আলোটা কেন নিভেছিল আমরা জানি না। কী করে এল তাও জানি না। কিন্তু কিছুক্ষণ যাবৎ যে প্রচন্ড ভয় আমাদের গ্রাস করেছিল তা নিমেষে উবে গেল নিঃশ্বাসটা মিলিয়ে যেতে এবং আলোটা ফিরে আসতে। একটা অশুভ উপস্থিতিই যেন মুছে গেল আলোয় আবির্ভাবে।
ভীষণ জল তেষ্টা পেয়েছিল আমার, কিন্তু ওই কলসি থেকে জল খেতে সাহস হল না। উপায়ান্তর না দেখে একটা সিগারেটই ধরালাম। অনিরুদ্ধ বলল, আমায়ও একটা দিন তা হলে।
দিলাম। দুটো সুখটান দিতেই বুঝলাম রাতের মতো ঘুম গায়েব হয়েছে। হাতঘড়িতে সময় দেখলাম রাত তিনটে। দু-একটা কাশি ঝেড়ে গলা পরিষ্কার করে বললাম, অনিরুদ্ধ, ঘুম তো গেল, মনে হচ্ছে। ও ম্লান হেসে বলল, তা তো গেল।
–তা হলে?
—তা হলে আর কী? সাহেবের ডায়েরিটাই পড়ন। আমি শুনি।
আমাকে ফের একবার চমৎকৃত করল ছেলেটি। ও কী করে, কী করেই যেন জেনে যায় আমি কখন কী চাই। আমি বললাম, অতি উত্তম প্রস্তাব। তা হলে শোনো, আমি পড়ছি। আমি পড়তে শুরু করলাম।
৫.
লখনউয়ের মানুষের মধ্যে একটা অসাধারণ সৌজন্যবোধ এবং বিনীত ভাব লক্ষ করি সারাক্ষণ, যেটা বেলজিয়ামের মানুষের মধ্যে খুব বেশিরকম নজরে আসে। এদের বিনয় ও ভদ্রতা নিয়ে মজার মজার সব গল্প চালু আছে। যার একটা হল খুব ধনী সম্প্রদায়ের লোকও কাউকে নিজের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানালে বলে ‘মেরা গরিবখানেমে যরাসা তসরিফ রখিয়েগা। তো এরকম একটা গরিবখানায় গিয়ে তো আমার চক্ষুস্থির!
গরিবখানা বলে নিয়ে গিয়ে আমাকে ইউসুফ আলি খাঁ সাহেব বসিয়ে দিলেন একেবারে এক মার্বেলের প্রাসাদের বৈঠকখানায়। পাথরের মধ্যে জাফরির কাজ। আমরা বসলাম পাথরের বেদিতে ছড়িয়ে দেওয়া নরম গদিতে। সামনে শ্বেতপাথরের বিশাল গোলটেবিল। তাতে রুপোর বাটায় সেরা লখনউয়ি পান আর অনুপম জরদা। যে জরদার সুবাস আমাদের ইটালির সেরা পাইপের তামাকের সুবাসকে ছাড়িয়ে যায়।
আমাদের মাথার উপরে শত প্রদীপের ঝাড়বাতি। আর একটু বাদে খানসামা রুপোর রেকাবিতে করে দু-টি পাথরের গেলাসে চমৎকার বাদাম শরবত এনে দিল। ইউসুফ সাহেব একটি গেলাস আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, এই গেলাসের পাথর কিন্তু আপনার দেশ থেকে আনানো। আমি বাধ্য হয়ে কবুল করলাম যে, এত দামি পাথরের গেলাস আমি দেশে কখনো চোখে দেখিনি। তখন ইউসুফ সাহেব দরাজ গলায় হাসতে হাসতে বললেন, এ আপনার বিনয়। এ কি কখনো হয়? আমি বললাম, এই যে চার ঘোড়ার জুড়িগাড়িতে করে আমাকে এখানে নিয়ে এলেন, এমন গাড়িতেও আমি আজ অবধি চড়িনি। তখন ইউসুফ আলি আমাকে আরও একবার অবাক করে দিয়ে বললেন, তা হলে এবার তো আপনি বলবেন যে, দেশে আপনি মহিলাদের নাচও কখনো দেখেননি।
এবার আমি বললাম, তা নিশ্চয়ই বলব না। তবে এখানকার মতো ঘরে ঘরে নাচগান আমাদের রোম, মিলান, নেপলস, ফ্লোরেন্স বা ভেনিসে কখনো হয় না। কাজেই…
ইউসুফ সাহেব বললেন, আজ আপনাকে এখানে আনানোর আসল কারণটা বলি তা হলে? সাগ্রহে বলে দিলাম অবশ্যই! ইউসুফ বললেন, নবাব সাহেব লখনউ ত্যাগ করার পর তখনকার নাচ-গানের মহল জোর ধাক্কা খেয়েছে। তবুও কিছু তবায়েফ বা বাইজি এখনও সেই ধারা ধরে রাখার চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিছু খানদানি রইস আদমিও যতটা পারছেন গানবাজনার জন্য করছেন, কিন্তু তাতেও সব ভালো বাইজিকে এ শহরে ধরে রাখা যাচ্ছে না। নুর বাই, মগন বাই, দুলারি বাই, শাগুফতা বাই, দিলরুবা বেগম, বড়ে চঞ্চলা, ছোটে চঞ্চলা, ঝিন্নন নাকি বাঈ—এরা তো সবাই শহর ছেড়ে চলে গেল। এর পর যদি রৌশনও চলে যায়, তা হলে লখনউয়ের রৌশনাই মুছে যাবে। তা কি হতে দেওয়া যায়?
