রোজানার কান্না থামল। একটা দেশলাই জ্বালানোর আওয়াজ শুনলাম। একটু পর একটা তৃপ্তির প্রশ্বাস। জিজ্ঞেস করলাম, দেশলাই জ্বালালে কেন? উত্তর এল, বদভ্যাস। চুরুটের নেশা আছে আমার। বললাম, কেন? উত্তর এল, ওভাবেই নিজের নিঃসঙ্গ সময়গুলো কাটাই, নিকোলা।
—কিন্তু নিঃসঙ্গ কেন?
—কারণ, রোজানা যে নিকোলা ছাড়া কাউকে ভালোবাসেনি।
এবার কেঁদে ফেলার উপক্রম আমার। তবু চোখের জল চেপে যতটা সম্ভব স্বাভাবিক কণ্ঠস্বরে বললাম, কিন্তু তুমি ওভাবে হারিয়ে গেলে কেন?
স্পষ্ট শুনলাম রোজানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সম্ভবত চোখও মুছল। তারপর বলল, তুমি জানো নিকোলা, আমার বাবা স্থপতি ছিলেন।
বললাম, খুবই জানি। বাবাকে ওঁর কোম্পানি লখনউয়ে পাঠিয়েছিল মেহমুদ আব্বাস ইলাহি সাহেবের প্যালেস তৈরির জন্য। সম্পূর্ণ ইটালিয়ান মার্বেলে হওয়ার কথা ছিল সে-প্যালেসের। তবে ফিরিঙ্গি ডিজাইনে। রেসিডেন্সি যেমন।
-বুঝলাম।
—বাবার খুব শখও ছিল মেয়েকে উর্দু শেখানোর। কারণ, ওঁর ধারণা হয়েছিল উর্দু ফরাসির মতো মিষ্টি ভাষা।
-বেশ।
–আমার উর্দু শিক্ষক অবাক হয়ে গিয়েছিলেন আমার উচ্চারণ শুনে। বলেছিলেন, আমি একদিন উর্দুতে সেরা কবিতাও মুশেরায় মুশেরায় পাঠ করতে পারব। কিন্তু…
—কিন্তু?
-একদিন আব্বাস ইলাহি পাথরের মেঝেতে পা হড়কে পড়ে পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়লেন। তখন ডিজাইন বোঝাতে বাবাকেই যেতে হত ওঁর বাড়িতে। এবং এরকম একদিন রাস্তার মাঝখান থেকে ওঁকে উঠিয়ে নিয়ে গেল ইংরেজদের চররা…
আমি উদবিগ্ন হয়ে রোজানার কথার মধ্যেই প্রশ্ন করে বসলাম, কেন? কী দোষে? ইংরেজদের সন্দেহ হয়েছিল বাবা ইলাহি সাহেবের বাড়িতে চোরাকুঠি এবং সুড়ঙ্গ বানানোর নকশা করছেন। এই ইলাহি সাহেব ছিলেন লখনউয়ের নবাবদের বড়ো পরামর্শদাতা। ওঁর মাধ্যমেই অস্ত্রশস্ত্র কেনাকাটার কাজ চলত বলে সন্দেহ হয়েছিল ইংরেজদের। বাবাকে ওরা সাত দিন সময় দিলেন লখনউ ত্যাগের। তখন বাবা বাড়িতে এসে ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, রোজা, তোর আর উর্দু শেখা হল না। চল, চলে যাওয়ার আগে অন্তত ল্যাবিরিন্থটা দেখিয়ে আনি। আর ওই বেড়াতে যাওয়াটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড়ো কাল হল।
-কীরকম!
