রেডিয়ো ধরার অর্থ আরেকটু এগিয়ে পড়া খবর ধরা, তাতে অন্তত যদি নতুন কোনো পরিস্থিতির আভা মেলে। রেডিয়ো ধরো মানেই আবার বিবিসি ধরা কারণ সাহবদের ওই রেডিয়ো নাকি গভীর সংকটে পড়েও সহসা মিথ্যে রটায় না। মিত্রশক্তির হেনস্থার বার্তায় খুব দমে যান বরদাকান্ত, কিন্তু তারই মধ্যে ওই অন্ধকারে, কিছুটা সমীহে আক্রান্ত হন জার্মানদের প্রতি। কী প্রবল প্রতিভা এই একটি দেশের। তখন ভাই চপলাকে বলেন, জানিস চপল, জার্মানরা দিনে আঠারো ঘণ্টা পড়াশুনো করে। না, তুই মূখ, তুই এটা ভাবতেও পারবি না।
ভাই চপলাকান্ত কোনো অর্থেই মূখ নন, যদি অকৃতদার থাকাটা কোনোভাবে মূখামির ইঙ্গিতবহ না হয়, কিন্তু তিনি দাদার এই নিত্যভৎসনার প্রতিবাদ করারও কারণ দেখেন না। প্রতিবাদ না করেও দাদাকে উসকে দেওয়ার রাস্তা তাঁর জানা আছে, তাতে দিব্যি জ্ঞান লাভ হয়। তিনি সেই পথই ধরলেন। বললেন, যারা সারাক্ষণ যুদ্ধ করে বেড়ায় তারা আঠারো ঘণ্টা সময়টা পায় কোত্থেকে?
আর যায় কোথায়! দপ পরে জ্বলে উঠে বরদা বললেন, এবার বোঝ, কেন তোকে আমি সারাক্ষণ মুখ বলি।
চপলা মিটিমিটি হেসে বললেন, বুঝলাম।
বরদাকান্ত আরও খেপে উঠে বললেন, কোথায় বুঝলি? তুই জানিস আজকালকার যুদ্ধে একটা সামান্য ইনফ্যান্ট্রিম্যানকেও কতখানি বিদ্যে ধরতে হয়? বারো আনা যুদ্ধ কেবল ম্যাপের উপর ছক কষে জেতা হয়ে যায়, জানিস? জার্মান সেনাদের বস্তা ঘাঁটলে দু-চারটে দর্শন কি অঙ্কের বই বেরিয়ে পড়বে দেখিস।
চপলা আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করলেন, আর ব্রিটিশদের?
কীরকম চোখ বুজে আসছিল বরদাকান্তের। স্মৃতিতে ভারী হয়ে আসা চোখ দুটোকে কোনোমতে মেলে ধরে কী এক আবেগের সঙ্গে বললেন, ও-ও এক অপূর্ব জাত, চপল। মেধা আর শ্রম মিশে ভয়ানক সাত্ত্বিক জাত। এই যুদ্ধে ওরা আমার অর্জুন।
চপলা প্রশ্ন করলেন, আর জার্মানরা?
প্রায় অন্যমনস্কভাবে বরদা বললেন, আমার কর্ণ।
আজকের কাগজে মিত্রশক্তির ফ্রান্সের নর্ম্যাণ্ডি তটে অবতরণের বিস্তৃত খবর। এতে বরদাকান্তের হৃদয়ে ব্যাপক উত্তেজনা ঘটার কথা, কিন্তু ভদ্রালোক কীরকম ব্যথায় ও বিভ্রান্তিতে ঝিম মেরে আছেন। এক অন্য যুদ্ধের উত্তেজনা একটু একটু করে লয়ে বাড়ছে তাঁর শরীরের তাবৎ তন্ত্রীতে। কাগজ চোখের সামনে মেলে ধরেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে তিনি ঢুকতে পারছেন না। কাল রাতের ঘটনার সামান্য আভাসই তাঁকে ভিতরে ভিতরে পেড়ে ফেলেছে। চায়ের কাপে প্রথম চুমুকটা দিয়েই তাঁর মনে হল এক্ষুণিই হারামজাদা ভাগনে ন্যাপাকে ধরে খড়মপেটা করা দরকার। শুধু মার নয়, একেবারে তুলোধোনা।
এমনটা ভাবতেই পায়ের খড়ম নাচানো শুরু হয়ে গেল বরদাকান্তের। তিনি ফের এক চুমুক চা খেয়ে একটা থ্রি ক্যাসলস ধরিয়ে চেষ্টা চালালেন বিশ্বযুদ্ধে ঢাকার; কিন্তু তাতে ভিতরের যুদ্ধটা আরও বাড়ল। ন্যাপা শেষকালে কিনা বায়োস্কোপের মাগ ধরেছে। বরদাকান্ত ‘ধুত্তোর’ বলে একই সঙ্গে কাগজ আর সিগারেট ছুড়ে ফেলে কলতলার দিকে হাঁটা দিলেন।
দাদার ছুড়ে ফেলা কাগজটা কুড়িয়ে নিয়ে এবার সেটার হেডলাইন নজর বোলাতে লাগলেন চপলা। কিন্তু তাঁরও মনে উত্তেজনা ন্যাপাকে নিয়ে, শেষমেষ কী যে হয় কোথেকে কে জানে। তিনি ডাক দিলেন, অবনী!
