অবনী চায়ের খোঁজে বেরোতেই বরদাকান্ত ওঁর পাশের দরজাটা খুলে দিয়ে কোটের পকেট থেকে থ্রি ক্যাসলসের টিন বার করলেন। তারপর তার থেকে একটা সিগারেট ঠুকে ঠুকে বার করে ধরালেন। গঙ্গার ধারে সকালের নির্মল হাওয়ায় এক বুক ধোঁয়া টেনে আস্তে আস্তে সেটা বার করতে লাগলেন। গঙ্গার দিকে চোখ মেলতে, নীল আকাশের দিকে দৃষ্টি যেতে, নদীর মাঝখানে নোঙর করা মালবাহী ব্রিটিশ জাহাজ এস এস রসিটারের উপর চোখ পড়তে হঠাৎ তাঁর বড় সুখ আর আনন্দ হল। সকালের গঙ্গাদর্শন ওঁর ছেলেবেলার নানা স্মৃতি ভেসে উঠল খুলনা শহরের। যখন সূর্যোদয়ের আগে রূপসা নদীর পাড়ে বসে ওপারের সবুজ খেত আর জলের উপর পালতোলা নৌকার মিছিল দেখে বড় আহ্লাদ হত। একবার কী মনে করে বেরিয়েও পড়েছিলেন অমন এক নৌকায় উজানের দিকে। আর কত কত সকাল যে স্নানে কেটেছে রূপসার জলে। কী তরতাজা, পবিত্র লাগত নিজেকে ওই সব স্নানের পর।
আজও তেমনই এক পবিত্রতার ছোঁয়া লাগছে বরদাকান্তের বুকে। বেশ তাজাও বোধ করছেন; কিন্তু গালে এক অলক্ষ্য অস্বস্তি। রাগের মাথায় নাপিত দেবেনকে ডেকে দাড়িটা কাটানো হয়নি। আর রোজ সকালে দাড়িটায় শেফিল্ড খুরের পোঁচ না পড়লে বরদাকান্তের মনেই হয় না দিনটা শুরু হয়েছে বলে।
সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে তিনি গালে হাত বুলোলেন একটু, তারপর নিবিষ্ট চিত্তে নদী দেখতে লাগলেন। একটা মাঝারি সাইজের লঞ্চ তরতর করে ছুটে গেল ‘ভোঁ’ তুলে। কয়েকটি ছোকরা সাঁতারের জন্য ঝপঝপ করে লাফ মারল জলে। একটা চিল ছোঁ মেরে তুলে নিয়ে গেল কী একটা পাড়ের নৌকার ছই থেকে। কোথেকে কখন একটা ভিখিরি এসে হাত পাতল, বাবু! বরদাকান্ত পকেট থেকে দুটো সিকি বার করে হাতে দিতে যেতে সে হাত সরিয়ে নিল। না বাবু, ভিক্ষে চাই না। একটা সিগারেট খাওয়ান।
বরদাকান্ত চমকে উঠলেন, সিগারেট। বলি, কিছু খাওয়া হয়েছে?
ভিখিরি তাপ-উত্তাপহীনভাবে বলল, না, বাবু।
বরদাকান্ত উম্মার সঙ্গে বললেন, তা হলে খাবার না চেয়ে সিগারেট চাইছ কেন?
ভিখিরি সেই পূর্বের ধরনেই বলল, তা হলে দিন।
বরদাকান্ত ডেকে সিকি দুটো দিলেন, তারপর দুটো থ্রি ক্যাসলস সিগারেট দিয়ে বললেন, এই সিগারেটের দাম কত জানো?
ভিখিরি বলল, না বাবু। কত?
বরদাকান্ত দামটা বলতে গিয়ে কী বুঝলেন, থমকে গেলেন। শুধু বললেন, ঠিক আছে, তুমি যাও।
আর তখনই একটা আধসেরি ভাঁড়ে গরম চা নিয়ে ফিরল অবনী। চায়ে চুমুক দিয়ে বড় তৃপ্তি হল বরদাকান্তর, জিজ্ঞেস করলেন অবনীকে, তোর চা কই?
অবনী বলল, আমি তো বড়োবাবু একবারই চা খাই, ওই ভোরে।
বরদাকান্ত বললেন, হুঁ।
চায়ে ফের চুমুক দিয়ে বললেন, তা তুই বাইরে দাঁড়িয়ে রইলি কেন?