—ওই ভুলভুলাইয়াতেই আমি বাবার থেকে আলাদা হয়ে গেলাম। যত পথ খুঁজি বাবার কাছে পৌঁছোব বলে ততই রাস্তা হারিয়ে ফেলি। ঘুরতে ঘুরতে ক্লান্ত হয়ে হঠাৎ বোধ করলাম আমার মৃগী রোগের অ্যাটাকটা আসছে। তারপর হঠাৎ সব অন্ধকার। তারপর…
তারপর জ্ঞান হল যখন, তখন দেখলাম আমি একজন বাইজির কোঠায় শুয়ে আছি। চারপাশে নাচ, গান, রেওয়াজ চলছে। আমি বাড়ি যাব! বাড়ি যাব! বলে প্রচন্ড কান্নাকাটি শুরু করলাম। কোঠার লোকজন শহর ছেনেও আমার বাবাকে খুঁজে পেল না। শেষে খবর এল আমাকে হারিয়ে ফেলে বাবা পাগল হয়ে গিয়ে ইংরেজদের কাছে ফের ধরা দেয়। ওরা পরের দিনই জাহাজে তুলে পাঠিয়ে দেয় কলকাতায়। তারপর তাঁর খোঁজ আর কেউ পায়নি।
আমরা নেপলসে শুনেছিলাম তোমার বাবা লখনউয়ে এক মুসলমান নারীকে বিয়ে করে ওখানেই থেকে গেছেন। তাই শুনে তোমার মা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দেন এবং বছর আষ্টেক পর টিবি হয়ে মারা যান।
ওপার থেকে একটা হাহাকার ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ল পাথরের পর্দায় পর্দায়। আমি কুক্ষণে জন্মেছিলাম, হে ঈশ্বর! সব দুঃখের গোড়া আমি। কেন আমায় বাঁচিয়ে তুলেছিলেন মেহরুন বেগম। কেন আমার ছুড়ে ফেলেননি গোমতীর জলে! আমি ওকে শান্ত করার জন্য বললাম, কিন্তু ঈশ্বর তো মুখ তুলে চেয়েছেন। তাই না আমায় পথ ভুলিয়ে শেষ অবধি এনে ফেলেছেন ভুলভুলাইয়াতে!
—কিন্তু এই ভুলভুলাইয়া থেকে তো আমার আর মুক্তি নেই, নিকোলা।
-কেন বলছ ও কথা, রোজানা? তুমি কি মাতৃভূমিতে ফিরে যেতে চাও না আর আমার হাত ধরে?
—ভীষণরকম চাই, নিকোলা, মেহফিলে মেহফিলে নেচে-গেয়ে আমি যে আর পারছি না।
–তা হলে ভয় কীসের?
-ভয় ইউসুফ আলিকে! অসম্ভব ভদ্র মুখোশের পিছনে একটা পিশাচের চেহারা আছে। লোকটার। যে ভয়ে বাড়িতে আমি তোমাকে চেনার কোনো ইঙ্গিতই দিইনি। ওর প্রধান চর ওই বুড়ি মহিলা। উনি ঠিক লাগিয়ে দিতেন যদি একটি ইতালীয় বাক্যও আমি উচ্চারণ করে বসতাম।
—সেকী! মানুষটা এইরকম?
—এ তো কিছুই না।
–তা হলে তুমি এখানে এলে কী করে?
—আমি পালকি করে মসজিদে যেতে যেতে তোমাকে দেখে অনুসরণ করেছি। তারপর তুমি ভুলভুলাইয়াতে ঢুকছ দেখে গোপনে একটা কুঠুরিতে এসে অপেক্ষায় ছিলাম। তুমি যতক্ষণ-না তোমার কুঠুরিতে ঢুকছিলে আমি কথা কইতে পারছিলাম না।
—কিন্তু আমি যদি এই ঘরে না আসতাম।
—তা হলে অন্য একটা ঘরে গিয়ে অপেক্ষা করতাম।
—কিন্তু সে-ঘরেও যদি না যেতাম?
–তা হলে অন্য কোথাও!
—তাতেও যদি না মিলতাম?
—মিলতামই। জীবনে একটিবার আমার তোমার সঙ্গে কথা হওয়ার দরকার ছিল।
—শুধু এটাই বলতে যে, তুমি আর দেশে ফিরবে না কোনোদিন?
—না। শুধু এইটুকু যে, তোমাকেই, শুধু তোমাকেই আমি ভালোবেসেছি। আমার গজল শুনে এখানকার রইস লোকেরা যখন আবেগের সঙ্গে ‘সুহানাল্লা! সুহানাল্লা!’ করেন তখন ওঁদের কেউই ভাবতে পারে না আমি কার জন্য গাইছি।
—এত কিছুর পরেও তোমাকে এখানে ছেড়ে যেতে বলছ আমাকে?
-কী আর করব বলো? ইউসুফ সাহেব এক হাজার মোহর দিয়ে আমাকে কিনেছেন মেহরুন বেগমের কাছ থেকে, সে-দাম আমি শোধ দেব কোত্থেকে?
