আরেকটা কথাও শুনতাম। চেনাশুনো পড়ুয়ারা ওই রাস্তা দিয়ে পাস করলেই নাকি শুনতে পেত পন্ডিতমশাই ডাকছেন, ওরে শিবু, ওরে রাখাল পড়বি আয়। বলি পড়বি আয়। তাই শুনে শিবু, রাখাল সবাই দে দৌড়, দে দৌড়।
পন্ডিত মশাইয়ের কাছে বেশ কবার কানমলা খেয়েছিলাম আমি। কিন্তু কোনো রাগ ছিল না ওঁর ওপর কোনোক্রমেই। ওঁর ভূত হওয়ার গল্প শোনার পর ওঁর কথা ভাবতেও আমার গা ছমছম করত। মাঝেমধ্যে বাবা-কাকাকে শুনতাম আপশোস করছেন, আহা! কী মানুষটিই-না ছিলেন পন্ডিতমশাই। জীবনে কখনো একটা মিথ্যে কথা বললেন না। কারও ধার ধারলেন না। পাপ করা তো দূরের কথা। অথচ ওঁর এমনটা হল কেন?
এতখানি শোনার পর গ্রামের মোক্তার রসিকরঞ্জন মুখ খুলতেন, বলি অপঘাতে মরা কি কম পাপ চুনিলাল! যেই কেউ অপঘাতে মল তো ভূত হল। আর যেই ম’ল অপঘাতে তো সেই হল গিয়ে পাপী। একটা কথা বলেন দিকিন চুনেদা, যদি পন্ডিতমশাই কোনো পাপ কাজই না করে থাকবেন তো ওঁর মাথায় বাজ পড়ল কেনে? ওই ঝড়বাদলার দিনে বলি আমরাও তো গাঁয়ের পথে চলাফেরা করিচি। তো কেবল ওঁর মাথায় বাজ পড়ল কী করে?
মোক্তারকাকুর এতশত প্রশ্নের কোনো সদুত্তর বাবার জানা ছিল না। উনি ইতিউতি দু-চার বার তাকিয়ে নিয়ে বলতেন, মোক্তার জীবনে তো শুধু ওকালতিই করেছি। ভূততত্ত্ব-প্রেততত্ত্ব তো আর চর্চা করা হল না। আমি আর এর কী উত্তর দেব বলো? তবে কী, মাঝে-সাঝে
বিভূতিভূষণের গল্প পড়লে বড়ড়া জানতে ইচ্ছে করে এই ভূত জিনিসটা কী। তোমার তো বয়স কম, একটু পাত্তা লাগাও না। ওই ভূত ব্যাটাছেলে সত্যি সত্যি আছে কি নেই।
বাবার এই হালকা টিটকিরি শুনলে মোক্তারকাকু সিধে হয়ে যেতেন। একটু তামাক সাজতে সাজতে নিজের মনেই বলতেন, আর আমাকে কেন? আমি তো, সত্যি বলতে কী, ভূতে বিশ্বাসই করিনে। ভূত মানেই ভ্ৰম, ভূত মানেই যা নেই। আর তাই দিয়ে আমারই-বা। কী কাজ?
নিজের মনেই ভূতের নিন্দে করতে করতে বাড়ির দিকে রওনা হতেন উনি। আমি কিছুটা পথ হ্যারিকেন ধরে যেতাম। তারপর চৌরালির মোড় পর্যন্ত পৌঁছেই বাড়ির দিকে ছুট দিতাম। মোক্তারকাকুর রামনাম জপ করাও তখন দক্ষিণের বাতাসে কানে ভেসে আসত। ভোটের সময় যেমন দলের কর্মীরা স্লোগান দেয় মোক্তারকাকুর জপের আওয়াজ তাকেও ছাড়িয়ে যেত।
শেষে একদিন ভারি রকমের জ্বরে পড়লেন মোক্তারকাকু। গ্রামের বদ্যিরা হার মানল। কেউ নাড়ি পায় না। জ্বর তো সেই পাগলের মতন। তিন দিন তিন রাত্তির ধরে মোক্তারকাকু ঘুমে বিড়বিড় করে গেলেন। শনিবার শহর থেকে ফিরে বাবা বললেন, শুনেছিস মোক্তার কেমন আছে? বললাম, ওঁর জ্বর কেউ নামাতে পারছে না। পাড়ার শেতলাদি বলছিল ওঁকে ভূতে ধরেছে। আর অমনি প্রচন্ড জোরে ধমকে উঠলেন বাবা! বলেছি না খবরদার ভূত ভূত করবে না। তুমি ভূত দেখেছ কখনো চোখে? কথায় কথায় ভূত। আর হ্যাঁ, ওই শেতলাটা কোথায়? আমি ওর ভূতের খেলা বার করছি। বলেই বাবা ছাতা নিয়ে বেরুতে গেলেন।
