লোকটা ওই পড়ে থাকা অবস্থায় উত্তর করল, তোর মণিমালার গলার মালা! প্রথম মালা। মুরারি দত্ত!
শোওয়ার ঘর থেকে কিছুটা আলো এসে পড়েছিল জায়গাটায়, সেই আলোয় ন্যাপা ভালো করে দেখার চেষ্ট করল মুরারি দত্তর মুখটা। বুকের মধ্যে তখন শুরু হয়েছে টিপটপুনি মুরারি দত্ত! বলে কী! নাটকপাড়ার কিংবদন্তী মুরারি দত্ত এই রাতে, এইভাবে, এখানে।
ন্যাপা তখনও ভিতরে ভিতরে ঝিমুচ্ছে অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তার যখন শুনল মুরারি ওই শোয়া অবস্থায় কৌটো থেকে সিগারেট বার করে বলেছে, এই নে, একটা ধরা। আর ওই মাগিটাকে বার করে দে, আমি নিয়ে যাই।
ন্যাপা সোজা হয়ে বসে ফাইভ ফিফটি ফাইভ ধরাল মুরারির রুপোর লাইটারে, তারপর লাইটার ফেরত দিতে দিতে বলল, খবরদার মাগি বলবি না মণিবালাকে! ও আমার বিয়ে করা বউ।
অন্ধকার মেঝেতে বসে সিগারেটে মোটা টান দিয়ে মুরারি বলে, মেরেছে। আমার মাগি তোর বউ হয় কী করে বল দিকিনি? দেড় মাস ধরে হ্যাপিত্যেশ করে খুঁজে মরিচি কি আর সাধে? ওকে বাজারে আনলে কে? কোতায় ছিল জানিস ষোলো বছর আগে? কোন গলতায়?
ঠিক তখন আলনা আর তোরঙ্গের ছোট্ট কুঠুরি থেকে লাইট জ্বেলে বেরিয়ে এল মণিবালা। ঘরের আলো পড়ল ন্যাপা আর মুরারির উপর। ন্যাপা দেখল মণির চোখ দুটো জ্বলছে, কিছু কিছু রাগি দুর্গাপ্রতিমার মতো। আঁচলের চাবির গোছা দিয়ে এক বাড়ি মারল মুরারির পিঠে। আর গর্জে উঠল, কোন জন্ম থেকে হাড়মাস চুষে খাচ্ছ, তাতে রস মেটেনি? ফের আমার সুখের সংসারে আগুন ঢালতে এলে?
চাবির পিটুনিতে বেশ সুখ হয়েছে মনে হল মুরারির। চোখ বুজে সিগারেটে দম দিতে গিয়ে বলল, তোর সুখ তো আমার কোঁচায় বাঁধা, মণি। যেখানে আমি, সেখানে তুই। এরা কোখেকে আসে? বলে সামনে বসা ন্যাপাকে নিউকাটমুক্ত খালি পাটা দিয়ে এক লাথি মারল মুরারি।
এ পর্যন্ত সব ঠিকঠাক ছিল, মদের উপর মারামারিতে ন্যাপাও অভ্যস্ত আছে বহুদিন। তা বলে নতুন বউ নিয়ে নোংরা কথা। তার সামনে লাথি। ন্যাপা ‘ধুত্তোর!’ বলে সদ্য ধরানো সিগারেট ছুড়ে ফেলে ঝাঁপিয়ে পড়ল মুরারির উপর। দু-টানে ওর মিহি আদ্দির পাঞ্জাবি ফেঁড়ে ফেলে কোমরে ধুতির গিট ধরে হ্যাঁচকা টান দিল। মুরারি ওঠার চেষ্টা করতেই পিঠে দুটো কিল। প্রৌঢ় মুরারি ‘অফ’! ‘অফ!’ করে সে কিল হজম করলে, কিন্তু ঠেলে উঠলে ঠিক।
ধুতি খুলে খুলে মাটিতে গড়াচ্ছে, গায়ের জামা রথের গায়ে কাগজের পতাকার মতো পতপত করে উড়ছে, মুরারি এক পায়ে নিউকাট নিয়ে শোওয়ার ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল, এই তোর সাধের সংসার, মণি? আমার বারটেণ্ডার গোমেসও তো এর চেয়ে ভালো পালঙ্কে শোয়! তোর ও ছোকরা করেটা কী?
