খাবার টেবিলে টোস্ট, অমলেট, কফি রাখা হল, বরদাকান্ত সেদিকে দৃকপাতও করলেন । গ্যালিজ দেওয়া প্যান্ট পরে গলায় টাই গলালেন, আনমনাভাবে বুরুশ দিয়ে কোঁকড়া চুলগুলোকে সামান্য বশে এনে কোট চাপালেন, তারপর সাদা মোজামোড়া পা দুটো কালো পাম্পশুয়ে গলিয়ে হাঁক দিলেন, অবনী!
অবনী তখনও ঘরে পৌঁছেছে কি পৌঁছোয়নি; শুনতে পেল বড়োবাবু বলছেন, গাড়ি বার কর, আমি বেরুব।
অবনী অবাক হল দেওয়ালের ঘড়ি দেখে, মোটে তো পৌনে সাতটা। এখন আবার কোর্ট কীসের। কিন্তু বড়োবাবুকে প্রশ্ন করবে সে কলজে কার! ও ‘আসছি’ বলেই পরনের লুঙি ছেড়ে পায়জামা গলাতে গেল। বরদাকান্ত টেবিল থেকে বেছে বেছে দুটো ফাইল তুলে নিয়ে বাড়ির বাইরে রওনা হলেন। চপলাকান্ত স্নান সেরে যখন ঘরে এলেন তখন বেজায় আওয়াজ করে দাদার গাড়ি গেট থেকে রওনা দিল। সাতসকালে কোথায় যে গেলেন দাদা ঈশ্বর জানেন। টেবিলে পড়ে থাকা দাদার না-খাওয়া ব্রেকফাস্ট দেখে প্রথমে খিদে উবে গেল চপলার, পরমুহূর্তে সেই খিদেটাই যেন সবেগে ফিরে এল, তিনি ‘ইস, দাদাটা খেলও না!’ বলতে বলতে দাদার খাবারটা খাওয়া ধরলেন। আর তারপর দাদার কফিতে চুমুক দিতে দিতে চোখের সামনে ভাসতে দেখলেন ন্যাপার তরুণ, সুদর্শন, অসহায়, পাপী-নিস্পাপ মুখ। পাশ থেকে শুবলেন বউদি বলছেন, ঠাকুরপো, তুমি ন্যাপাকে ও বাড়ি থেকে এক্ষুণি পার করে এসো। না হলে দাদা ফিরলে লঙ্কাকান্ড বাধবে।
ধুতির উপর সাদা শার্ট চড়ানো হয়ে গেছে। চপলাকান্তের। পায়ে সাইডকাট পাম্পশু। ওর অফিস ড্রেস। কিন্তু অফিসে যাওয়াটাই আজ সমস্যার হবে। সাইড পকেটে মানিব্যাগ খুঁজতে খুঁজতে চপলা বললেন, তুমি এসব কবে শুনলে বউদি? মালিনী বললেন, সেই যবে ঘটছে।
—সে কী! অথচ আমাদের কিছু বললে না?
–বলে কী হত? ভেবেছিলাম রস মিটলে আপনা-আপনি চুকে যাবে। তো…
–তো?
–কই আর মিটল?
–তোমাকে এসব কে বলল?
—কেন, ন্যাপা নিজে।
–ন্যাপা নিজে?
-হ্যাঁ ও-ই। এসে বললে, মামি, তোমার জন্য বউ এনেছি। বায়োস্কোপের হিরোইন। পছন্দ? বললাম, তোর কি মাথাটা গেল শেষে? এ বাড়িতে বায়োস্কোপের হিরোইন। ও কীরকম গোমড়া মুখ করে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ ; তারপর কিছু না বলে চলে গেল। কিন্তু সত্যি বলছি ঠাকুরপো, ভীষণ লোভ হয়েছিল একবারটি ঢু মেরে দেখে আসি। বায়োস্কোপের নায়িকা বলে কথা। আর মোটে তো পাশের বাড়ি।
-তাই গেলে?
-একদিন দুপুরে গেলাম বই কী। কাউকে না জানিয়ে। আর গিয়ে কড়া নাড়তে দোর খুলল কে জানো?
—সেই নায়িকাই, আবার কে?
