তাতে বলছে যে, নবাবের নির্দেশেই সারাদিনের কাজ রাতেরবেলায় ভেঙে তছনছ করা হত। ফলে পরের দিন সকালে কাজ শুরু হত সেই গোড়ার থেকে। লোককে লাগাতার কাজে নিযুক্ত রাখার এই উদ্যোগ মানুষের কাছে ভীষণ প্রিয় করেছিল নবাব বাহাদুরকে। তারা ওঁর প্রশংসায় একটা কথাও চালু করেছিল সে-সময়—’যিসকো ন দে মত্তলা, উসকো দে আসফউদ্দৌলা। যার অর্থ হল–ঈশ্বর যাদের জন্য জোগাননি, তাদের জন্য জোগান আসফউদ্দৌলা।
এই বড়া ইমামবাড়ার একটা আশ্চর্য অঞ্চল হল ভুলভুলাইয়া গোলকধাঁধা। ছেলেবেলা থেকে পড়ে এসেছি গোলকধাঁধায় ঢুকে গ্রিক নায়ক থেসেয়ুস তরবারি দিয়ে নিহত করেছিলেন ষন্ডদৈত্য মিনোটরকে। আর ফিরে এসেছিলেন জীবিত অবস্থায় রাজকুমারী আরিয়ানের কাছে। সেই থেকে একটা গোলকধাঁধায় ঢোকার অদম্য বাসনা ছিল আমার। কিন্তু একটা গোলকধাঁধা যে শেষ অবধি কী ভয়ংকর একটা অভিজ্ঞতা হতে পারে তা লখনউয়ের ভুলভুলাইয়াতে না এলে কোনোদিনও জানা হত না।
রৌশনকে চিকিৎসা করে সারিয়ে তুলে এনেছি। বিনিময়ে প্রায় পনেরোটা স্বর্ণমোহরও আয় করেছি। অথচ আজও স্পষ্ট জানলাম না যে, মেয়েটি আদৌ আমার বাল্যসখী রোজানা কি না। এক-দু-বার ওর পূর্বপরিচয় জানার জন্য ইউসুফ আলিকে কথাটা পেড়েছি, কিন্তু ভদ্রলোক কীরকম ভাসা ভাসা জবাব দিয়ে সবটা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। বিষয়টির উত্থাপন যে তাঁকে বিশেষ প্রীত করে না সেটা বুঝতে আর বাকি থাকেনি। শেষে রৌশন যখন সম্পূর্ণ সেরে গেল, তিনি আমাকে অনেক উপহার ও পাঁচটি স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বললেন, আপকো বহৎ বহৎ মেহেরবানি। আপকো ইয়ে হমদর্দি হম কভি নহি ভুলেঙ্গে। বলা বাহুল্য, একথার অর্থ—আর আপনাকে এ বাড়িতে আসতে হবে না। আমার ভেতরটা এই কথায় যৎপরোনাস্তি দমে গেল। রৌশন কে, এই প্রশ্নের উত্তর না জানতে পেরে মনটা ভয়ানক আনচান করতে লাগল। অতঃপর মনের এই অবস্থা কাটিয়ে ওঠার জন্য খাওয়াদাওয়া আর গান শোনার আরাম পরিত্যাগ করে মধুর বিষণ্ণতার শহরটাকে ঘুরে ঘুরে দেখার সিদ্ধান্ত নিলাম। উষ্ণ বিরিয়ানি, চাঁপ ইত্যাদি সুখাদ্যের থেকে মন সরে গেল ইট-কাঠ-পাথরের শীতল সান্নিধ্যে। এবং এভাবে ক্রমে চৌক, আমিনাবাদ, হজরতগঞ্জের ঘরদুয়োর দেখার পর রেসিডেন্সি, ইমামবাড়া, বরাদরি, লা মৰ্তিনিয়ের, কৈসরবাগ, ছত্তর মঞ্জিল ইত্যাদি দেখার পর একদিন আপন মনে ঢুকে পড়লাম ছেলেবেলার সেই শখের ক্ষেত্র গোলকধাঁধায়। বড়া ইমামবাড়ার ওই প্রসিদ্ধ ভুলভুলাইয়ায়।
ভুলভুলাইয়া বাস্তবিকই ভুলভুলাইয়া। অর্থাৎ ভুলের ওপর ভুল চাপিয়ে রাস্তা হারিয়ে বসা। ঢুকে পড়েই বুঝতে পারলাম যে, এই অন্ধকার কুঠুরির বিস্তার থেকে, সংকীর্ণ অলিন্দের জট থেকে সহজে আলোর রাস্তায় ফিরে আসা হবে না আমার। বড়ো কথা, ওই ভুলের স্বর্গ থেকে বেরিয়ে আসার আকাঙ্ক্ষাও আমার ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছে। হারিয়ে যাওয়ার নেই মানা এই মনের অবস্থা আমার। আমি উত্তরোত্তর পথ হারাতে হারাতে কোথায় যে তলিয়ে গেছি ঈশ্বরই জানেন—হঠাৎ আমার কানের পাশে একটা মধুর স্বরে কে যেন ডেকে বসল ‘নিকোলা!’
