ইউসুফ আলির বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসছি, দেখি একজন খানসামা একটা রুপোর রেকাবিতে দুটো সোনার মোহর নিয়ে এসে দাঁড়াল। আমি অবাক হয়ে বললাম, এ আবার কী? ইউসুফ আলি সামান্য হেসে বললেন, এ তো আপনাকে গ্রহণ করতেই হবে, জনাব। একে ফিজ বলুন আর যাই বলুন। এ আমার পরিবারের তেহজিব। বাড়িতে মেহমান এলে খালি হাতে ফেরাতে নেই।
বলতে নেই, লখনউয়ে থেকে থেকে দু-টি উত্তম শব্দের মুখোমুখি হতে হয়। এর একটা তেহজিব যার ইংরেজি হবে grace এবং অন্যটি তমিজ, যার ইংরেজি হতে পারে manners. বলা যায় এই দুটি শব্দই সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে লখনউয়ের জীবনযাত্রা, মানুষের সম্পর্কের সৌন্দর্য। আমি নিজেই ক্রমশ প্রভাবিত হয়ে পড়ছি এই ব্যাবহারিক সৌকর্যে। আমার কেবলই ধারণা হচ্ছে যে, লখনউয়ের মানুষ আসলে ফরাসিদের আত্মার পড়শি। আর তাদের শহরটা হল এক আধুনিক রোম নগরী। আমার পসার যদি জমে তবে এই শহরে আরও অন্তত একটা বছর থাকার ইচ্ছে আছে। যদি না…না, না, এত তাড়াতাড়ি ওরকম একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। সত্যিই রৌশন ‘রোজানা’ কি না নিঃসন্দেহ হতে হবে। জানতে হবে এই অদ্ভুত জীবনধারা পরিত্যাগ করে ও ফের নেপলস ফিরে যেতে চাইবে কি না। সর্বোপরি লখনউ শহর ওকে চলে যেতে দেবে কি না।
৬.
ডায়ারির এই দীর্ঘ রোমাঞ্চকর এন্ট্রিটা পড়া শেষ হল যখন, তখন আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। ভোর হয় হয়। অনিরুদ্ধ বলল, এবার একটু মুখটুখ ধুয়ে চা খাওয়া যাক। তারপর দিনের প্রথম আলোয় একটু বড়া ইমামবাড়া আর রুমি দরওয়াজার চত্বরটা ঘুরে আসা যাক। তাতে ডায়েরির রসটা আরও বেশি পাওয়া যাবে।
এতক্ষণ একটানা শব্দ করে পড়ার পর বাস্তবিকই একটু চায়ের টান হচ্ছিল। বললাম, ভালো বলেছ! রাতটা যা গেল, এখন খানিকটা চা-পরোটা হলে ধড়ে প্রাণ আসে। বাইরে ঘুরে এলেও ভালো লাগবে। নিকোলা ফেরি আর রৌশন যেন বুকের ওপর চেপে বসছে।
রুমি দরওয়াজাকে যদিও পরিকল্পনা করা হয়েছিল বড়া ইমামবাড়ার তোরণ হিসেবে ওটা কিন্তু গোটা শহরটার প্রবেশদ্বার হয়ে উঠেছিল লোকের চোখে। এমনিতে তিনতলা তোরণটি যথেষ্টই উঁচু, কিন্তু বাস্তবে যে সত্যিই কতখানি উঁচু তা ওর চুড়োয় চড়লে জ্ঞান হয়। আমরা চা-পরোটা খেয়ে সাতসকালে একেবারে চুড়োর ছোট্ট চৌখুপ্পিতে উঠতে হঠাৎ করে মনে হল গোটা শহরটাই যেন মুঠোর মধ্যে চলে এল। লখনউয়ের গর্ব যেসব পুরোনো ইমারত বা বাগিচা তার সব কটিই নাগালে এসে গেল আমাদের। চোখ খোলা রেখেও সহজেই ভেবে নিতে পারলাম আমরা নিকোলা ফেরির লখনউয়ে আছি।