মুরারি ধপাস করে বসে পড়ল খাটে। তারপর পাশের টিপয়ে ব্র্যাণ্ডির পাঁইট দেখে উৎফুল্ল হয়ে বলে উঠল, ওরে এ তো তৈরি ছেলে বাপ, মালঝালও খায়। তা হলে বোস এখানে, খা আমার সঙ্গে দু-পাত্তর, বুঝবি মণিমালার বাবু হতে কী লাগে।
ন্যাপার ভয়ানক ইচ্ছে হচ্ছিল খাটের নীচের চপ্পলটা বার করে ফের প্রহার শুরু করে, কিন্তু মণিবালার প্রথম বাবুর কেরামতির কিছু জানার প্রবল বাসনারই জয় হল। ও চোখের ইশারায় বউকে অন্য ঘরে যেতে বলে দুটো ব্র্যাণ্ডির পেগ সাজিয়ে মুরারি দত্তর পাশে এসে বসল।
মুরারি প্রথম চুমুকটা দিয়েই বলল, শুনে রাখ, আমি প্রথম, তুই দুইও নস, তিনও নস, চারও নস, একেবারে পঞ্চম। পঞ্চম বাবু।
ন্যাপা মুরারির কৌটো থেকে একটা সিগারেট বার করে ধরিয়ে বলল, তোরা বাবু, আমি বাবু নই। স্বামী।
এবার মুরারি টান দিল সিগারেটে, ওই হল। বাবু আর স্বামীর ফারাক ডিকশনারি বলবে, আমি পারিনে, একটু সিঁদুর মাখালেই যদি…
হঠাৎ হাউ হাউ কেঁদে উঠল মুরারি দত্ত। ন্যাপ ভাবলে এ আবার কী শুরু করল মাতালটা। কাঁদতে কাঁদতে মুরারি বলল, ওই সিঁদুর সিঁদুর করেই তো মলো এই মেয়েছেলেগুলো। আর যাকে সত্যি সত্যি সিঁদুর মাখিয়ে বউ করে ঘরে তুলেছিলাম সেই হেমন্তবালা তো গলায় দড়ি দিয়ে কবেই মরে গেল।
ফের হাউ হাউ কান্না জুড়ল মুরারি ; ধৈর্যের বাঁধ ভাঙছিল ন্যাপার। সে ওর মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে সান্ত্বনা দেওয়ার সুরে বলল, এত গন্ডা মাগ রাখলে বাপ বউ তো গলায় দড়ি দেবেই।
তখন মুহূর্তের জন্য কান্না থামিয়ে মুরারি বলল, তুই বলছিস? ন্যাপ মাথা দুলিয়ে বোঝাল ‘হ্যাঁ।
সঙ্গে সঙ্গে ন্যাপার হাত দুটো চেপে ধরে কান্নার সুরেই মুরারি বলল, তা হলে বাপ তুই মণিমালাটাকে ছেড়ে দে, ওকে আজ সিঁদুর পরিয়ে বিয়ে করেই নিয়ে যাব।
এরকম একটা আবদার যে কোনো মানুষ কারও বউকে নিয়ে করতে পারে এটাই ন্যাপার কল্পনার বাইরে। ও কয়েক মুহূর্ত চুপ মেরে রইল তারপর সেই বিস্ময়ে বিহ্বলকণ্ঠে বলল, তুই আমার বউকে বিয়ে করে নিয়ে যাবি? এটা হয়?
কান্নাটাকে একটু সামলে নিয়ে মুরারি বলল, কেন হবে না? তুই ওকে ছেড়ে দিলেই হবে। ন্যাপা কিছু বলার আগে ঘরে ঢুকে এসেছে মণিবালা। কোমরে হাত রেখে মুরারিকে বলল, শয়তান মিনসে, তুমি জানো সিঁদুরের কী মূল্য। ভেবেছ আমায় সিঁদুর মাখিয়ে তোমার বাগানবাড়িতে নিয়ে ফিরবে? বেরোও। না হলে আমি পুলিশ ডাকব। বেরোও।
ন্যাপার হঠাৎ সংবিৎ ফিরেছে, ও বলল, পুলিশের কী দরকার। আমিই মেরে ভাগাচ্ছি। বলেই ন্যাপা দাঁড়িয়ে মুরারির ঘাড় ধরল।
