—কিন্তু উনি যে বললেন তুমি অসুস্থ হয়ে পড়ায় তোমায় বাধ্য হয়ে রেখে দিয়েছেন ওঁর প্রাসাদে।
প্রত্যেকের জন্য একটা পছন্দসই গল্প আছে ওঁর। তোমাকেও তেমন কিছু বলেছেন সম্ভবত।
—কিন্তু আজকের দিনে এরকম দাসপ্রথা কি চলতে পারে? উপরন্তু তুমি ইতালীয়, ভারতীয় নও। প্রয়োজন হলে আমি ইংরেজ রেসিডেন্ট সাহেবের কাছে অভিযোগ করব।
–খবরদার! ওই একটা কাজ তুমি একেবারেই করবে না। তা হলে খাঁ সাহেবের বাড়ি থেকে আমার জানাজা বেরোবে। আমার মৃতদেহ।
-তাহলে?
-তুমি চৌকের ঘরে রোজ রাত্তিরে তৈরি হয়ে অপেক্ষায় থাকবে। আমি জানি না কবে হবে সেটা, কিন্তু যেদিনই হবে আমি কালো বোরখা পরে মাঝরাত্তিরে চলে আসব। আর সেদিনই আমরা লখনউ ছেড়ে চলে যাব, ততদিন আর আমাদের দেখা হওয়ার সুযোগ নেই। বিদায়।
এরপর আমি আরও কিছু বলতে চেয়েছিলাম রোজানাকে, কিন্তু ওই তরফ থেকে কোনো সাড়া পেলাম না। তারপর অনেক ঘুরে একটা উন্মুক্ত জায়গায় এসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। বেশ কিছুদিন পরে ফের একটা আনন্দ বোধ করতে লাগলাম শরীরে ও মনে।
ফেরার পথে চুটিয়ে ফের বিরিয়ানি আর চাঁপ খেলাম। আর একটা ভালো ব্র্যাণ্ডি কিনে বাড়ি ফিরে জীবনের প্রথম চুরুটটা ধরালাম। রোজানা চুরুট খায় শুনে এই আকর্ষণটা হঠাৎ ছেয়ে ফেলেছে মনটাকে। আজ রাত থেকেই আমি রাতজাগা অভ্যাস করব। কে জানে কখন ও আসে!
৭.
রুমি দরওয়াজার চুড়োয় বসে ডায়েরির একটা বড়ো অংশ পড়া শেষ হল যখন, তখন বড়া ইমামবাড়ায় কিছু কিছু লোক জমেছে। এদের অধিকাংশেরই উদ্দেশ্য ভুলভুলাইয়া ঘুরে দেখা। আমি অনিরুদ্ধকে বললাম, চলো যাই আমরাও একটু ব্যাপারটা দেখে আসি।
ভুলভুলাইয়ার যে বর্ণনা ডায়েরিতে পড়েছি আমরা তার সঙ্গে হুবহু মিল খুঁজব সর্বত্র। আমরা দিব্যি মনের আনন্দে এগলি থেকে ওগলি, এচত্বর থেকে ওচত্বর, একুঠুরি থেকে ওকুঠুরি ঘুরে বেড়ালাম। অনেক জায়গাই ভেঙে ধুলো ধুলো হয়ে গেছে, বেশ কিছু কুঠুরি ভেঙে বন্ধ হওয়ার উপক্রম। কিন্তু জায়গার রহস্যময় অন্ধকার ও মজা কিন্তু সম্পূর্ণ অটুট আছে। আমরা সেই রহস্য উপভোগ করতে করতে সংরক্ষণের মান নিয়ে মন্তব্য করতে করতে তিনতলার এক কুঠুরিতে এসে পৌঁছোলাম।
একটু ঝুঁকে দু-জনে আমরা চারধারের গ্যালারি দেখছি আর ভাবছি নিকোলা ফেরি ঠিক কোনখানে দাঁড়িয়ে কথা কয়েছিলেন রোজানার সঙ্গে। হঠাৎ পাশ থেকে স্পষ্ট হিন্দিতে কথা ভেসে এল–নিকোলার ডায়েরিটা আমাকে ফিরিয়ে দিন, প্লিজ!
