যুবক এবার নীচু হয়ে বাবার পায়ের ধুলো নিয়ে বলল, বাবা, আমাদের গ্রামে একটা প্রবচন আছে যে, সাধু-সন্তদের কাছে উষালগ্নে আর সূর্যাস্তকালে দয়াভিক্ষা করলে তা বিফল হয় না…
যুবকের কথার মধ্যেই রে রে করে প্রতিবাদ শুরু করলেন বাবা লাহোরি, বল কী! বল কী! আমি সাধু-সন্ত-পিরফির নই বাপু, আর আমার কাছে ভিক্ষে করার মতো কিসসু নেই বাপ। আমি নিজেই রাতবিরেতে কিসসা গেয়ে ভিক্ষে করে দিন গুজরান করি। তুমি ছোকরা ভুল লোক পাকড়েছ।
যুবক এবার পাড়ের মাটিতে আসনসিঁড়ি হয়ে বসে বলল, বাবা তিন মাস হিল্লিদিল্লি করেছি, এই আপনার খোঁজে। কেউ বলে কবেই মারা গেছেন, কেউ বলে শুধু রাতেই আপনার দর্শন মেলে রইসদের আখড়ায়। শেষে…
বাবা লাহোরি ওঁর মরে আসা চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে মেলে বললেন, শেষে?
—শেষে দিল্লির কোঠাওয়ালি সুরৈয়ার কাছে শুনলাম যে, দিনের এই সাঁঝবেলাতে আপনাকে যমুনার এই পাড়ে কিছুক্ষণ পাওয়া যায়।
ঠিক তখন সূর্য ডুবল, নদীতীর হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল, আর কালচে-নীল আকাশের গায়ে একটা মাটির ঢিবির মতো দেখাল প্রবৃদ্ধ বাবা লাহোরিকে। যুবকের কথায় কীরকম গুম মেরে আছেন বৃদ্ধ, আর এই পর্ব চলল বেশ কিছুক্ষণ। যুবকের মনে হল এই নীরবতা ওকে চলে যাওয়ার নির্দেশ। ও ফের বৃদ্ধকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, গুস্তাকি মাফ করবেন হুজুর, আমি চললাম।
রোকো।–সহসা গম্ভীর স্বরে নির্দেশ এল বাবা লাহোরির। যুবক থমকে দাঁড়াতে ফের বললেন বৃদ্ধ, তুমি কিন্তু বলে গেলে না কী চাইতে এসেছিলে এখানে।
যুবক কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে শেষে নরম সুরে বলল, একটু দয়া।
বাবা লাহোরি বুঝে উঠতে পারলেন না ছোকরা দয়া, দয়া’ বলে কী বোঝাতে চাইছে। তার ওপর ওঁর হদিশ পেয়েছে কোঠাওয়ালি সুরৈয়ার কাছে, যার মতো একটা হারামি মেয়েছেলে দুনিয়ার কম আছে। কে জানে কী মতলবে একে পাঠাল সুরৈয়া। তবু ছোকরার মুখ দেখে দয়াই হল বাবার, জিজ্ঞেস করলেন, কীসের দয়া বেটা?
যুবক ফের বসে পড়ল বাবার পায়ের কাছে, বাবা, আমি রাতের কিসসা গাওয়াইয়া হব। আপনি আমায় তালিম দিন।
গোটা অন্ধকার আকাশটা তাঁর মাথায় টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়লেও বাবা লাহোরি এতখানি তাজ্জব হতেন না, যা হলেন যুবকের আর্জিতে। প্রায় গোঙিয়ে উঠলেন, বলিস কী বেটা! দম থাকতে আর দিমাক থাকতে কেউ কখনো এই কাজ নেয়! ওরে, এ তো সারাদুনিয়ার দর্দ আর দুখ বুকে আর মাথায় বয়ে বেড়ানো। আর রাত জেগে জেগে মহল্লায় মহল্লায় গেয়ে যাওয়া। রাতের কিসসাকার হল রেণ্ডির মতো, রাতই তার দিন। দুনিয়াকে ভুলতে মানুষ তার সঙ্গ নেয়, কিসসা শুনতে শুনতে এক সময় গাওয়াইয়াকে ভুলে গিয়েও মানুষ ঘুমে ঢলে পড়ে। তখন গাওয়াইয়ার মনে হয় সে-ও এক কাজ-ফুরোনো রেণ্ডি…তুই এই কাজ নিবি?
