আমার হাত কাঁপছিল কিন্তু আমি হাত তুলে নিইনি। অনিরুদ্ধর বড়ো ইচ্ছে এটা সঙ্গে করে নিয়ে যাবে কলকাতা। কিন্তু নিঃশ্বাসের বহর বাড়ছে, হাত আমার অবশ হয়ে আসছে। আর…আর…ও কী! অনিরুদ্ধ অমন ভাব করছে কেন, যেন কেউ গলা টিপে ধরেছে ওর?
আমি সোজা হয়ে পিঠ ঠেকালাম দেয়ালে। আর তখনই ফের এক বিদ্যুতের ঝলকে দেখলাম কালো কোট পরা এক তরুণবয়সি বিদেশি চড়ে বসেছে অনিরুদ্ধের বুকের ওপর। কিছু একটা চাই ওর অনিরুদ্ধের কাছ থেকে।
আমি অনিরুদ্ধ! বলে চিৎকার করে হাত সরিয়ে নিলাম ডায়েরির ওপর থেকে। আমার পাশের নিঃশ্বাসটা কিন্তু তাও সরে গেল না। ডায়েরিটা যেখানে ছিল সেখানেই আছে। আমি ধরা ধরা গলায় ওই ছায়ামূর্তিকে বললাম, আপনি ডায়েরি নেবেন, নিয়ে যান। আমার বন্ধুকে ছেড়ে দিন। কিন্তু সে সরল না। শুধু অনিরুদ্ধর কাতর ধ্বনি আরও কাতর হল। আমি শুধু ভগবানকে ডাকতে শুরু করলাম যেন জ্ঞান না হারাই। আমার আর বুঝতে বাকি নেই যে, জ্ঞান হারানোর অর্থ মৃত্যু নয়, দু-দুটো মৃত্যু।
হঠাৎ ফের একটা বিদ্যুৎ ঝলক। দেখলাম দেয়ালে বিদ্যুতের রেখায় একটা ক্রস হয়ে নিমেষে মিলিয়ে গেল। আর তক্ষুনি আমার মনে পড়ল ডায়েরির মধ্যেকার ক্রসটার কথা। তড়িঘড়ি ডায়েরির পাতা ঝেড়ে ক্রসটা বার করে হাতে নিলাম আর সঙ্গে সঙ্গে ঘরে জ্বলে উঠল আলো!
দেখলাম টেবিলে ডায়েরি নেই এবং অনিরুদ্ধ শান্তভাবে, নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে! উঠে গিয়ে ওর কপালে হাত রাখলাম, দেখি দিব্যি সুস্থ শরীর, জ্বরের লেশমাত্র নেই।
আমি আলো নিভিয়ে দিয়ে এসে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লাম। জল-ঝড়েরও কোনো শব্দ নেই কোথাও। শোওয়ামাত্র গাঢ় ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল আমার ক্লান্ত মস্তিষ্ক।
আমাদের ঘুম ভাঙল নমাজের আওয়াজে। আকাশে ফুটফুটে রোদ। তাতে শীত আরও কড়া হয়েছে। অনিরুদ্ধ বলল, শংকরদা, চলুন চা খাব।
৯.
চা খেয়ে টুকটুক করে আমরা হন্টন লাগালাম মুনির মঞ্জিলের দিকে। আমাদের দেখে জারিনা বাই তো অবাক! এত সকালে আমাদের আবার কী চাই!
অনিরুদ্ধ বেশ জোরের সঙ্গে বলল, আজ কিন্তু আপনাকে মুখ খুলতেই হবে।
কী ব্যাপারে?
রৌশন বাইয়ের ব্যাপারে।
কিন্তু ভাইসাব, ছেলেপুলে নিয়ে ঘরসংসার করি, কেন ঝুটমুট ঝামেলায় ফাঁসি বলুন তো?