আমরা চমকে উঠে আমতা আমতা শুরু করলাম। অনিরুদ্ধ বলল, কিন্তু কে আপনি? উত্তর এল, আমাকে আপনারা ভালোই চেনেন। আমি এবার বুকে বল সঞ্চয় করে বললাম, আপনি রোজানা? ওপার থেকে কোনো জবাব এল না। অনিরুদ্ধ জিজ্ঞেস করল, আপনি কি জীবিত মৃত? এবার পাথরের গায়ে সেই গেলাসের কাচভাঙা খিলখিল হাসি। সমানে। কিন্তু কোনো উত্তর নেই।
আমি বললাম, কিন্তু আপনি কোন কুঠুরিতে? কোথায় গিয়ে দেব ডায়েরিটা?
—আমি এখানেই আছি। কিন্তু আমায় আপনারা খুঁজবেন না।
কথাটা শোনার আগেই কিন্তু আমি আর অনিরুদ্ধ কুঠুরি থেকে মাথা বাড়িয়ে রোজানাকে খোঁজা শুরু করে দিয়েছি। কিন্তু কেউ কোথাও নেই!
অনিরুদ্ধ এবার বলল, আপনাকে তো কোথাও দেখছি না। কী করে দেব খাতাটা?
পাথরের গায়ে কথা ফুটে উঠল : আপনাদের কোথাও যেতে হবে না। আমি নিজেই এসে নিয়ে যাব আপনাদের ঘর থেকে। আমি বললাম, আমাদের ঘর আপনি চিনবেন কী করে?
নিকোলা ফেরির ঘরেই আপনারা আছেন। অনিরুদ্ধ বলল, তা হলে এতদিন ডায়েরিটা নিয়ে যাননি কেন? ওই ঘরেই তো পড়েছিল জিনিসটা বরাবর।
কারণ ওতে একটা রুপোর ক্রস আছে। ক্রসটা বার করে নিয়ে ওটা টেবিলে রেখে দেবেন। আমি আসব।
-কখন?
—যখন আসি আমি ওখানে।
–মানে মাঝরাতে?
ওপার থেকে কোনো উত্তর হল না। অনিরুদ্ধ আর আমার দু-জনেরই একটা কাঁপুনি শুরু হল শরীরে। ভাগ্যিস ক্রসটা ছিল ডায়ারির মধ্যে! না হলে অভাবনীয় কিছু একটা ঘটে যেতে পারত কাল রাতেই। সেই অস্বাভাবিক অবস্থার মধ্যেই আমি কাতরভাবে বলে ফেললাম, কিন্তু ডায়েরিটা যে আমাদের সম্পূর্ণ পড়া হয়নি! জবাব এল, আজ বাকি দিনটুকু সময় দিলাম। পড়ে ফেলুন। বললাম, কিন্তু এত সুলিখিত এই ডায়েরিটা যদি আমরা ছাপতে চাই? পাথর কাঁপিয়ে নিষেধাজ্ঞা ধ্বনিত হল, না, আপনাদের দোহাই, ওটা প্রকাশ করবেন না। ওভাবে নিজেদের অমঙ্গল ডেকে আনবেন না। ফেরির আত্মাকে শান্তি দিন। অনিরুদ্ধ বলল, কিন্তু যদি আমরা নিয়ে যাওয়ার কথাই ভাবি? জবাব এল, আপনারা কিছুতেই তা পারবেন না। ওঘর থেকে ওটা নিয়ে কেউ যেতে পারেনি। ক্রসটা সরিয়ে দিলে কেউ, আমি ওটা নিয়ে যাব। আমি বললাম, তাতে কী লাভ আপনার? উত্তর এল, তা হলে আর যুগ যুগ ধরে ওটার পাহারা দিতে হবে না আর। আমি নিজেকে সরিয়ে নেব চৌক থেকে!
এরপর পরিবেশটা ফের নিথর, নীরব হয়ে গেল। আমরা ভুলভুলাইয়া থেকে বেরিয়ে বেড়াতে বেড়াতে হজরতগঞ্জ চলে এলাম। একটা ভালো দোকান দেখে খাবার অর্ডার করে বসলাম। তারপর ঝোলার থেকে ডায়েরিটা বার করে হাতড়াতে লাগলাম ক্রসের খোঁজে। কিন্তু কোথায় ক্রস! কোথাও তো নেই সেটা।
আমি বললাম, অনিরুদ্ধ, মলাটটা ছিঁড়ে ফেলো তো। দেখো তো ওখানে কিছু সেঁধিয়ে আছে কি না।