অবনী বিব্রত মুখে আমতা আমতা করা শুরু করল। আসলে … আপনি তো বসে তো… চা খাচ্ছেন…
ওর কথার মধ্যেই বরদাকান্ত হঠাৎ জিজ্ঞেস করে বসলেন, কাল রাতে কী হয়েছিলরে
ন্যাপার ওখানে?
অবনীর পা থেকে মাথা অবধি কারেন্ট খেলে গেল। বড়োবাবু ওকে জিজ্ঞেস করছেন কাল রাতের হুজ্জোতির উপর! কী বলতে কী বলে ফেলবে ভেবে ও কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। কান চুলকোল, ঘাড়ের কাছে হাত বুলোল। শুনাল, ফের জিজ্ঞেস করছেন বড়োবাবু; বললি না, কী হল কালকে?
অবনী একটু কেশে নিয়ে বলল, বাবু, ওই ন্যাপাদার যে বউ তার আগের বর নাকি এসে খুব হুজ্জোতি করেছে।
সংবাদে গুম মেরে গেলেন বরদাকান্ত। শেষ চুমুকটা দিয়ে ফের একটা লম্বা টান দিলেন সিগারেটে আর নদীর দিকে মুখ ঘুরিয়ে রসিটার জাহাজের বিশাল বিশাল চিমনিগুলো দেখতে লাগলেন।
অবনীর মনে হল যতটা সম্ভব ন্যাপাদাকে বাঁচানো গেছে, কিন্তু ও মা! ওভাবে জাহাজ দেখতে দেখতে বড়োবাবু ফের জিজ্ঞেস করলেন, তা হলে মেয়েটার আগেও বিয়ে ছিল?
অবনী বলল, তাই তো শুনেছি। বড়োবাবু।
-বয়সেও তো ন্যাপার চেয়ে বড়ো?
—তাও শুনেছি।
–হুম! আর কী শুনেছিস?
কান চুলকোতে চুলকোতে অবনী বলল, শুনেছি বউ নাকি দেখতে খুব সুন্দর।
বরদাকান্ত মুখে একটা বিরক্তিকর ধ্বনি তুলে সিগারেটটা ছুড়ে দিলেন বাইরে আর বললেন, নে চল।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অবনী বলল, কোথায় বড়োবাবু?
বরদাকান্ত বললেন গ্রেট ইস্টার্নে। ব্রেকফাস্ট করব।
অবনী গাড়ি ছোটাতে বরদাকান্ত ওঁর গ্ল্যাডস্টোন ব্যাগ থেকে দিনের কাগজটা বার করে পড়া শুরু করলেন।
দরজা খুলেছিল মণিবালা। চপলাকান্ত মণিবালাকে দেখে দু-দন্ড স্থির হয়ে দাঁড়ালেন। আহা রে, সেই চোখ, সেই চাহনি, সেই স্নিগ্ধ হাসির ছোঁয়া ঠোঁটে, গালে সেই টোল। ঘোমটা-টানা নত মুখে মণিবালা যখন নিম্নস্বরে বলল ‘আসুন!’ চপলাকান্ত তখনও মণিবালার মধ্যে মঞ্চ ও রুপোলি পর্দার সেই নায়িকাকেই দেখছিলেন। মনে পড়ল বন্ধু রঘুনাথের সঙ্গে ‘সীতা’ আর ‘ষোড়শী’ নাটকে মণিবালাকে দেখে কী মুগ্ধই না হয়ে পড়েছিলেন দু-জনে। তারপর কার মুখে শুনলেন ‘মিশরকুমারী’ নাটকেও আবনের কন্যার ভূমিকায় মণিবালা নাকি শ্বাসরুদ্ধকর কাজ করেছে। ব্যাচেলর চপলাকান্তের মুখে মণিবালার রূপ ও অভিনয়ের প্রশংসা শুনে তাস খেলতে খেলতে আনমনে বরাদাকান্ত একদিন বলে বসেছিলেন, কার কথা এত বলছিস রে চপলা ক-দিন যাবৎ?
লজ্জায় পড়ে চপলাকান্ত যেন প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়েছিলেন।
