আমি এক বিচিত্র ধন্ধের মধ্যে পড়ে, রহস্যের জটিলতা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বললাম, তো বাটি চালাচালির সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? ইউসুফ আমার ওজর-আপত্তির কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকার মতো করে বললেন, মিরন বক্সকে বাটি চালতে বলেছিলাম ডাক্তার বাছতে। যাঁর দাওয়াইয়ে রৌশন এ যাত্রায় বাঁচতে পারেন। ওর সেই বাটি চৌকে আপনার তিনতলার কামরায় গিয়ে হাজির হয়েছে। এখন আপনি বলুন, আপনি রৌশনের চিকিৎসা করবেন কি করবেন না।
আমি শরবতের গেলাসে শেষ চুমুক দিয়ে গেলাসটা নামিয়ে রেখে বললাম, তা হলে চলুন। আপনার রোগীকে দেখি। ইউসুফ আলি খাঁ হাসলেন—ইয়েহি ন বাত! আমি জানতাম আপনি আমাকে নিরাশ করবেন না। আমরা একটার পর একটা অলিন্দ পার হয়ে প্রাসাদের অন্দরমহলে ঢুকলাম। খানসামা কাচের বেলুনে বসানো আলোর প্রদীপ ধরে আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল। যত ভেতরে যাই তত চড়া হয় আতরের সুরভি। বুঝতে অসুবিধে হয় আমরা মরদের এলাকা ছেড়ে জেনানার দিকে পা বাড়াচ্ছি। একসময় ইউসুফ আলি আমার কাঁধের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললেন, আপনার আগে বাইরের খুব বেশি পুরুষ এতদূর আসেনি এই জেনানায়। ডাগডারদেরই এটা বিশেষ সুযোগ।
ঠিক কতগুলো ঘর বা অলিন্দ পেরিয়ে এসেছি খেয়াল নেই; শেষে কেবল একটা প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল এক কক্ষে এসে দেখলাম সাদা মসলিনের চাদরে ঢাকা একটি দেহ শোয়ানো আছে পেতলের পালঙ্কে। অন্ধকারে ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না কতজন মহিলা মুখের ওপর পরদা টেনে বসে আছেন রৌশন বাইয়ের পায়ের দিকটায়। ইউসুফ আলি ওঁদেরই একজনকে নির্দেশ দিলেন রৌশনের হাতটা চাদরের তলা থেকে বার করে আমার হাতে দিতে। নাড়ি দেখতে হবে, অথচ রোগিণীর হুঁশই নেই। তার নিজের পক্ষে হাত বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়।
একজন মহিলা একটা লম্ফ এনে ধরেছেন, আমি সেই সামান্য আলোয় চমকে উঠলাম ভেতরে ভেতরে। এ হাত তো আমার খুব অচেনা নয়! কার হাত যেন? এমন কোন মানুষের যার শুধু হাতটুকু দেখেই আমি তাকে চিনে নিতে পারি। হ্যাঁ হ্যাঁ, কবজির পাশে সেই ছোট্ট কাটা দাগটাও তো আছে! এ হাত কি তা হলে…
রৌশনের মুখের কাপড়টাও সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, আর আমার হৃৎপিন্ডটা মুখ দিয়ে লাফিয়ে বেরিয়ে যেতে চাইছে। আমার বাল্যের বান্ধবী রোজানা পাউলি এই মুহূর্তে আমার সামনে অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছে রৌশন বাই নামে! হা ঈশ্বর! বিধির এ কেমন লিখন। নেপলসের বেলাভূমিতে একদিন যার সঙ্গে নিয়মিত খেলা করেছি সেই পরমাসুন্দরী বালিকাকে আজ বিদেশ বিভুঁইয়ে কীভাবে আবিষ্কার করতে হল। আমি হাঁ হয়ে অপরূপা রৌশনের দিকে তাকিয়ে আছি দেখে ইউসুফ বললেন, বিলাইতি রক্ত আছে ওর শিরায়। যে কারণে ওর ডাকনাম আছে একটা–বেলাইতি বেগম।