বাইরে টিপটিপ করে জল পড়ছে। ঠাণ্ডা হাওয়াও বইছে খুব। আমার ভাবতেই খারাপ লাগছিল বাবা ওই অতদূর শহর থেকে এসে এক্ষুনি ফের শেতলাদির বাড়িমুখো হবেন। অথচ বাবার রোখ চাপলে তাঁকে তো কেউ শান্ত করতে পারে না। উনি যে ওঁর মোটা কাচের চশমার ভেতর দিয়ে গাঁয়ের পথঘাট ভালো দেখতে পাবেন না তাও উনি ভুলে গেছেন। লম্বা চওড়া মানুষ পা পিছলে কোথাও পড়ে গেলেও তো রক্ষে নেই।
কিন্তু বাবার যেমন ভাবা তেমন কাজ। নিমেষের মধ্যেই এক হাতে ছাতা আর আরেক হাতে লণ্ঠন নিয়ে বেরুলেন। একবার ভাবলাম দোতলায় কাকাবাবুকে খবর দিই। কিন্তু তাতেও ভয় হল। কাকাকে দেখে যদি বাবা খেপে ওঠেন। এত অন্ধকারে তুই আবার কোত্থেকে?-বলে বসবেন হয়তো তাঁকে। কাকারও যে ঢের বয়স হয়েছে বাবা সেটা কিছুতেই বুঝতে চান না। বুদ্ধিশুদ্ধিতে বাবার ধারেপাশে না এলেও কাকার চোখ দুটোও তো
অন্তত তাঁর চেয়ে ভালো তাও বুঝি-বা তিনি স্বীকার করতে চান না। রাতে কাকা কোথাও যাবেন শুনলে বাবা বলে ওঠেন, অন্ধকারে রাস্তাঘাট দেখতে পাবে না। কেন মিছে ফিকির বাড়াও?
নিরুপায় হয়ে ওই ঘুটঘুটে অন্ধকারে বাবার পিছু নিলাম। সামনে দশ-বারো হাত দূরে দীর্ঘকায় বাবা লণ্ঠন আর ছাতা হাতে তরতর করে এগোচ্ছেন আর পিছনে আমি সেই মানুষটার পিছন পিছন বিড়ালের মতন নিঃশব্দ পায়ে। অন্ধকারে চোখে কম দেখলেও কী হবে, বাবা হাঁটেন বেশ লম্বা লম্বা পা ফেলে। বেনেদির আলের কাছে তো আমায় রীতিমতন দৌড়োতে হল ওই দশ হাতের ফারাক রাখতে। দেখতে দেখতে বাতাস একটু জোর হল। ওরকম দু-চার ঝাপটা লাগতেই বেশ আরামের সুরেই বাবা বললেন, আঃ! বুঝলাম বাবার খুব খাটনি যায় শহরে। গ্রামে বাতাস লাগলে আরাম হয়। ইটকলের ধার দিয়ে যেতে যেতে সামনে একবিন্দু আলো দেখা গেল। ক্রমশ কাছে আসতে আসতে বড়ো হল আলোটা। হঠাৎ ঝুঁকে পড়ে সামনের জন বাবাকে নমস্কার করল। আমি আবছাভাবে দেখতে পেলাম গ্রামের বোষ্টম নিতাইকে। হাতে ভিক্ষের থলি আর গানের যন্ত্র। নিতাই বলল, পেন্নাম হই কর্তাবাবু। এত রাত্তিরে কোথা যান?
বাবা ওঁর স্বাভাবিক গলা খাঁকারি দিয়ে বললেন, নেতাই, তুই মোক্তারের খবর পেলি। কিছু? আর অমনি নিতাই হাঁ হাঁ করে মাটিতে বসে পড়ল, আর কয়েন না কর্তাবাবু, আর কয়েন না। মোক্তার মরিছে। ওর মগজের ওপর এখন পন্ডিতঠাকুর নাচতিছেন। আজ সকাল থেকে মোক্তার যারে দ্যাখে তারে কয়, অঙ্ক কষ, ধাতু বল। এক্কেবারে পন্ডিতঠাকুরের মতো। উঃ আর বাঁচবে নাকো। আপনি যেয়েন না ওখানে।
