বলতে না বলতে ও ফড়ফড় করে মোটা ব্রাউন পেপারে মলাটটা ছিড়তে লাগল। আর তখনই স্পাইন থেকে খসে পড়ল চামড়াতে গদ দিয়ে সাঁটা একটা পাতলা, সোনালি ক্রস। আমরা অবাক হয়ে দু-জনে দু-জনের চোখের দিকে চেয়ে রইলাম নির্বাকভাবে। সহসা ডায়েরির আর যেটুকু-যা বাকি আছে তা পড়ে ফেলার জন্য যেন জ্বর ধরল গায়ে। আজ রাতেই তো আসবে বলল রোজানা! ওকে কি শূন্য হাতে ফিরিয়ে দেওয়া ঠিক হবে?
দাঁতে মাংসের টুকরো ছিড়তে ছিড়তে অনিরুদ্ধ বলল, আপনি যাই বলুন আর তাই বলুন, আমি কিন্তু ডায়েরিটা ফেরত দেওয়ার পক্ষপাতী নই!
আমি ভয়ে ভয়ে বললাম, কিন্তু ও তো ওটা নিতে আসবে। বিজ্ঞানের ছাত্র অনিরুদ্ধের এবার স্বরূপ প্রকাশ পেল, ও মানে কে? আমি উত্তরে কী বলব ভেবে পেলাম না। চুপ করেই রইলাম। শেষে অনিরুদ্ধই বলল, আমাদের এইসব অভিজ্ঞতার কথা কেউ বিশ্বাস করবে না কোনোদিন যদি এই ডায়েরিটা সঙ্গে করে নিয়ে কলকাতায় না ফিরতে পারি।
ওকে সাময়িকভাবে নিরস্ত করার জন্য বললাম, ঠিক আছে, সেটা দেখা যাবে। আপাতত বাড়ি ফিরে বাকি অংশের কিছুটা অন্তত তো পড়া যাক। রাত তো অনেক পরের ব্যাপার।
৮.
দিনটা হঠাৎ মেঘলা হয়ে এসেছে। ফলে ঠাণ্ডাটাও বেশ জাঁকিয়ে নেমেছে। আকাশের আলোয় আর কিছু পড়ার জো নেই। ঘরের একটিমাত্র আলো জ্বালিয়ে যে-যার তক্তপোশে কম্বল জড়িয়ে বসে সিগারেট ধরিয়েছি। লখনউয়ে যে কাজের বরাত নিয়ে আসা তা আপাতত ডকে উঠেছে। আমাদের রাতের ঘুম আর দিনের সব মনোযোগ সম্পূর্ণ দখলে নিয়ে নিয়েছে অনিরুদ্ধর হাতে ধরা গত শতাব্দীর পর্যটক ডা. নিকোলা ফেরির আশ্চর্য ডায়েরি। একটা লম্বা ধোঁয়া রিং করে হাওয়ায় ভাসিয়ে ও পড়তে শুরু করল।
পর পর উনিশটা রাত গেল আমি চোখের পাতা এক করিনি। আমি ছোট্ট এক লক্ষ জ্বেলে ঘুমোই। কিন্তু রাতের একটা বিশেষ সময় সেটা আপনা আপনি নিভে যায়। তারপর ঘরটা ভরে ওঠে নারীদেহের অপূর্ব আতরগন্ধে। একটা নূপুরধ্বনি শুরু হয় অনতিবিলম্বে এবং আমার খাটের চারপাশে একটা নিঃশ্বাস পড়ার আওয়াজ শুনতে পাই। আমি তখন আর্তস্বরে একটা কথাই বলি তখন, তুমি রোজানা? রোজানা তুমি এসেছ? কিন্তু যেই থাকুক আমার ঘরে তার কোনো জবাব শুনতে পাই না। শেষে একসময় আমার জলের কলসি উপুড় করে সেই সত্তা ঢকঢক করে খানিকটা জল পান করে। আমি বেশ কবার সে-সময় হাত বাড়িয়ে ওকে স্পর্শ করতে গেছি। কিন্তু অন্ধকারে আমার হাত হাওয়া ছাড়া অন্য কিছু খুঁজে পায়নি।
অনিরুদ্ধ ফের পাতা ওলটাতে শুরু করল। লন্ড্রির হিসেব, কিছু ওষুধ বিষয়ক তথ্য, একটি জুড়িগাড়ির বর্ণনা ইত্যাদি বিভিন্ন কথাবার্তা এড়িয়ে ফের ও এসে দাঁড়াল আর একটি পৃষ্ঠায়। বলল, হ্যাঁ, এখানে আবার আমাদের জানার কথা শুরু হচ্ছে। পড়ি তা হলে? আমি উত্তেজনা ও উৎকণ্ঠার সঙ্গে বললাম, পড়ো, পড়ো। ও পড়া শুরু করল :
