মুরারি গর্জাল, খবরদার। গলা ধরবিনি।
ন্যাপা খিঁচিয়ে উঠল, গলা ধরব কীরে! ঘাড় মটকাব। ভালো চাস তো মানে মানে বের হ। মুরারি গেলাস রেখে উঠে দাঁড়াতে ন্যাপা হাতটা সরিয়ে নিল ওর ঘাড় থেকে। আর তক্ষুণি বাইরে গাড়ির হর্ন বাজা শুরু হল। মুরারি প্রচন্ড খেপে খিঁচিয়ে উঠল, হারামির বাচ্চা ড্রাইভার হর্ন দিয়ে ডাকছে। এত বড়ো স্পর্ধা! আমি দেকছি…
বলতে বলতে সিগারেট কেসটা তুলে নিয়ে ঘরের বাইরে পা দিল মুরারি। ওর পকেট গলে এক বাণ্ডিল একশো টাকার নোট পড়ে গিয়েছিল খাটে, সেদিকে চোখ পড়তে মণিবালা বলল, দাঁড়াও। ওই টাকা তোললা, তারপর যাও। এ বাড়িতে কারও ভিক্ষে নেওয়া হয় না। লোকের বাড়িতে এইরকম টাকার টোপ ফেলার কায়দা আমার জানা আছে।
মুরারি থমকে দাঁড়িয়ে, তারপর ঘুরে ওই টাকার দিকে চেয়ে ছদ্ম বিস্ময়ে বলল, আমার টাকাগুলো উপচে পড়ে গেছে বুঝি। ন্যাপা তোড়াটা ওর হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, আজ্ঞে হ্যাঁ, বাবুমশায়। এখন ফেরত নিয়ে ধন্য করেন।
মুরারি টাকাটা হাতে নিয়ে কী ভাবল এক দন্ড, তারপর সেটা মণিবালার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললে, নতুন বে হল তোর। এটা না হয় আমার উপহারই রইল। নেমতন্ন তো করলিনি…
আর তখনই চটাস করে চড়টা কষাল মণিবালা। কিন্তু এবারে মারটা আর আমোদর সঙ্গে হজম করতে পারল না মুরারি। ও রীতিমতো হকচকিয়ে গেল। ন্যাপাও দেখল প্রৌঢ়ের মুখের রসিক ভাবটা দপ করে নিভে গেল। গালে হাত বুলোতে বুলোতে মুরারি বললে, তুই আমার মারলি, মণি?
মণিবালা কথাটার আমল না দিয়ে নতুন বরের দিকে তাকিয়ে হুকুম জারি করল, ওকে গাড়িতে তুলে দিয়ে এসো। আর এক মুহূর্তও আমি এসব সহ্য করব না।
মুরারি টাকাগুলো পকেটে ভরতে ভরতে বলল, তার দরকার হবে না। আমি নিজেই যেতে পারব।
বলেই ঘরের বাইরে পা রাখল মুরারি এবং চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে দড়াম করে পড়ল মেঝেতে। ন্যাপা ওকে ধরে তুলতে যাচ্ছিল, চোখের ইশারায় নিষেধ করল মণিবালা। মুখে বলল, ছেড়ে দাও, ও নিজেই যাবে।
মুরারি দ্বিতীয়বার পড়ল ফ্ল্যাটের দরজায়, তারপর অন্ধকার গলির মাঝমধ্যিখানে। গাড়ির ড্রাইভার দৌড়ে এসে বাবুকে তুলে নিয়ে বসাল যখন পেল্লায় আর্মস্ট্রং-সিডলিতে ততক্ষণে পাড়ার বেশ কিছু জানলার খড়খড়ি ফাঁক হয়ে একরাশ জোড়া চোখ ঘটনার মাপজোক নেওয়া শুরু করেছে।
ফ্ল্যাটের দরজা থেকে লজ্জা আর উত্নষ্ঠার সঙ্গে সব দেখলে ন্যাপা, ওর মনের চোখের সামনে ভাসছে তখন মামা বরদাকান্তের মুখটা। কী সম্মান লোকটার গোটা পাড়ায়। আর কী স্নেহ তাঁর অপদার্থ ভাগনেটির প্রতি। আর তাঁরই বসতিভিটের পাশেই এইসব ঘটিয়ে ফেলল ও।
