আর ফুঁয়ের ঝাপটা থেকে রেহাই পেলেই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠছিলেন, তুমি নেমকহারাম চুনীলাল। তুমি আমারে চেনতি পারলা না। তুমি আমার কাছে অঙ্ক শিখেসো, ধাতু শিখেসো, তোমার পৈতে দিসি আমি। আর তুমি আমারে মোক্তার মোক্তার কও।
প্রায় ঘণ্টা খানেক এই চলল। থেকে থেকে পরসাদী বলে, ঠাকুরমশাই, আপনি পিন্ডি লিবেন তো বলিয়ে দিন। না তো এইভাবে আপনাকে মার দিবে হম। এখন বোলেন, আপনি যাবেন কি নহি।
মোক্তারের শরীর ততক্ষণে ঝিমিয়ে এসেছে। চোখগুলো কোটর থেকে যেন ঠিকরে বেরুবে। আর ওই চাহনি। ওই চাহনি আমি পন্ডিত মশাইয়ের চোখে দেখতাম যখন বুক-ভরা শ্লেম্মা নিয়ে তিনি ক্রমান্বয়ে খক খক করে কেশে চলতেন। আর ওই কাশিতে ওঁর বুকের পাঁজর পর্যন্ত থরথর করে কাঁপত। শেষে প্রায় কাঁদতে কাঁদতে মোক্তার বললেন, অরে, তোরা আমায় পিন্ডি দে। আমি আর পারিনে। বলেই মুখ বাড়িয়ে বিড়ালের ভঙ্গিতে মোক্তার জলের ঘটি উলটে দিলেন।
আর সহ্য করতে না পেরে বাবা ‘ধুত্তোর!’ বলে উঠে পড়লেন। আমার হাত ধরে হ্যাঁচকা টান মেরে বললেন, চলো। তারপর ফের সেই হ্যারিকেন, ছাতা আর আমার হাত ধরে বাড়ির দিকে হাঁটতে থাকলেন বাবা। কয়েক পা এগোতেই প্রচন্ড তোড়ে বৃষ্টি নামল আর সেইসঙ্গে হাওয়া। বাবা ছাতাটা যতখানি সম্ভব আমার মাথার দিকে হেলিয়ে দিয়ে বললেন দেখো মাথায় জল লাগিয়ো না। অসুখ করবে। কোনো একসময় হ্যারিকেনটাও হাওয়ার ঝটকায় নিবে গেল। বাবা গ্রামের মানুষদের মুন্ডপাত করতে করতে এগোতে লাগলেন। এসব মানুষের কোনো উন্নতি নেই খোকা। এরা নিজেদের কুসংস্কার নিয়েই জন্মেছে, আর তাই নিয়েই মরবে। এরা বিজ্ঞানের বিচার থেকে কিছুই কোনোদিন শিখবে না। এরা নিজেরাই একেকটা ভূত।
আমাকে বাঁচাতে গিয়ে গোটা রাস্তাটা বাবা জলে ভিজলেন। ঘুটঘুটে অন্ধকারে আমরা রাস্তা হারালাম। যেদিকেই যাই সেই বেনেদির চকে এসে পড়ি। শেষে ক্লান্ত সিক্ত বাবা ‘ওফ’ বলে এক গাছের তলায় বসে পড়লেন। আমি বাবার গায়ে হাত দিয়ে বললাম, বাবা ওঠো, জ্বর হবে। আমার চোখ ফেটে তখন জল আসছে। কী মরতে শেতলাদির কথা বলেছিলাম বাবাকে! এই ভাবতে ভাবতে আমার চোখ দিয়ে পিচকিরির মতন জল ছুটল। ওই অন্ধকারে আমার চোখ দেখতে না পেয়েও বাবা বুঝলেন আমি কাঁদছি! হ্যারিকেনটা এক পাশে সরিয়ে রেখে আমার চোখ মুছোতে মুছোতে বললেন, ছিঃ! তুমি কাঁদছ কেন? আমার তো বেশ ভালোই লাগছে, কতকাল বৃষ্টিতে ভিজিনি। অবাক হয়ে গেলাম বাবার ওই কথায়। কিছুক্ষণ আগে এই বাবাই বলেছিলেন গায়ে জল না লাগাতে, অসুখ হবে। আর এখন!
বাবা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি এখনও ভূতে বিশ্বাস করো?