আমি চমকে উঠে আশেপাশে তাকালাম, কিন্তু ওই গভীর অন্ধকারে কাউকে কোথাও দেখলাম না। নীচে তাকাতে বুঝলাম আমি একটা মস্ত গ্যালারির একটা ছোট্ট কক্ষে দাঁড়িয়ে আছি। নীচে প্রশস্ত সভাকক্ষ একটা, আর তার চারধারে চার-পাঁচতলা ধরে গোল হয়ে ছড়িয়ে আছে কুঠুরির সারি, সারি, সারি। ফের শুনলাম মিষ্টি স্বরে কে ডাকল ‘নিকোলা!’ আমার হৃৎস্পন্দনও এবার ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল আমার কানে। আমি বুকে দু-হাত চাপা দিয়ে বললাম ইংরেজিতে, তারপর ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে, কে আপনি? আর কানের পাশে পাথর থেকে বেরিয়ে এল মৃদু মিষ্টি ইটালিয়ানে, ‘আমি তোমার রোজানা, প্রিয়!
আনন্দে, ভয়ে, রোমাঞ্চে আমার সারাশরীর থরথর করে কাঁপতে লাগল। আমি পাথরের দেওয়ালে হাত রেখে নিজেকে সামলে বললাম, রোজানা, তুমিই কি রৌশন? ওপার থেকে কাচভাঙা হাসি হেসে রোজানা বলল, আবার কে? জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কোথায়? উত্তর এল, তুমি চোখ নামিয়ে ডান দিকের গ্যালারির দিকে তাকাও। তাকালাম, দেখলাম দূরে এক অন্ধকার কুঠুরিতে কালো বোরখা পরে কে একজন দাঁড়িয়ে আছে। বুঝলাম, ওটাই রোজানা।
বললাম, এভাবেই বুঝি গোলকধাঁধাটা তৈরি, না? যাতে বিশেষ একটা কুঠুরি থেকে। গোলকধাঁধার বিশেষ কোনো কুঠুরিতে বার্তা পাঠানো যায়?
-এবং প্রেমালাপ করা যায়!
কথাটা বলে রোজানা হাসল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু আমাদের এভাবে কথা বলতে হচ্ছে কেন?
—কারণ, তুমি পরদেশি!
–পরদেশি তো তুমিও।
–কে জানে আমি পরদেশি। এখানে আমি লখনউয়ের মুকুটের এক শেষ মণি রৌশন বাই।
–কিন্তু…কিন্তু তুমি এখানে এলে কী করে?
–সে আমার ভাগ্য!
—সেকথা জানতে পারি না কি?
–জেনে লাভ?
—সে তো অনেক পরের কথা। আগে তোমার ঘটনাটা শুনি।
ওপারে একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। তারপর একটা দীর্ঘ নীরবতা। পরে নীরবতা ভঙ্গ করে একটা চাপা কান্না ফুটে উঠল। আমি বিব্রত বোধ করে তড়িঘড়ি বলে বসলাম, কেঁদো না প্লিজ। তা হলে আমার ভগ্নহৃদয় একেবারেই ভেঙে পড়বে। আমি তোমার কাহিনি থেকে সাহস অর্জন করতে চাই, রোজানা।