একটা বিকট ধাক্কার আওয়াজ এল গলির মুখ থেকে। ন্যাপা বুঝতে পারল মুরারির গাড়ি বোধ হয় ব্যাক করতে গিয়ে সপাটে ভেড়াল ওর সদ্য হাজার টাকায় কেনা সেকেণ্ড হাম্বার হকের বনেটে। কিন্তু গলির মুখে যাওয়ার এতটুকু সাহসও আর টিকে নেই। অর্ধেক পাড়া গোয়েন্দাগিরিতে নেমে পড়েছে।
ন্যাপা তাড়াতাড়ি ঘরে এসে ব্র্যাণ্ডির গেলাসে ঢালা মদগুলোকে চোঁ চোঁ করে মেরে দিলে। মণিবালা করছ কী!’ করছ কী!’ বলার মধ্যেই শেষ। মণিবালা মদের পাঁইটটা চট করে হাতিয়ে নিয়ে পাশের ঘরে ছুটে গেল জায়গা মতন সেটাকে সরিয়ে আসতে।
তারপর ফিরে এসে দেখে উলুঢুলু অবস্থার বরটা বিছানায় পড়ে অকাতরে ঘুমুচ্ছে। মণিবালা একবার ভাবল, সত্যিই ঘুমিয়ে পড়ল ছোকরা? কাছে গিয়ে আস্তে ঠেলা মারল, কোথায় কে। দেখল ওর পাজামাটা বিশ্রীভাবে নেমে গিয়ে ফের সেই দিগম্বর দশা। ও চেষ্টা করল সেটাকে তুলে কোমর অবধি আনার, কিন্তু উপায় কী, মড়া মাতলের ওজন নাকি লোহার সমান। মণিবালা সে-চেষ্টা ত্যাগ করে গায়ের চাদর দিয়ে বরকে ঢেকে দিয়ে, লাইট নিভিয়ে এসে সেই চাদরের তলায়ই সেঁধিয়ে গেল। চুমু দিল বরের ঠোঁটে, গালে, কপালে, চোখের পাতার উপর। তারপর দু-বাহুতে তাকে আঁকড়ে ধরে উবুড় হয়ে শুয়ে পড়ল তার বুকের উপর।
কিছুক্ষণ এভাবে থাকার পর মণিবালার মনে হল, কে জানে, এভাবে বুকের উপর শুলে ওর লাগছে হয়তো। বুক থেকে সরে পাশে শুল মণিবালা, কিন্তু আলিঙ্গন মুক্ত করল না। এত ঝড়ঝাপটার পর এত সুন্দর মনের মানুষটাকে পাওয়ায় হঠাৎ কেন জানি না এক অজানা আশঙ্কা তোলপাড় করছে ওর মন। ওর ভয় হচ্ছে পৃথিবী যেন কেড়ে নিতে চাইছে ওর বুকভরা সামান্য সুখ।
অন্ধকারের মধ্যে ফের চোখের জলে বরের মুখে চুমু ছড়াতে শুরু করল মণিবালা। যার কিছুই জানতে পারল না ঘুমে অচেতন ন্যাপা।
ন্যাপার সেই অচেতন ঘুম শেষ হয়েও যেন শেষ হয় না। ও আড়মোড়া ভাঙছিল। লজ্জায় মনটা কুঁকড়ে আছে, বউয়ের দিকেও চাইতে ইতস্তত করছিল, যখন ফ্ল্যাটের দরজায় এসে কড়া নাড়লেন ছোটোমামা চপলাকান্ত।
৩.
বরদাকান্ত বাস্তবিকই সাতসকালে অবনীকে নিয়ে রওনা দিয়েছিলেন কোর্টে যাবেন বলে নয়, কোর্টের একটু অদূরে, গঙ্গার পাড়ের দিকে যাবেন বলে। গঙ্গার পাড়ে এসে অবনী গাড়ি ভেড়াতেই তিনি বললেন, অবনী, একটু চায়ের ব্যবস্থা করো তো।
অবনী জানে বড়োবাবুর কিছু খাওয়া হয়নি সকালে। তাই নীচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, শুধু শুধু চা খাবেন? খাবার কিছু আনব?
বরদাকান্ত বেশ দৃঢ়ভাবে বললেন, না। শুধু চা।
