আর রাত সমান তরুণ নুসরত রজাকে ডেকে গল্প শোনা আর বিনিময়ে নিজের জীবনের সমস্ত প্রেম আর প্রেমিকের গল্প শোনানো। এরকম এক গল্পের বৈঠকের পর বলেছিলেন, নুসরত, এসো, উঠে এসো আমার বিছানায়।
ভয়ে আর লজ্জায় শিউরে উঠেছিল নুসরত, সে কী কথা, বেগমসাহেবান? আমি গরিবগুর্বো…
গর্জে উঠেছিলেন গুলবদন, চুপ! উঠে এসো।
-কিন্তু বেগমসাহেবান, চারিদিকে ভর দিন এখন…
–চুপ। উঠে এসো।
অগত্যা ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বেগমের বিছানায় জায়গা করে নিল নুসরত রজা। সেদিনের সেই প্রেমের স্মৃতিতে আজও গায়ে কাঁটা দেয় বাবা লাহোরির। জন্নত। বিলকুল জন্নতের ছোঁয়া সেদিনের সেই দুপুরের খেলায়।
কিন্তু তারপর? বাবা লাহোরি আজও ভোলেননি সেই মৃত্যুভয়ের মুহূর্ত। দোজখের শয়তানের মতো কোত্থেকে হঠাৎ উদয় হল হারেমের খোজা মুর্শেদ। টেনে হিঁচড়োতে হিচড়োতে নিয়ে গেল নুসরতকে হারেমের সহবত শেখাতে। ব্যথায়, যন্ত্রণায় ভুলেই গেল লোকগুলো সত্যি কী করল ওকে নিয়ে অন্ধকার ঘরে। তিন দিন, তিন রাত বেহুশ হয়ে থেকে ফের যখন দিনের আলো দেখল নুসরত, ও-ও তখন এক খোজা।
বাবা লাহোরির চোখের সামনে ভাসছিল চয়ন আর কুঞ্জরানির নিষ্পাপ মুখ দুটো, যখন কানে ভেসে এল যুবকের আওয়াজ, বাবা, আপনি আমায় শেখাবেন?
বাবা চোখ মেলে অন্ধকারের মধ্যে যুবকের আবছা মুখটা দেখলেন। জিজ্ঞেস করলেন, তুই কোথাকার মানুষ রে ছোকরা?
—সিলহটের।
বাবা ফের চোখ মুছলেন। বললেন, তোর গান শুনেই আমি ধরেছি। তো তোর ওই গান ছেড়ে শেষে এইসব কাহিনি শোনাবি লোককে?
যুবক বলল, শ্রীহট্টে বড্ড খরা। ফসল কিছু হয় না। ফসলের বদলে আমরা ক-জন জমা পড়েছি হারেমে। খোজার গলায় কীর্তন কে শুনবে হুজুর?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন বাবা লাহোরি। যুবকের পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম?
যুবক বলল, নন্দন। হারেমে ডাকে লক্কা বলে।
বাবা বললেন, তোর বাপ-মা তোকে ছেড়ে দিল?
যুবক বলল, তাঁরা কেউই নেই, আমি তাঁদেরও খোঁজে আছি।
—তাঁদের মুখ মনে আছে? তাঁরা কোথায় জানিস?
—শুধু জানি দিল্লির কোনো হারেমে। কিন্তু তাঁদের মুখ আমি দেখিনি।
—তাঁদের নাম?
—চয়নদেব আর কুঞ্জরানি।
–তার মানে হারেমের দুনিয়া যাদের চেনে ফৈজু আর দিলারা বলে?
এই নাম দুটো সম্পূর্ণ অজানা নন্দনের কাছে, সে অবাক চোখে তাকিয়ে রইল বাবার দিকে।
২.
তখনই দিনের আলো ফুটতে দেরি আছে। বাবা লাহোরি নন্দনদেবকে নিয়ে দিল্লির সেরা হেকিম আবুতালেবের হারেম থেকে কাহিনি গেয়ে বেরোলেন। বেরোবার মুখে হারেমের খোজা ফরহত এসে বৃদ্ধের ঝোলায় কিছু রুপৈয়া আর চাল ঢেলে দিল। খোঁজ করল, বাবা, ফের কবে কাহানি শোনাবেন এই হাভেলিতে? আপনার কাহানি সচমুচ এই পরিদের নিদ কেড়ে নেয়।
বাবা লাহোরি ফরহতের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে বললেন, দেখি, বেটা। উমর তো ফুরিয়ে এল। জানি না আর কতদিন টানতে পারব। ফরহত বিলকুল অবাক সুরে বলল, সে কী বাবা! আমার মালিক তো সামনের মহিনায় মীর সবজানির খেয়াল আর আপনার কহানিগানা দিয়ে মেহফিল বসাবেন ঠিক করেছেন। কত আঙুর খেজুর পিস্তা বরফি শরাবের ইন্তেজাম করেছেন।
বাবা লাহোরি নন্দনকে নিয়ে ঘর থেকে বেরোতে বেরোতে বললেন, দেখছিস বেটা, কী জিন্দেগি আমার? খানা পিনা গানা থেকে বেরোবার পথ নেই। আমি এই ছেড়ে যেতে চাইছি ফকিরের গানে, আর তুই দেবদেবীর কীর্তন ছেড়ে আসতে চাইছিস এইখানে?
নদীর পাড়ে বাবা লাহোরির পায়ের কাছে বসতে বসতে বহুক্ষণের নীরবতা ভেঙে নন্দন বলল, বাবা, দেবদেবীর কীর্তন গাওয়া কিছু কঠিন না, সবাই গায়। কিন্তু আপনার মতো মানুষের সুখ-দুঃখের কথা ক-জন বলে? কোঠাওয়ালি সুরৈয়া বলছিলেন যে, আপনি চলে গেলে মানুষের গল্প শোনা বন্ধ হয়ে যাবে শহরে। কারণ আপনার কোনো শাগিদ তৈরি হল না এতদিনে।