মুগ্ধ হয়ে দিনের প্রথম, নরম আলোয় সাদাৎ আলি খাঁ, নবাব আসফ-উদ-দৌল্লা আর ওয়াজেদ আলি শাহের শহরটাকে চোখ মেলে পান করছিলাম যখন হঠাৎ নজরে এল অনিরুদ্ধর সামান্য তৎপরতা। দেখি ওর ক্যামেরা আর টেপ রেকর্ডারের ডেনিম ব্যাগ থেকে সন্তর্পণে বার করে আনছে ফেরির ডায়েরি।
আমি ওর কান্ডটা নজর করেছি দেখে একটু লজ্জিত হয়ে বলল, এটা ছেড়ে আসতে পারলাম না। ভাবলাম যদি বেড়াতে বেড়াতে ফের পড়ার শখ হয়। বললাম, সেই শখ কি হচ্ছে এখন? ও সেই লজ্জিত হাসিটাকে মুখময় বিস্তৃত করে বলল, খু-উ-ব! আমি বললাম, কোথায় বসে পড়বে ভাবছ? ও অবাক হয়ে বলে উঠল, কেন এইখানেই? এবার আমিই অবাক হয়ে চুপ করে গেলাম। এত উঁচুতে, এত সংকীর্ণ একটা জায়গায় বসে ছেলেটা একটা রোমহর্ষক দিনলিপি পড়বে! শেষে ভয়ে ভয়ে বললাম, তা হলে বেছে বেছে নিরাপদ জায়গা থেকে পড়ো। এমন কিছু পোড়ো না যা শুনে টলে পড়তে হয় এখান থেকে। অনিরুদ্ধ বলল, তা হলে দেখি কী পড়া যায়! ও ফরফর করে পাতা ওলটাতে ওলটাতে এক জায়গায় এসে থেমে বলল, দেখুন তো এ জায়গাটা কেমন লাগে?
অযোধ্যার যে-নবাবি শাসন মাত্র কদিন আগে করুণভাবে শেষ হয়ে গেল এবং যার প্রত্যক্ষদর্শী রয়ে গেলাম আমি তার পত্তন শোনা যায় সাদাৎ আলি খাঁর তখতে আসীন হওয়া থেকে। সেটা ১৭৩২ সালের ঘটনা। ওঁর সময়ে, এবং ওঁর ভ্রাতুস্পুত্ৰ মনসুর আলি খাঁর সময়ে অবিশ্যি অযোধ্যা বা অবধের বা ঔধের রাজধানী ছিল ফৈজাবাদ। পরে এই বংশের সবচেয়ে উজ্জ্বল কীর্তির মানুষ আসফউদ্দৌলার সময়ে রাজধানী সরে আসে এখানে লখনউয়ে। এই আসফউদ্দৌলার শাসনকালকেই বলা হয় আউধের স্বর্ণযুগ।
এই শাসনকালেই তৈরি হয়েছিল বড়া ইমামবাড়া।
এই লাইনটায় অনিরুদ্ধ একবার থেমে আমার দিকে তাকাল। ভাবখানা এমন—কী করে হঠাৎ এই বড়া ইমামবাড়ার জায়গাটাতেই পড়া শুরু হল আপনাআপনি। সেভাবে তো বাছাবাছি সত্যি কিছু হয়নি। আমি নীরবে হাসলাম, ডায়েরিটা ক্রমশ একেকটা অস্বাভাবিক কান্ডের কারণ হচ্ছে। যাকে অলৌকিক বললেও তেমন ভুল হয় না। অনিরুদ্ধ ফের পড়া শুরু করল :
বড়া ইমামবাড়া উৎসর্গীকৃত ছিল পয়গম্বরের উত্তরসূরি ইমাম হুসেন এবং হাসানের স্মৃতির উদ্দেশে। ওঁদের শহিদ হওয়াকেই স্মরণ করা হয়েছে। এই উৎসর্গের পাশাপাশি ইমামবাড়ার একটা প্রতীকমূল্যও আছে। ১৭৮৪-তে আউধ রাজ্য যখন মন্বন্তরে ছারখার হয়ে যাচ্ছে তখন আর্ত মানুষের সাহায্যের জন্যই ইমামবাড়া নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন তিনি। উদ্দেশ্য ছিল এভাবেই জনগণকে কাজের জোগান দিয়ে যাওয়া। এই নিয়ে একটা জনপ্রিয় কাহিনি আছে শহরে।
