হ্যারি ট্রলোপ আমার পিঠে হাত রেখে বললেন, চলুন সিনিয়র ফেরি। এঁদের আর বিরক্ত করা ঠিক হবে না।
আমি লজ্জিত মুখে ইউসুফ আলির বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। মাথাটা যেন বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছি না ভুলভুলাইয়াতে শোনা কণ্ঠটি কার। রাতের বেলায় আমার ঘরের নিত্যঅতিথি কে? কিংবা এই রৌশন বাই সত্যি সত্যি কে?
আমি বাড়ি এসে একটা প্রচন্ড জ্বর অনুভব করলাম শরীরে। হাতের পাশেই ব্যাগে মাথার যাবতীয় ওষুধ, কিন্তু আমি ওষুধের দিকে হাত বাড়ালাম না। ওষুধে যাবার মতো জ্বর এ নয়। রৌশন-রোজানা রহস্যের সমাধান না হলে এ অসুখ আমার যাবে না। আর ততদিন লখনউ ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয়। খাই বা না খাই, বাঁচি বা না বাঁচি এই ডায়েরি আমাকে লিখে যেতেই হবে। আমার মগজ ঠিক রাখতে হবে, যুক্তি বজায় রাখতে হলে, পাগল না হতে হলে এই ডায়েরি লিখে যেতে হবে। এই ডায়েরিই আমার প্রিয়তমা রোজানার একমাত্র পরিচয়, সঠিক পরিচয় ধরে রাখবে। আমি জীবিত অবস্থায় নেপলস না ফিরলেও এই ডায়েরিতেই রোজানা বেঁচে থাকবে। রৌশন বেগম হিসেবে আমি ওকে মরতে দেব না। কিন্তু আর লেখা নয়, এখন আমাকে তৈরি হতে হবে রোজানার জন্য। লম্ফ নিভে এল বলে, যেকোনো মুহূর্তে দপ করে নিভে যাবে। আর ঘরটা ভরে যাবে রোজানার দেহের আতরগন্ধে। আমি শুনব ওর নূপুরধ্বনি। ওর নিঃশ্বাস পড়বে আমার কপালে, হাতে, বুকে। শেষে ও জল পান করবে আমার কলসি থেকে। তারপর…
অনিরুদ্ধ বলল, এখানেই পাতাটা শেষ। আমি বললাম, হয়তো তখনই লম্ফটা নিভে গিয়েছিল। কিন্তু তুমি অন্য পাতা থেকে ফের পড়তে শুরু করো না। লেখা তো আরও আছে। অনিরুদ্ধ বলল, না, আর পড়ব না এখন। দেখি না রাতে কী হয়! তা হলে পরবর্তী অংশগুলো আরও তারিয়ে তারিয়ে পড়া যাবে। সাসপেন্স বজায় থাকবে। খাতা তো আর আমরা ফেরত দিচ্ছি না। যতই যা হোক।
এরপর আমরা নাক অব্দি কম্বল টেনে ঘুম লাগালাম। উপায় ছিল না অন্য কিছু করার, কারণ দুপুরের মেঘলা আকাশ ততক্ষণে ঘন কালো হয়ে উঠেছে, কিছু বিদ্যুল্লতা ঘরের মধ্যে ঝলসে উঠেছে এবং শেষে শীতের অকালবৃষ্টিও নেমেছে। একটা হিমশীতল হাওয়া দৌড়ে বেড়াচ্ছে আমাদের ছোট্ট ঘরে। ঘুম দেওয়ার পক্ষে এর চেয়ে ভালো সময় ক্যালেণ্ডারে আর কিছুই থাকতে পারে না। মিনিট কয়েকের মধ্যে অনিরুদ্ধর নাক ডাকা শুরু হল। ছোকরার একটা চাপা সর্দি সব-সময়ই লেগে থাকে। ফলে নাকটা বোধ হয় ঘুমের সময় একটু অসুবিধেয় পড়ে।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছি সে কি আর নিজেও জানি? হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল এক বিশ্রী আওয়াজে। প্রথমে কানের থেকে কম্বল সরালাম। তাতে আওয়াজটা আরও তেজি হয়ে উঠল। বাইরের ঝোড়ো হাওয়ার গোঙানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শুরু হয়েছে অনিরুদ্ধর গোঙানি। আমি ধড়মড় করে উঠে বসে প্রথমে দৃশ্যটা দেখলাম। দেখি অনিরুদ্ধর শরীরটা বেঁকে বেঁকে ঠেলে উঠছে বিছানার থেকে আর গলা থেকে ছিঁড়ে বেরোচ্ছে একটা বিকট আওয়াজ। ছেলেটা কি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল?
