জারিনা বাই পরমভক্তিভরে ক্রসটা হাতে নিয়ে দরদের সঙ্গে বললেন, শুকরিয়া!
১০.
জারিনার বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই দু-জনে দুটো দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। ডায়েরিটার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের হৃদয় এবং মগজের দু-টি ভারই যেন হাওয়ায় উবে গেছে। আমাদের এবার পুরোদমে আসল কাজটায় ফিরে যাওয়া দরকার। অনিরুদ্ধ বলল, এবার তা হলে? বললাম, আমাদের সেই প্রথম দিনের রুটিনমাফিক কাজে নামা দরকার। ও বলল, কিন্তু? বললাম, কিন্তু?
একবার গোলকধাঁধায় গিয়ে শেষবারের মতো মিলিয়ে দেখলে হয় না ব্যাপারটা সত্যি সত্যি মিটল কি না?
কথাটা যে আমার মনেও উঁকি দেয়নি তা নয়। শুধু সাহস হচ্ছিল না মুখ ফুটে বলার। কে জানে আবার সেই পুরোনো চক্করে পড়ি কি না। কিন্তু অনিরুদ্ধ কথাটা তোলায় বেশ জোর এল মনে, বটেই তো! সব উলটোপালটা জিনিসেরই শেষ দেখে নেওয়া দরকার। তাতেই বিজ্ঞানবোধ ও বিবেক—দুটোই স্বস্তি পায়। তাই বললাম, বেশ! কিন্তু যাই-ই ঘটুক, আমরা তাতেই ঘটনার ইতি টানব। না হলে যে-কাজের জন্য আসা সেটাই মাঠে মারা যাবে। ও বলল, নিশ্চয়ই, শংকরদা! ভূত আছে কি না-আছে সেটা প্রমাণ করতে তো আমরা আসিনি। শুধু মিলিয়ে নেব ওই ভুলভুলাইয়ার ব্যাপারটার নিষ্পত্তি হল কি হল না। আমাদের চৌকের ঘরের কান্ডটা তো মিটেছে বলেই মনে হয়।
আমরা হাঁটতে হাঁটতে কখন যে ভুলভুলাইয়াতে এসে দাঁড়িয়েছি খেয়াল নেই। চারিদিক শুনশান, কোথাও কেউ নেই। একটা সুন্দর হাওয়া কোত্থেকে বয়ে আনছে শীতের কামড়। নীল আকাশ, চকচকে রোদ এবং ঠাণ্ডা মিশে একটা অদ্ভুত পরিবেশ তৈরি করেছে। এমন একটা মনোরম পরিবেশেও ভুলভুলাইয়ার রহস্য আমাদের তাড়া করছে-কী বিচিত্র আমাদের দুটি মন!
আমরা একটু একটু করে ঘুরপাক খেতে খেতে ফিরে এলাম সেই ছোটো কুঠুরিতে, যেখান থেকে রোজানার কণ্ঠ শুনেছিলাম পূর্বে। অনিরুদ্ধ বলল, আপনি এইখানেই থাকুন। যে জায়গা থেকে কথা কইলে আপনি শুনতে পাবেন আমি সেই কুঠুরিতে যাচ্ছি। আপনি খেয়াল রাখুন, আমি হাত নাড়ব। তারপর কথা বলব আমরা। এই বলে ও চলে গেল। আমি একটা সিগারেট ধরিয়ে দুটো সুখটান দিয়ে ওই ঘন অন্ধকারে অপেক্ষায় রইলাম ওর কণ্ঠধ্বনির।
দুটোর পরে আরও ক-টা সুখটান দিয়েছিলাম খেয়াল করিনি। দেখলাম হাতের চারমিনার ফুরিয়ে এসেছে। সেটাকে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে চাপা দিয়ে দিলাম। আর মাথা বাড়িয়ে ডানদিকের সেই কুঠুরির দিকে চাইলাম। দেখি হাত নাড়ছে অনিরুদ্ধ। আমি ভেতরে সরে এসে দেয়ালে কান পেতে জিজ্ঞেস করলাম, বলো, কী বলবে, অনিরুদ্ধ। তুমি আমার কথা শুনতে পাচ্ছ?
একটা দেশলাই জ্বালানোর আওয়াজ হল। বুঝলাম অনিরুদ্ধ সিগারেট ধরাচ্ছে। আমি একটু সময় দিয়ে ফের বললাম, আমার কথা শুনতে পাচ্ছ, অনিরুদ্ধ?
ওপার থেকে এবার ধ্বনি ভেসে এল—নারীকন্ঠে! ‘সি সিনিওর!’ অর্থাৎ ‘হ্যাঁ, মহাশয়। আমার হাত-পা ঠাণ্ডা মেরে যাচ্ছে। অনেক কষ্টে গলায় বল এনে বললাম, তুমি অনিরুদ্ধ না!