-না করি না।
প্রায় সোয়া ঘণ্টা পরে জল থামল। বাবা আর আমি যখন শেষরাতে পৌঁছোলাম তখন বাড়ির সবাই গোটা গ্রাম চষে ফেলেছে ওই ঝড়বাদলায়! আমাদের দেখতে পেয়ে কী হয়েছে! কী হয়েছে? করে প্রায় তেড়ে এল সবাই। বাবা গম্ভীর মুখে বললেন, কিছু না। আমাদের একটা করে গামছা দাও। গা মুছি। আর একটু দুধ দিয়ে।
দুধ খেয়ে আমরা যখন শুলাম তখন ভোর হয় হয়। ওদিন ভোরে আর উঠতে হবে না জেনে বেশ মজাই হচ্ছিল। কেবল বাবা একটু মিইয়ে পড়লেন সকালের কাজ পন্ড হবে ভেবে। বেলা দশটায় আমি যখন বিছানা ছাড়লাম বাবার তখন বেদম জ্বর। জ্বরে কেবল ভুল বকছেন, আমি বিশ্বাস করি না। ভূত থাকতে পারে না। তোমরা উজবুক, আহাম্মক, রাসকেল। তোমরা নিজেরাই ভূত।
দুপুরে গ্রামের বদ্যি এল, বিকেলে সদরের। দু-জনেই মাথায় হাত দিয়ে বসল। রোগ ধরা যাচ্ছে না। কেবল জ্বরের বড়ি খাইয়েই মানুষটার তো চিকিৎসা হতে পারে না। কে না কে পরামর্শ দিল ওঝা ডাকার। আর অমনি রুখে দাঁড়ালেন কাকা। না, দাদা যাতে বিশ্বাস করেন তা দিয়ে ওঁর চিকিৎসা হতে পারে না। ওঝা, ফকির দিয়ে ওঁর চিকিৎসা হবে না।
সেই সন্ধ্যেতেই বাবাকে খুলনার সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল গাড়ি করে। সারাটা রাত ওখানে বসে রইলেন বাড়ির সকলে। কেবল আমাকে নিয়ে ফিরে এলেন জেঠিমা। একলা ঘরে রাতে শোয়ার আমার আর ভয় নেই। কোনো অন্ধকার, কোনো পৈশচিক ছায়া, কিংবা রহস্যের আওয়াজ আর আমাকে ডরাতে পারবে না। আমার যেন ভূতেই বিশ্বাস চলে গেছে। গোটা রাত আমার কেবল বাবাকেই মনে পড়ছিল। গাছের তলায় বসে থাকা ক্লান্ত বাবাকে।
সকালে হাসপাতালে গিয়ে শুনলাম বাবার জ্বর ক্রমশ বাড়ছে। প্রচুর ভুল বকছেন ঘুমের মধ্যে। আমি কেবিনে ওঁর পাশে গিয়ে দাঁড়াতে এক মুহূর্তের জন্য ওঁর চোখ খুলল। আমার দিকে মাথা ঘুরিয়ে বললেন, এসেছ?
তারপর চোখ বুজেই হাতড়ে হাতড়ে আমার হাতটা ধরলেন।
বললেন, নেই। এবং তারপর আবার পাশ ফিরলেন, বললেন— নেই। এর পর আর বাবা পাশ কাটিয়ে ফিরলেন না। কিছু উচ্চারণও করলেন না। একটা শিশুর মতন বাঁপাশে হেলে বরাবরের মতন ঘুমিয়ে পড়লেন। ওই দিন প্রায় ওই সময়টাতেই মোক্তারকাকু ভালো হয়ে ওঠেন। সবাই বলল পন্ডিতমশাই মোক্তারকে ছেড়ে নিজের প্রিয় ছাত্র চুণিলালকে নিয়ে স্বর্গে চলে গেলেন। ওরকম অবান্তর কথা শোনারও আমার আর ধৈর্য ছিল না। এক রাত্রিতেই আমি গ্রামের মানুষদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে গেছি।
মণিবালার প্রথম ও পঞ্চম বাবু – শঙ্করলাল ভট্টাচার্য
আর পাঁচটা দিনের মতো আজকের কাগজও একরাশ যুদ্ধের খবর নিয়ে এল। মিত্রশক্তির সাফল্য ও ব্যর্থতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ব্যারিস্টার বরদাকান্তের রক্তচাপ বাড়ে কিংবা কমে। একেক দিন ভোরের আলোয়ও তিনি গাঢ় অন্ধকার দেখেন, যখন কাগজ বলে ইউরোপ কি আফ্রিকার কোনো নগর, প্রান্তর জঙ্গল কী মরুভূমিতে অক্ষশক্তির দখল কায়েম হল। তখন কাগজ থেকে চোখ না উঠিয়েই হাঁক পাড়েন, অবনি, রেডিয়োটা ধরো।