আমি ওর তক্তপোশের পাশে দাঁড়িয়ে ডাকলাম, অনিরুদ্ধ! কী ব্যাপার? গোঙাচ্ছ কেন?
ও কোনো উত্তর দিল না। উলটে গোঙানিটা আরও বেড়ে গেল। আমি আমার তালুটা রাখলাম ওর কপালে, শরীরটা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে। ভয়ে আরও হিম হয়ে গেল আমার মাথাটা। আমি দুম করে ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে চলে গেলাম হেকিম সাহেবকে ডেকে আনতে। বুড়ো থুথুড়ে উসমান হেকিম পাক্কা পাঁচ মিনিট লাগিয়ে দিলেন তেতলায় উঠতে। আরও পনেরো মিনিট লাগালেন রোগের লক্ষণ বার করতে। তারপর আরও দশ মিনিট ধরে ওষুধ খুঁজলেন। এরপর পাঁচ টাকা দক্ষিণা নিয়ে যখন বিদেয় হলেন আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
অনিরুদ্ধকে হেকিমের বড়ি গোটা কয়েক খাইয়ে ফের নীচে গেলাম রাতের খাবার আনতে। কাবাব আর রুটি নিয়ে ঘরে এলাম যখন, তখনও অনিরুদ্ধ সমানভাবে কাতরে যাচ্ছে। ওষুধে যেন কিছুই হয়নি ওর। আমি যে ওকে কিছু খেতে বলব সে-সুযোগও হল না। আমি নিঃশব্দে বসে ঘড়ি দেখে যেতে লাগলাম। কে যেন কবে বলে রেখেছিল—টাইম ইজ দ্য বেস্ট হিলার!
চোখের সামনে ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, সময় বয়ে যাচ্ছে, বৃষ্টি ঝরে যাচ্ছে, আর অনিরুদ্ধ জ্বরে বেহুঁশ হয়ে গোঙাচ্ছে।
এভাবে রাত দশটা বাজল। আমি প্যাকেট আর ভাঁড়ের খাবার যেমনটি ছিল তেমনটি রেখে নিজের জায়গায় শুয়ে পড়লাম। ভোর হলেই সফরসঙ্গীকে নিয়ে কলকাতা ফিরে যাব মনস্থ করেছি। মনটা এমনিতে বেশ দমেই ছিল, অনিরুদ্ধ অসুস্থ হতে সেটা প্রায় ভেঙেই গেছে। এ সফর থেকে লেখা আর কিছু হবে বলে মনে হচ্ছে না। বিষণ্ণ ভাবটা যত বাড়ছে ততই যেন মাথাটা ক্লান্ত হয়ে আসছে। না চাইতেও একসময় ঘুম জড়িয়ে আসতে লাগল চোখে। আমি সিগারেট ধরিয়ে জেগে থাকার ক্ষীণ প্রয়াস করলাম।
হঠাৎ আলোটা নিভে গেল। ঝড়ের তোড়ে জানালার বন্ধ কপাট খড়খড় করে কাঁপতে লাগল। হঠাৎ এক বিদ্যুতের ঝলকে স্পষ্ট দেখলাম সাদা সালোয়ার কামিজে এক পরমাসুন্দরী তবায়েফ বা বাইজি মৃদু নূপুরধ্বনি তুলে এগিয়ে আসছে আমার খাটের দিকে। আমার সহসা মনে পড়ল হেকিম সাহেব অনিরুদ্ধকে দেখতে বসেছিলেন যখন ওর খাটে আমি ফেরির ডায়েরিটা তুলে রেখেছিলাম আমার মাথার পাশে টেবিলের ওপর। আমি মহিলাকে সেদিকে আসতে দেখে খাতাটার ওপর হাত চাপা দিলাম। আর হাতের ওপর সমানে উষ্ণ নিঃশ্বাস পড়ার শব্দ শুনতে লাগলাম।