—হ্যাঁ, সেই নায়িকাই। মণিবালা। দুর্গাদাস, প্রমথেশের মণিবালা। আমি অবাক হয়ে নায়িকাকে দেখছি, আর সে দেখছে আমাকে। হঠাৎ পিছন থেকে ন্যাপা বললে মণি, এটা মামি। তখন মাথায় ঘোমটা টেনে প্রণাম করতে নীচু হল মণিবালা। কিন্তু ওর প্রণাম আমি নিতে পারিনি; কেন নেব? কতদিন সিনেমার পর্দায় ওকে দেখে দেখে বড়ো বড়ো নিঃশ্বাস ফেলেছি। ওর ডিজাইনে চুলে খোঁপা দিয়েছি। কানের ঝুমকো কাটিয়েছি। তা বলে বাড়ির বউ করব তো ভাবিনি। তাও ন্যাপার…
-ন্যাপার থেকে কত বড়ো হবে মহিলা?
—তা বছর সাতেক তো বটে।
—অপূর্ব। তা কেমন দেখলে মহিলাকে?
–বড় সুন্দরী রে।
–কেমন মানায় তোমার ভাগনের সঙ্গে?
—কী আবার মানাবে হাঁটুর বয়েসি ছেলের সঙ্গে। ওই প্রমথেশ, দুর্গাদাসের সঙ্গেই ঠিক আছে। এবার খুব গম্ভীর হয়ে উঠল চপলাকান্তের গলা। বললেন, তা এখন কী করতে বলো বউদি?
মালিনী অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে শেষে স্বগতোক্তির মতো বললেন, আসলে বিয়ে হয়ে গেছে তো। হিন্দু নারী বলে কথা…
মালিনী তাঁর কথার সমর্থন খোঁজার জন্য ঠাকুরপোর দিকে মাথা ঘোরালেন। কিন্তু কোথায় ঠাকুরপো? বউদির কথার মাঝখানেই পকেট চিরুনিতে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ঘর থেকে বেরিয়ে উদাসভাবে কোথায় যে যেতে শুরু করেছেন চপলাকান্ত তা তিনি নিজেও জানেন না।
২.
বেলা দেড়টা নাগাদ চপলাকান্ত যখন এসে কড়া নাড়লেন গুপ্তবাড়ির একতলার ফ্ল্যাটে, ন্যাপা তখন সবে আড়ামোড়া ভাঙছে। মণিবালা কাজের মেয়েটাকে দিয়ে ডাল ভাত আলুসেদ্ধ আর ডিমের ডালনা করিয়ে রেখেছে, কিন্তু কর্তাটিকে ডাকার চেষ্টা করেনি। কাল সারাটা রাত যা গেছে বাবুর।
ন্যাপার আর সাহসে কুলোচ্ছিল না ঘড়ির দিকে চাওয়ার। ছি! ছি! ছি! কী যে একটা রাত গেল। কখন যে কীভাবে বিছানায় পড়ে জ্ঞান হারিয়েছে মনেও পড়ে না। কাঁথার ভিতর হাত চালিয়ে আণ্ডারওয়ারটার পরিস্থিতি যাচাই করতে গিয়ে আঁতকে উঠল ন্যাপা। ও মা, ও যে কাঁথার নীচে দিব্যি দিগম্বর!
সঙ্গে সঙ্গে বিছানা থেকে লাভ মেরে উঠে আলনা থেকে ফরসা পাজামাটা নিয়ে তাতে পা গলিয়ে ফেলল ন্যাপা। হ্যাঁ, মনে পড়ল, এই ছিল কাল রাতের সমস্যা। পাজামার দড়ি নেই। ফলে পাজামা রেখে আণ্ডারওয়ার চড়াতে গিয়ে শুনল মণিবালা বলছে, দোহাই তোমার, ওই ছাড়া আণ্ডারওয়ার পরে শুয়ো না। তার চেয়ে ওই ধুতিটাই লুঙ্গি করে নাও। ঢের ভালো।
ন্যাপা তখন সবে লুচি-মাংস শেষ করে নাইটক্যাপ হিসেবে এক পেগ ব্র্যাণ্ডি নিয়ে বসেছে, সে বললে, মণি, জন্মেও শুনেছে কেউ আণ্ডারপ্যান্টে ব্র্যাণ্ডি খাচ্ছে! ও তোমাদের বায়োস্কোপের গবেটরা করে। তার চেয়ে আমি ন্যাংটা শিব হবে ব্রাণ্ডি খাব।