কিন্তু ড্রাইভার অবনীর সঙ্গে জুটে গেল দাদার সেরেস্তার ছোকরা গৌরও। দু-জনাই যেন মুখিয়ে ছিল মুখ খোলার জন্য। বেশ চাপা স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, কাল রাতে ব্যাপারটা কী ঘটেছে বলত অবনী?
অবনীর আগেই মুখ খুলল গৌর, আর বললেন না মেজোবাবু, ন্যাপাদার যা কান্ড! মুখে আনা যায় না।
চপলা দ্রুত চালে কিন্তু সেই চাপা স্বরে বললেন, না বলার কী আছে! ন্যাপা মেয়েছেলে ধরে এনেছে তো? সে তো কদিন ধরেই শুনছিলাম, সে আর নতুন কথা কী।
গৌর এবার চপলার কানের কাছে মুখ ঝুঁকিয়ে নীচু গলায় বললে, শুধু ধরেনি মেজোবাবু, বিয়ে করেছ।
চপলা চমকে উঠলেন রেডিয়োর তারে শক খাওয়ার মতন, অ্যাঁ। বিয়ে করেছে? সে মেয়ে কে?
এবার অবনী বলল, বায়োস্কোপের মণিবালা।
বায়োস্কোপের মণিবালা! তাকে বিয়ে করে পাশের বাড়িতে তুলেছে ন্যাপায় এক পয়সা আয় নেই, দাদার টাকায় ওপেনহুড হাম্বার গাড়ি কিনে বসেছে, আর এখন বিয়েটাও সেরে ফেললে ছোকরা! চপলাকান্তের পায়ের খড়ম আপনা থেকে নাচতে শুরু করল। গোটা সমাচার দাদার কানে গেলে যে দক্ষযক্ষ বাধবে তার আশঙ্কাতেই বাঁ-হাতটা মড়মড় করতে লাগল চপলার। তিনিও কাগজ ফেলে মাথায় তেল ছুইয়ে কলতলায় ছুটলেন। লোকে আপিস কাটে, চপলাকান্ত বেগতিক দেখলে বাড়ি কেটে অপিস পালান।
কিন্তু কলতলায় পড়বি তো পড় সাক্ষাৎ দাদার সামনে। কলতলায় চাতলাজুড়ে দাদা বসে, তাঁর মাথায় বালতির পর বালতি জল ঢালছে বড়ঠাকুর। ভাইকে দেখে বরদা বললেন, শুনেছিস? চপলা বললেন, হুঁ।
-কী শুনেছিস?
–কাল কী সব গোলমাল করেছে ন্যাপা।
–ও কি ড্রিঙ্ক করে?
–বোধ হয়।
–আর?
—বোধ হয় একটা বিয়েও করেছে।
-বিয়ে! বিস্ময়ে বিস্ফোরিত হয়ে মেঝে থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়ালেন বরদাকান্ত। ন্যাপা বিয়ে করেছে? তোয়ালে দিয়ে গা মোছানোর জন্য পিছু পিছু ছুটছে বড়োঠাকুর, বরদাকান্ত ভিজে কাপড়ে, ভিজে গায়ে হন হন করে চলতে লাগলেন ঘরের দিকে। মুখে কোনো কথা নেই।
