কম অনুরোধ-উপরোধ করেনি মণিবালা। বলেছে, আমাদের বার করে দেওয়ার লোক মুরারি নয়। তুমি থাকো আমার সঙ্গে। আমায় বায়োস্কোপ করতে দাও, এ ঝড় কেটে যাবে।
মুরারি বললে, শোনো নৃপেন, এ বাড়ি আমার। কোনো শালাও তোমায় এখানে থেকে হঠাতে পারবে না। তুমি থাকো এখানে যদ্দিন খুশি মণিমালাকে নিয়ে। এ তোমাদের সুখের সংসার হবে। আমি মাঝে মাঝে আসব, তোমাদের সুবিধে-অসুবিধে দেখব, তোমার সঙ্গে দু পাত্তর না হয় খাবও। তুমি কিন্তু ভায়া যেও না। কোথাও যেও না। আমার বাগান ফাঁকা হয়ে যাবে।
চোখ ফেটে জল আসছিল ন্যাপার। অশেষ চেষ্টায় তা সামলে মুরারিকে বলল, না। আপনার বাগান ফাঁকা হবে না। আপনার মণিমালা রইল। আমি যাই।
বেরিয়ে এসে গাড়িতে স্টার্ট দিতেই কান্নাটা ঠিকরে বেরিয়ে এল। গাড়ি নিয়ে কোথায় যাবে জানে না, তবু গাড়ি চলছে। মণির দেওয়া পান্নার আংটিটা একবার দেখল। একবার ভাবল ছুড়ে ফেলে দেবে, পরমুহূর্তে মনে হল—না থাক, এই একটু স্মৃতিই তো। যত স্বল্পমেয়াদের জন্যই হোক, মণিবালার স্বামীই তো।
একটা মোড়ে এসে আটকে পড়ল গাড়ি। মণিবালার দেওয়া সিগারেটের ফের একটা ধারাল ন্যাপা। ভাবল, স্বামী। দুর দুর নিকুচি করেছে স্বামী। হঠাৎ করে নায়িকার প্রথম স্বামী থেকে পঞ্চম বাবুতে নেমে এসেছে ও।
জ্যাম কাটতে ন্যাপ স্পিড ওঠাল মল্লিকবাজারের দিকে যাবে বলে। গাড়িটা বেচতে পারলে মামার টাকার অন্তত কিছুটা শোধ হয়। মা-র ওখানে চিলেকোঠার ঘরটা যেন ইশারায় ‘আয়! আয় করে ডাকছে। মল্লিকবাজারে গাড়িটা ছেড়ে ন্যাপা স্টপে গিয়ে দাঁড়াল ট্রাম ধরবে বলে। আর ভীষণ একলা একলা লাগল নিজেকে। মাত্র ক-দিনের অভ্যেস, তাতেই কী একটা ঘটে গেছে যেন কোথায়।
রাতের কাহিনিকার
যমুনার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখছিলেন কাহিনিকার নুসরত রজা লাহোরি। তামাম দিল্লিতে সবাই তাঁকে ডাকে বাবা লাহোরি। ওঁর কাছেই নাকি দুনিয়ার সব কিসসা মজুত আছে। সাঁঝ নামলে যমুনার এই পাড়ে বসে চলে লাহোরির গল্প শোনানো। সমঝদারেরা বলে যে, সূর্যোদয় আর সূর্যাস্তের যেমন শেষ নেই, একটার শেষ হলে আরেকটার শুরু, তারপর সেটার শেষ
তো অন্যটার শুরু, তেমনি ধারা বাবা লাহোরির কিসসার…শুরু-শেষ শুরু-শেষ-শুরু…
বাবা নিজে অবশ্য মনে করেন গল্প হল জীবন আর মৃত্যুর মতো, একটা আছে বলেই অন্যটাও আছে। আগ্রায় বসে জাহাঙ্গির বাদশাহ একবার ওঁর গল্প শুনে বলেছিলেন, বাবা, এখানেই আপনার গল্প শেষ? ব্যাস?