আমার ঠোঁট বেয়ে অস্ফুটে বেরিয়ে এল—রোজানা! ইউসুফ ব্যাপারটা ধরতে না পেরে বললেন, রোজানা নয়, রৌশন, তবে শুনতে কিন্তু একইরকম লাগে।
আমি পালঙ্কের পাশে টুলে বসে রোজানার, থুড়ি রৌশনের, নাড়ি দেখতে লাগলাম। আমার মনে পড়ল সেই বাল্যকালেও খেলতে খেলতে রোজানা মাঝে মাঝেই অচেতন হয়ে পড়ে যেত। ওর বাবা জানতেন যে মেয়ের মৃগী রোগ আছে।
জ্বর কিন্তু তেমন নেই। তা হলে এরকম অজ্ঞান হয়ে আছে কেন? জিজ্ঞেস করতে উপস্থিত মহিলাদের একজন বললেন, জ্বর না থাকলেও বেগম সাহেবা মাঝে মাঝেই অজ্ঞান হয়ে যান। আমি ব্যাপারটা কী বোঝার জন্য মহিলাদের একজনকে একটা ন্যাকড়া পুড়িয়ে আনতে বললাম। সেই পোড়া ন্যাকড়ার ধোঁয়া শোঁকাতেই চাপা গোঙানির আওয়াজ করে ফিট ছাড়ল। বুঝলাম, মৃগীর ব্যাপারটা না ধরতে পেরেই উলটোপালটা চিকিৎসা হয়েছে মেয়েটির। হঠাৎ মনটা ভীষণ দমে গেল, বড় কষ্ট হতে লাগল। বালক বয়সে, যাকে এত ভালোবেসেছিলাম তাকে এত বিচিত্র এক পরিবেশে এত কষ্টের মধ্যে দেখে আমার চোখ ভিজে এল। আমি বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের গাম্ভীর্য কণ্ঠে আরোপ করে হুকুম জারি করলাম, ঘরে একজন শুধু মহিলা থাকুন এবং বাকি সব বাইরে গিয়ে অপেক্ষা করুন। আমি স্টেথোস্কোপ দিয়ে রোগিণীর শ্বাসকষ্ট ও ব্যথা পরীক্ষা করব।
সবাই চলে যেতে আমি সেবিকাকে বললাম রৌশনকে ধরে বসাতে। বসতে বসতে রৌশন চোখ মেলল, আমি ইতালীয় ভাষায় ওকে জিজ্ঞেস করলাম, রোজানা, তুমি আমায় চিনতে পারছ? আমি নেপলসে তোমাদের বাড়ির পাশে থাকতাম। তোমার সঙ্গে সমুদ্রতীরে খেলতাম। তোমায় কথা দিয়েছিলাম বড়ো হয়ে ডাক্তার হব আর তোমাকে বিয়ে করব। তোমার সেই প্রিয় নিকোলা আমি। নিকোলা ফেরি। আমি ডাক্তার হয়েছি, খুব নাম করেছি, কিন্তু তোমাকে পেলাম না। তাই বিয়েও করিনি। বললা তুমি আমায় চিনতে পারছ, রোজানা? আমি তোমায় সারিয়ে তুলব আর ফিরিয়ে নিয়ে যাব নেপলসে।
কিন্তু হায় নিয়তির এ কী নিষ্ঠুর পরিহাস। রোজানা এমনভাবে চেয়ে রইল আমার দিকে যেন ইতালীয় ভাষার একটি বর্ণের সঙ্গেও তার পরিচয় নেই। ওদিকে সেবিকা মহিলা এমনভাবে আমার দিকে চেয়ে রইলেন যেন আমি কোনো ভাষা বলিনি, কোনো গর্হিত মন্ত্র উচ্চারণ করেছি। আমি তখন ফের কিছুদিন যাবৎ রপ্ত আমার ভাঙা হিন্দিতে বলতে শুরু করলাম, তব ঠিক হ্যায়। অব লেট যাও। আঁখ খোলো। জোরসে দম লো। ইত্যাদি, ইত্যাদি।
আমার কথামতো রৌশনও তাই করতে লাগল এবং সেবিকা মহিলা নিশ্চিত হলেন যে, বাইজি কোনো বিলাইতি ভাষা জানে না। আমারও ক্রমে কীরকম কীরকম সন্দেহ হতে শুরু করল, কই, কিছু ভুল বুঝলাম না তো? আবার তার পরেও ধন্ধ থেকে গেল ওই মৃগীর ব্যাপার আর হাতের ছোট্ট কাটা দাগটা নিয়ে। কিন্তু চিকিৎসা তো চালিয়ে যেতেই হবে। আমি হাতের ব্যাগ খুলে একটা ওষুধের নাম লিখে বললাম, এই ওষুধ আনিয়ে দিনে দু-দাগ করে খাইয়ে দেবেন। আর অজ্ঞান হলে ওই ন্যাকড়া পুড়িয়ে তাড়াতাড়ি জ্ঞান ফিরিয়ে আনবেন। বেশিক্ষণ ধরে অজ্ঞান থাকলে শরীর দুর্বল হয়ে পড়বে।