—আমি রোজানা!
—অনিরুদ্ধ, তুমি ইয়ার্কি করছ না তো?
—আপনি কাকে খুঁজছেন? এখানে তো আর কেউ নেই। শুধু আমি।
—আপনি রোজানা?
—হ্যাঁ।
—আপনি তো ডায়েরি পেয়ে গেছেন। এরপর আর কী চাই?
—তোমাকে। নিকোলা! প্রিয়তম নিকোলা। নিকোলা ফেরি!
আমার হাঁটু কাঁপছে। রোজানার ধ্বনি থেমে যাওয়ার পর আমার হৃৎপিন্ডের দারুণ দামামা কানে আসছে। হার্ট অ্যাটাকের আগে এমনটি হয় বুঝি! মহিলা আমাকে নিকোলা ফেরি ঠাউরেছেন। চিৎকার করে বললাম, রোজানা, আমি নিকোলা নই! আপনি ভুল করছেন।
—আস্তে কথা বলো, নিকোলা। ওভাবে চিৎকার করলে সবাই জেনে যাবে আমরা এখানে।
-না, না, আপনি ভুল করছেন, রোজানা!
—তোমার শরীর খারাপ, নিকোলা। তুমি উত্তেজিত হোয়য়া না লক্ষ্মীটি! তুমি চুপ করে দাঁড়াও, আমি আসছি। তারপর দু-জনে আমরা…
—আমার কানে আর কিছু যাচ্ছে না। এ কোন গোলকধাঁধায় এসে পড়লাম, হে ভগবান। বাঁচতে হলে তো এক্ষুনি আমার এখান থেকে বেরিয়ে পড়া দরকার। আমাকে বাঁচতে হবে।
আমি কুঠুরির বাইরে পা বাড়িয়ে অন্ধকার গলিতে পড়লাম এবং হাতড়ে হাতড়ে এগোতে লাগলাম। কিন্তু… কিন্ত… আমার গলির পাশের গলি দিয়ে ওটা কে হাঁটছে। অনিরুদ্ধ? তা কী করে হয়? ও পায়ে তো নূপুরধ্বনি হচ্ছে। নূপুরের আওয়াজ আমার দিকেই আসছে। হাওয়াতে একটা চেনা আতরের সুবাসও ছড়িয়ে পড়ছে। আর আমি অন্ধকারে অন্ধের মতো দেওয়াল ছুঁয়ে ছুঁয়ে এগোচ্ছি। কিন্তু অন্ধকার ক্রমশ ঘন জমাট পাথর হয়ে উঠেছে। এরকম অন্ধকার অমাবস্যার রাতে ছাড়া দেখিনি কখনো। অন্ধকারের মধ্যে যেন আরও একটা অন্ধকারের প্রলেপ। আর সেই অন্ধকারটা চারপাশ থেকে আমার শরীরে চেপে বসছে। আমি হাত দিয়ে অন্ধকারটাকে ঠেলছি, কিন্তু আমার শক্তি আর কতটুকু! পায়েলের আওয়াজে একটা চক্ৰধার তেহাই পড়ল শুনলাম। কথক নাচ হচ্ছে কোথাও। পাথুরে অন্ধকারে নাচ শুনতে শুনতে আমি মাটিতে পড়ে গেলাম। একটা গভীর, অন্তহীন অন্ধকারে শুধু পড়ছি, পড়ছি আর পড়ছি।
আর একটা তেহাই সম-এ এসে পড়ল এবং আমি যন্ত্রণায় লুটিয়ে পড়েছি মাটিতে।
ভূতের সত্যি মিথ্যে
শ্মশানটা আমাদের বাড়ির খুবই কাছে হলেও ওই দিকটা আমাদের প্রায় অজানাই ছিল। ক্কচিৎ কখনো গেছি হয়তো। কিন্তু ভালো করে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখিনি। গল্প শুনতাম মারা যাবার পর গ্রামের পন্ডিতমশাই নাকি শ্মশান পাহারা দিতেন। আগে যেসব পাজি বদমায়েশরা শ্মশানে বসে গুলতানি করত পন্ডিতমশাই ভূত হয়ে তাদেরই আগে ভাগিয়েছিলেন। ভয় তো দেখাতেনই, সেইসঙ্গে ইট-পাটকেল কাঠের টুকরো ছুড়ে মারতেন। ওই শুধু ক-টা ডোম ধাঙড়ই ওখানে থাকত, কাজকম্ম করত। খেতে বসার আগে ‘পন্ডিত ঠাকুর প্যান্নাম’ বলে মাথায় হাত ঠুকে নিত। ওদেরকে পন্ডিতমশাই কখনো কিছু বলতেন না।