বাবা লাহোরি মাথা ঝুঁকিয়ে তখন আদাব করে বলেছিলেন, শেষ? নেহি জাঁহাপনা! এই তো শুরু।
গল্পটা ছিল বাংলার শ্রীহট্টের নবীন যুবা চয়ন আর তার প্রেমিকা কুঞ্জরানির গল্প। দিল্লির হারেমে জমা পড়ে যাদের নাম হয়েছিল ফৈজু আর দিলারা। বাদশাহ এরপর জিজ্ঞেস করতেই পারতেন, বাবা, ইসকে বাদ কেয়া? তা না করে তিনি জোর কদমে হেঁটে গেলেন অন্দরমহলে বেগম নূরজাহানের কাছে আর কপালে হাত দিয়ে বসে বললেন, বেগম, কখনও ভেবে দেখেছ গল্প যদি সত্যি হয় তো তা কী ভয়ংকর ব্যাপারে দাঁড়াতে পারে?
নূরজাহান তাঁর কর্তার কথার কোনো মানে করতে না পেরে একটু উদবিগ্নই হলেন। তা হলে কি কাল বাদশার আফিম আর মদের মিশেল একটু গোলমেলে হয়ে গিয়েছিল? তিনি বাদশার মাথায় আদর করে হাত বুলিয়ে বললেন, মেরে সরতাজ, আপনার কেন এমনটা মনে হল হঠাৎ?
জাহাঙ্গির বললেন, আজ বাবা লাহোরির একটা গল্প শুনে মনটা একদম ভেঙে গেল, বেগমসাহেবান। বাংলার সিলহটের এক যুবকের গল্প। চাষির ছেলে, বাপ-দাদারা কর দিতে পারেনি তাই ওকেই পাঠিয়ে দিয়েছিল আমাদের আমির-ওমরাহদের হারেমে খোজা হবার জন্য।
বেগম নূরজাহানের রাগ বড়ো তাড়াতাড়ি চলকে ওঠে। তিনি দপ করে জ্বলে উঠে বললেন, পিয়ারে বাদশাহ, আমি তামাম হিন্দুস্তানের মালিক জাহাঙ্গির বাদশার হারেম খারিজ করতে পেরেছি। কিন্তু আপনার আমিরদের স্বভাব বদলাতে পারলাম কই? ওঁদের বেগমরা যেমন শরীরের হিরে-জহরত দেখিয়ে লোকের তারিফ কুড়োতে চায় তেমনই ওই আমিররা শুনেছি সাঁঝেরবেলা শরাব টানতে টানতে নিজেদের হারেমের গর্ব করে। মুঘল সাম্রাজ্যের রৌনক নাকি এখন এসে দাঁড়িয়েছে শরাবের মস্তি আর হারেমের বস্তিতে। এই ভাবলেই আমার রগের ব্যথাটা চড়চড় করে বাড়ে।
কপালে হাত রেখে, মাথা ঝুঁকিয়ে নূরজাহানের কথা শুনছিলেন জাহাঙ্গির। তিনি হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে যেমন তুরন্ত এসেছিলেন, ঠিক তেমনি বেগে বেরিয়ে গেলেন বাইরের মহলের দিকে। ততক্ষণে তিনি মনস্থির করে ফেলেছেন যে, করের বদলে খোজা করার জন্য চাষিবাড়ির যুবকদের নেওয়া বন্ধ করবেন।
বাবা লাহোরির এসব পরিষ্কার মনে আছে, আর জীবনের প্রান্তে এসে সওয়াল উমরের বাবার এও মাথায় আছে যে, বাদশাহ-জাহাঙ্গিরের সেদিনের সেই হুকুমের পরও সিলহট থেকে নওজোয়ানদের খোজা করার জন্য আমদানি রদ হয়নি। সূর্যোদয়-সূর্যাস্ত, জিন্দেগি মওত, কাহিনির শুরু আর শেষের মতো হিন্দুস্তানের এলাকায় এলাকায় গরিবিরও কোনো শেষ নেই। আর যতদিন এই কমবক্ত গরিবি থাকবে ততদিন…
বাবা লাহোরির চিন্তায় ছেদ পড়ল এক নবীন যুবার সালামে। বাবা ওঁর বরফের মতো সাদা চুল-দাড়িতে ঢাকা মুখটা তুলে জিজ্ঞেস করলেন, বেটা, চোখে ভালো করে দেখতে পাইনে। তুমি আরেকটু নজদিক হয়ে বলো তো, তুমি কে?