ইউসুফ সাহেব যাদের নাম করলেন তারা আমার কাছে কতকগুলো নাম ছাড়া আর কিছু নয়। এদের কাউকে আমি চোখে দেখিনি, এদের কারও কারও নাম এক-আধবার এখানে-ওখানে শুনেছি। কিন্তু ভদ্রলোকের বলার ধরন বা উৎকণ্ঠা থেকে বুঝতে পারলাম বিলক্ষণ যে এদের লখনউ ত্যাগ খুবই ক্ষতিকর হয়েছে শহরটার পক্ষে। তাই শেষোক্ত মহিলার প্রস্থানও যে উটের পিঠে শেষ আঁটির বোঝার মতো হবে তাতে আমি নিঃসন্দেহ হলাম। এবং আন্তরিকভাবে উদবিগ্ন হয়ে বলে বসলাম, কক্ষনো না। রৌশন বাইকে শহর ছেড়ে চলে যেতে দেওয়া যায় না কিছুতেই। ইউসুফ সাহেব শান্ত স্বরে বললেন, শহর ছেড়ে নয়, জনাব ফেরি। বলুন দুনিয়া ছোড়কে!
মানে?
মানে, রৌশন বাই গুরুতর রকম অসুস্থ। আমার এখানেই এক নাচের আসরে অসুস্থ হয়ে পড়েন। নাচের চক্করদার তেহাই দিতে দিতে চক্কর খেয়ে মাটিতে পড়ে যায়। আর সেই থেকে বেহুশ হয়ে পড়ে আছে, কেউ জানে না আর কতদিন টানতে পারবে এভাবে। আমাদের শহরের সব হেকিম দেখেছে, আংরেজদের ডাগড়ার নাইট সাহেব আর মর্গান সাহেবও দেখেছেন, কিন্তু সেরকম ফয়দা কিছু হয়নি। শেষকালে…
আমি অবাক এবং বিব্রত কণ্ঠে বললাম, এঁরাই যখন কিছু করে উঠতে পারলেন না, তখন আমাকে দিয়ে আর কদূর কী হতে পারে জনাব?
ইউসুফ আলি ওঁর শ্মশ্রুগুমন্ডিত সুন্দর মুখে এক অদ্ভুত রহস্যের হাসি বিস্তার করে বললেন, আপনিই পারবেন। আমি ফের অবাক হয়ে বললাম, আমি! ইউসুফ বললেন, আমাদের পল্লির ঝাড়ফুকওয়ালা মিরন বক্স বাটি চেলেছিল।
তার মানে?
বাটি চালা হল একটা বাটির মধ্যে জিন নামানো। সেই বাটি তখন টলটল করে চলে, সিঁড়ি দিয়ে ওঠে, নামে, রাস্তা দিয়ে গড়ায়, এভাবে যে বাড়িতে প্রয়োজনীয় লোক আছে সেখানে গিয়ে পৌঁছে যায়। শহরে চোর ধরা হয় এই করে; শগুফতা আলি একবার বাটি চেলে তার গুম হওয়া ছেলেকে বার করেছিল কৈসারবাগের সহিস নানু মিঞার পট্টি থেকে।
