বাবা চুপ করে সব শুনে বললেন, নেতাই, তুই যাবার সময় আমার বাড়ি হয়ে যা। মাকে একটু হরিনাম শুনিয়ে যাস। আর বলিস আমার ফিরতে হয়তো দেরি হবে। এই নে ক-টা পয়সা। নিতাই পয়সা নিয়ে পেন্নাম ঠুকে এগোতেই সমস্ত সর্বনাশটা হল। ওর সঙ্গে দেখাদেখি হবার ভয়ে আমি একটা ফলসা গাছের পেছনে লুকোতে যাচ্ছিলাম। আমার পায়ের খস খস আওয়াজ শুনে কেডা কেডা করে ছুটে এল নিতাই। আর মুখের ওপর হ্যারিকেনটা মেলে ধরে বিকটভাবে চেঁচিয়ে উঠল, ওমা! এ যে দেখি খোকাবাবু গো। তুমি এখেনে এত রাত্তিরে কী কর? আচমকা বাবাও ঘুরে দাঁড়ালেন আর আমার দেখতে পেয়ে যেন রীতিমতন আতঙ্ক বোধ করলেন। ওঁর গম্ভীর গলায় শুধু একটা শব্দ ফুটে উঠল, তুমি!
আমি ভয়ে, লজ্জায় কুঁকড়ে গিয়ে বললাম, বাবা আমি তোমার পিছনে পিছনে এসেছি। মা বলে তুমি রাত্তিরে ভালো দেখতে পাও না। আর আমি শেতলাদিদের বাড়ির সামনে একটা বড়ো গাড়া হয়েছে। ভাবলাম তুমি যদি দেখতে না পেয়ে পড়ে যাও। তাই…
এবার লজ্জাটা যেন বাবার নিজেরই হল। নিজেকে সামলে নিয়ে আমাকে বললেন, এসো। আমার সঙ্গে এসো। আমি পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই বাবা বললেন, তুমি না পড়াশোনা করো। তুমি ভূতে বিশ্বাস করো?
—আমি ভূত-টুত জানি না বাবা। তবে অন্ধকারে গা ছমছম করে। ভয় করে। মনে হয় যারা মরে গেছে তারা পাশে এসে দাঁড়াচ্ছে। ঘরে ঢুকছে।
-ভয় পেলে কী করো?
–রামনাম করি।
—কখন, কেন ভয় পেলে জানতে ইচ্ছে হয় না?
–ভয় করে বাবা।
—হুঁ।
বাবা আলতো করে আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, চলো। নিজের চোখে দেখে আসবে গেঁয়ো লোক ভূত বলতে কী বোঝে।
হনহন করে অতক্ষণ হাঁটছিলেন বাবা। এবার কেমন ধীর-স্থিরভাবে চলতে লাগলেন। বাবার এক হাতে হ্যারিকেন, বগলে ছাতা আর অন্য হাতে শক্ত করে আমার হাতটা ধরা। হ্যারিকেনের আলোয় ভূতুড়ে সব ছায়া হচ্ছে চারদিকে। জলের ফোঁটা নেই, কিন্তু একটা কনকনে ঠাণ্ডা হাওয়া বইছে। বাবা জিজ্ঞেস করলেন, বাইরে এলে যখন, তখন গায়ে কিছু জড়িয়ে নিলে না কেন?
-আমার শীত করে না বাবা। একদম করে না।
—শীত করে না, কিন্তু ভয় করে। শীতে কাঁপো না তো ভয়ে কাঁপো কেন?