দেখতে দেখতে তেত্রিশটা দিন পেরিয়ে গেল। রোজানা কিন্তু এল না। রাতের বেলা কে যে এসে ঘোরাফেরা করে আমার কামরায় আমার মাথায় খেলে না। কাউকে সাহস করে কিছু বলতেও পারি না পাছে আমাকে পাগল বা অবৈজ্ঞানিক মানুষ ভাবে।
হায় ঈশ্বর! শেষে আমার মতো কট্টর বৈজ্ঞানিক মনের মানুষকেও অলৌকিকে বিশ্বাস জন্মাতে হয়। এখন আমি স্থির জানি ঠিক কখন কীভাবে কী কী ঘটে যাবে আমার অন্ধকার কক্ষে। এই রুটিন বদলে দেওয়ার কোনো ক্ষমতাই আমার নেই। আমি নিরুপায় দর্শকের মতো সব সহ্য করছি এবং একটু একটু করে প্রেতাত্মায় বিশ্বাস করতে বসেছি। কিন্তু আর পারছি না।
আমি আজ সরাসরি ইংরেজ পলটনের কাছে গিয়ে অভিযোগ নথিবদ্ধ করলাম। হ্যারি ট্রলোপ হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, সিনিয়র ফেরি, আপনার কেন মনে হচ্ছে আপনার ঘরে যে আত্মার উপস্থিতি রোজ রাতে লক্ষ করেন তা আসলে রৌশন বাইয়ের?
বললাম, তার কারণ আমার সন্দেহ হচ্ছে যে, ইউসুফ আলি রৌশনকে হত্যা করেছেন। ট্রলোপ চক্ষু বিস্ফারিত করে বললেন, এটা প্রমাণ করা তো কঠিন নয়। ওঁর প্রাসাদে গেলেই হয় তদন্তে। কিন্তু মোটা টাকা খরচ করে সারিয়ে তুলে উনি ওকে হত্যা করতে চাইবেন কেন?
বললাম, কারণ রৌশন আমার সঙ্গে ইতালি চলে যেতে চেয়েছিল।
-তা হলে তো জানতে হবে আপনার সঙ্গে রৌশনের পালিয়ে যাওয়ার কারণ কী?
অগত্যা ট্রলোপকে সমস্ত ঘটনা সবিস্তার বললাম। ভুলভুলাইয়ার ঘটনাবলি শুনে বেচারি কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলেন। শেষে রীতিমতো বিরক্তির ভাব এনে বললেন এরকম একটা অদ্ভুত কেস আমার হাতে আসেনি কখনো। জানি না ইউসুফ আলির বাড়িতে গিয়ে আবার কী শুনব!
ইউসুফ আলির মুখে যা শুনলাম তাতে যৎপরোনাস্তি অবাক হয়ে গেলাম আমি নিজেই। ইউসুফ বললেন, রৌশন বাই নিহত? আপনারা কি খেপেছেন? ও তো জেনানায় বসে এখন দরবারি রাগে আলাপ করছেন। আপনারা শুনবেন?
এই বলে হাততালি দিলেন ইউসুফ। দু-জন খানসামা এসে আদাব করল আমাদের। তারপর ইউসুফ কী একটা নির্দেশ পাঠালেন জেনানায়। এর মিনিট পঁচিশ পর এক গ্লাস করে শরবত এবং দু-খিলি করে পান খেয়ে আমরা ভেতরে গিয়ে দেখলাম দিব্যি সাদা সালোয়ার কামিজ আর ওড়না পরা সাদা গালিচার ওপর আয়েসের ভঙ্গিতে বসে আছে রৌশন। আমার রোজানা।
আমি ইতালীয়তে বললাম, রোজানা, তোমাকে নিয়ে যেতে এসেছি আমি। আমার সঙ্গে ইংরেজ অফিসার আছেন। তোমার কোনোই ভয় নেই। একবার শুধু বলো তুমি কে, আর তুমি আমার সঙ্গে দেশে ফিরতে রাজি, তা হলেই কাল তোমাকে নিয়ে আমি জাহাজে উঠব নেপলসের পথে। রৌশন হাঁ করে তাকিয়ে রইল আমাদের দিকে। যেন এইমাত্র শোনা ভাষাটার একটি শব্দও তার বোধগম্য হয়নি।