যুবক বলল, বাবা, আপনি রেণ্ডি কথাটা মুখেও আনবেন না মেহেরবানি করে। আপনি রাতের পরি। আমাদের প্রদেশে কাহিনিকারদের বলা হয় ঋষি। কারণ তাঁরা মানুষের দুঃখ বেদনার ইতিহাস জানেন। সুর করে সেই কাহিনি গাওয়াকে বলে কীর্তন। আমি কীর্তন গাইতে গাইতে বহু পথ পার হয়ে এখানে চলে এসেছি। আপনার কাছে।
আমার কাছে?—ফের একবার চমকে উঠলেন বাবা লাহোরি। তুই কি ভাবিস আমি দেব দেবী, হুর-পরির লীলাকীর্তন করি? আমি গল্প বলি আনসান আদমির উলটোপালটা কাজের, দোজখের কেচ্ছাকান্ডের, ছুরি চাকু হাতামারি বেলেল্লাপনার অজিব সিলসিলার। ব্যর্থ প্রেম, দুরন্ত শয়তানি, লোভীর জিভের জল আর দুঃখীর চোখের জল নিয়ে। এসব কাহিনি দিনে কেউ উচ্চারণ করবে না, রাতে শুনবে হাতে শরাব নিয়ে, আর আঁসু বহাবে। আমার উস্তাদ ছিলেন এক হিন্দু ব্রাহ্মণ মাধোদাস। আমার অর্ধেক কাহিনি তাঁর মুখ থেকে তোলা, আর অর্ধেক দিল্লির বাজার, ময়খানা, রেণ্ডিবাড়ি আর শানদার সব হারেম থেকে। ভাবিস না এইভাবে গল্প কুড়োনো খুব আসান কাম। আমার উস্তাদ মাধোদাস তাঁর শেষ কিসসা যেটা শুনিয়েছিলেন সেটা নিজের। যখন বললেন ‘এরপর মাধো চুপ করলেন, আর সেই মুহূর্ত থেকে কেউ আর তাঁর গলা শুনতে পেল না আমরা ভাবলাম পন্ডিতজি এটা কী বলছেন? এরপর আর তা হলে ওঁর আওয়াজ পাব না আমরা? আওয়াজ একটা পেলাম ঠিকই দম তোড়ার। আমরা হুড়মুড় করে ওঁর শোবার ঘরে ঢুকে দেখি পন্ডিতজি গলায় গামছা বেঁধে লটকে আছেন কড়িবরগা থেকে। তখন ওঁর উমর মাত্র চল্লিশ।
যুবক বলল, কিন্তু আপনি শওসাল বেঁচেছেন। উদাসভাবে বাবা লাহোরি বললেন, হু। তা হলে বোঝো আরও কত ব্যথা আর চোখের জল নিয়ে জীবন কাটালাম।
যুবক বলল, কিন্তু আমাদের অবতার শংকরদেবের তৈরি কীর্তন গাই যখন আমরা, তখনও তো কাঁদি।
বাবা লাহোরি অন্ধকারে ঢাকা যুবকের মুখ হাতড়ে হাতড়ে নিজের দুই তালুর মধ্যে এনে বললেন, তুমি শংকরদেবের কীর্তন গাও? আমায় একটু শোনাবে?
যুবক ওর কোঁচড় থেকে একটা বাঁশি বার করে তাতে একটু ঝিঝিট সুর তুলে তারপর গলায় গেয়ে গেল শংকরদেবের একটা কীর্তন। যমুনার তীরে অন্ধকারে বসে তাই শুনতে শুনতে তাঁর প্রায়ান্ধ চোখ দিয়ে অশ্রুবিসর্জন করতে করতে সেই গান শুনলেন বাবা লাহোরি।
যুবক কখন গান থামিয়েছে বাবার হুঁশ ছিল না, তিনি তখন স্বপ্নে স্বপ্নে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। লাহোরের বাল্যে, যখন আমিনাকে তিন তালাক দিয়ে ঘর থেকে ছুটে বেরিয়ে গেল আজমল খাঁ আর দূরে টিলার থেকে ঝাঁপ দিল নীচের পাথরে; সেই পাথরের জমির এক কোণে তখন