—ভয়ে কাঁপি না তো! পালিয়ে যাই।
এবার বাবা সেই ঘোর মিশমিশে অন্ধকারে বুক ফাটিয়ে হাসতে শুরু করলেন। আর নিমেষের মধ্যে গোটা অন্ধকারে ভয় কোথায় লোপাট হয়ে গেল। এতক্ষণ যেসব বীভৎস ছায়া দেখে গা ছমছম করছিল সেগুলো খুঁতিয়ে দেখতে লাগলাম। কোনো ছায়া বাবলা গাছের, কোনোটা সুপুরির, কোনোটা বেলের, কোনোটা তালের। রাস্তার দু-ধারের পুকুরগুলোয় টুপটাপ আওয়াজ। মাঝেমধ্যে এখান-ওখান থেকে কোনো কর্কশ শব্দ, আর একটানা ঝিঝির ডাক।
হাসির তোড় থামাতে বাবা বললেন, ভূত বলে কিছু থাকলে আমি নিশ্চয়ই এতদিনে তাকে দেখতে পেতাম। আমি তো সেই ছটো থেকেই জঙ্গলে জঙ্গলে, শ্মশানে শ্মশানে ঘুরেছি। কত লোক কতরকম ভয় দেখিয়েছে। কিন্তু কই? আমি তো কোথাও কিছু দেখিনি।
আমি শেতলাদির কাছে শুনেছিলাম এক ধরনের ভূত আছে যাদের পা থাকে না। তারা শূন্যে ভাসে। শেতলাদি এরকম একজঙ্গল ভূত দেখেছিল রহিমপুরের গোরস্থানে। গোরস্থানের পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে শেতলাদি দেখেছিল একদল লোক একটা কবরের চারপাশে সেলাম ঠুকে ঠুকে পাক দিচ্ছে। একটা কিছু গাইছিলও হয়ত যা শেতলাদির পরে মনে পড়ত না। কবরের ওপর চাপানো ছোট্ট প্রদীপের আলোয় স্পষ্ট দেখেছিল লোকগুলোর পা নেই। ওরা কীরকম হাঁসের মতন শূন্যে ভেসে বেড়াচ্ছে। এসব কথা মনে হতেই বাবাকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা বাবা, কেউ কেউ বলে এক ধরনের ভূত আছে যাদের নাকি পা থাকে না।
—সে কেউ কেউ কারা?
—আমাদের গ্রামের লোক গো।
–ওঃ! তা ওদের সত্যিকারের মাথা আছে তুমি জানলে কী করে?
–কেন মাথা তো আছে?
—যারা এসব কথা বলে তাদের ঘাড়ে একটা ফাঁপা খোল আছে। ভেতরটা ঢং ঢং।
বাবা ফের খুব হাসছিলেন। আর এরকম হাসতে হাসতে, বকতে বকতে আমরা মোক্তারকাকুর ওখানে পৌঁছে গেলাম। কাকুর ওখানে তখন দক্ষযজ্ঞ চলছে। বাড়ির বাইরে থেকেই টের পেলাম ভৌতিক ব্যাপার ঘটছে। উঠোনে বাবা আর আমি যখন জুতো ছাড়ছিলাম ভেতর থেকে ঠিক সেই পন্ডিত মশাইয়ের গলার আওয়াজ পেলাম, ওই তো চুনে এসে গেছে। খুব মাথাওয়ালা লোক। ও দেখবি সব অঙ্ক মুখে মুখে কষে দেবে।
ঘরে ঢুকে দেখলাম সেই অবিকল পন্ডিত মশাইয়ের গলায় কথা কইছেন মোক্তারকাকু। বাবাকে দেখেই ‘এসো চুনে, এসো, এসো’ করে উঠলেন। মোক্তারের মুখে সম্বোধন শুনে বাবার খুব অপ্রস্তুত বোধ হচ্ছিল। অন্যেরা হয়তো বলবে মোক্তার তো এখন পন্ডিতঠাকুর! অথচ বাবা ওই জিনিসটাই কখনো মেনে নিতে পারেন না। বাবা খুব কঠিন স্বরে বললেন, এই একঘর মানুষকে জ্বালানো ঠিক হচ্ছে মোক্তার? এদের একটু ক্ষান্তি দেওয়া যায় না?
অমনি মোক্তার হাউহাউ করে উঠলেন, তুমি আমারে মোক্তার কও কেন চুনীলাল? আমি তোমার শিক্ষক ছেলাম? তুমি আমার টোলে পড়োনি? আজ তুমি চার-পাঁচটা পাস দিয়ে উকিল হয়েস তাই বলে আমার নেয্য সম্মানটুকু দেবা না? তুমি আমায় চেনতি পার না?
বাবা ফের গম্ভীরভাবে বললেন, মোক্তার, তুমি এক্ষুণি শুতে যাও। আমি কাল সদরের বদ্যি নিয়ে আসব ক্ষণ। বাবার কথা শুনে ঘরের পনেরো-বিশজন ‘হা হা, করেন কী, করেন কী করে উঠল। ততক্ষণে আমার নজরে পড়ল ঘরের সর্বত্র নারী-পুরুষের ভৌতিক জটলা। ঘরে দুটো নিবুনিবু হ্যারিকেন। আর সেই সামান্য আলোয় এক ঘটি জল সামনে রেখে, একমুঠো সরষে হাতে নিয়ে ঝাড়ফুক করছে গ্রামের রজনক পরদি। ওর একটা একটা সরষের ফুঁ-তে কাঁই-মাঁই করে উঠছিলেন মোক্তারকাকু।