এবার আমি বললাম, আর কোনোদিনও কোনো ঝামেলা হবে না। সে-ব্যাপার আমরা মিটিয়ে দিয়েছি বরাবরের মতো। আপনি শুধু বলুন আপনি কী জানেন! জারিনা বললেন, তা হলে ভিতরে আসুন।
ক্রমে চা এল, পান এল। আমরা পান সরিয়ে রেখে চা পান করলাম। জারিনা বড়ো দু খিলি পান মুখে গুঁজে বললেন, আমার ঠাকুমার ঠাকুমার নাম রৌশন। রৌশন আরা বেগম। শুনেছি তিনি ফিরিঙ্গি ছিলেন। ইতালি না কোথাকার মেম। তবে আসল কথা হল উনি মেম ছিলেন না। একজন মেম হয়ে ওঁকে তখনকার এক রইস ইউসুফ আলির বাড়িতে বন্দি থাকতে হয়েছিল। কারণ ইউসুফ সাহেব সত্যিকারের রৌশন বাইকে গলা টিপে মেরেছিলেন সে যখন তার ফিরিঙ্গি দোস্তের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। এই চৌকের এক কোঠাতে থাকত সে সাহেব। তার সঙ্গে রাতেরবেলায় বোরখা পরে দেখা করতে যাচ্ছিল রৌশন। ইউসুফের লোকেরা ওকে পাকড়াও করে নিয়ে যায়। তারপর তো যা হওয়ার হল। কিন্তু ইউসুফ জানতেন ইটালিয়ান সাহেব ওর বান্ধবীর খোঁজ করবেই। তাই দু-দিন বাদেই তিনি আমার ঠাকুমার ঠাকুমাকে তুলে নিয়ে গেলেন চৌক থেকে। ঠাকুমার দোষ, সমঝদাররা বলতেন, তিনি নাকি লউনউয়ের দ্বিতীয় রৌশন। রূপে, গুণে, ব্যক্তিত্বে। আরও মজার ব্যাপার আমার ঠাকুমার ঠাকুমা গানও শিখেছিলেন রৌশন বাইয়ের কাছে। তাই তাঁকে যখন রৌশন সাজিয়ে দূর থেকে দেখানো হয়েছিল সাহেবকে, সে ধরতেই পারেনি।
এর কিছুদিন পর সাহেবের দরজা খটখটিয়ে দেখা গেল সে ঘুমের মধ্যে মরে গেছে। লোকজন বলল যে, কয়েক সপ্তাহ ধরে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছিল সাহেব। নিজের ঘর থেকে বেরোনোই বন্ধ করে দিয়েছিল। ওর মৃত্যুর পর ওই ঘরে কেউ কোনোদিন পর পর দু রাত থাকতে পারেনি। শেষে ঘরটা বরাবরের মতোই বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওটার নাম হয় ‘ফেরি কোঠা। যতদূর জানা যায় ওই সাহেবের নাম ছিল ফেরি। আর আরও তাজ্জব কি বাত ইউসুফ সাহেবও এর কিছুদিন পর ঘুমের ঘোরে মারা যান। ওঁর গলায় দশ আঙুলের ছাপ ছিল স্পষ্ট। ওঁর খানসামারা হলফ করে বলেছিল, ইউসুফের সব দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল। কারণ প্রতি রাতেই উনি কালো কোট-পরা এক ফিরিঙ্গি সাহেবকে ওঁর কামরায় ঢুকে আসতে দেখতেন।
ইউসুফ সাহেবের মৃত্যুর পরও সেই সাহেবের আসা-যাওয়া থামেনি। শেষে আমার ঠাকুমার ঠাকুমা ওই প্রাসাদ ছেড়ে ছেলেপুলে নিয়ে চলে আসেন চৌকের এই মুনির মঞ্জিলে। নিজের নাম তিনি বদলে ফেলে করে দিলেন ফিরদৌসি বাই। আর সবাইকে নিষেধ করে দিলেন মুখে রৌশন কি ফেরির নাম না নিতে। কী বলব বাবুসাহেব, আমাদের এই বাড়িতেও আমরা মাঝে মাঝে রৌশন বাই আর সাহেবের আসা-যাওয়া দেখেছি। আমার সন্তানের মাথায় হাত রেখেও বলতে পারি।
জারিনা বাই চুপ করলেন। চুপ করে বসে রইলাম আমরাও। অনেকক্ষণ পর পকেট থেকে ফেরির ডায়েরির ক্রসটা বার করে মহিলাকে দিয়ে বললাম, আপনি ধর্মভীরু মুসলমান। তবে উদার মানুষও বটে, যেভাবে আমাদের সঙ্গে ব্যবহার করলেন অ্যাদ্দিন। দয়া করে এই ক্রসটা বাড়ির কোথাও রাখবেন, তা হলে আর কখনো ওই দুই আত্মার আসা-যাওয়া দেখতে হবে না।
