আমরা ফের পচা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে টুকটুক করে তেতলায় উঠলাম। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে যে-যার খাটে গিয়ে শুয়ে গায়ে কম্বল টেনে দিলাম। অনিরুদ্ধ বলল, শংকরদা, আপনার কী মনে হয়? এ ঘরে কদ্দিন কেউ থাকেনি? আমি একটা সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললাম, বহু যুগ। তক্তপোশ এবং দেওয়ালের যা দশা। অবাক হব না যদি শুনি এই শতাব্দীতেই কেউ থাকেনি এ ঘরে। অনিরুদ্ধ ওর সিগারেটে আগুন ছোঁওয়াতে যাচ্ছিল, থেমে পড়ে বলল, বলেন কী!
বললাম, এখানকার মানুষের সংস্কার বড়ো প্রবল। কিছু একটা মাথায় গেঁথে বসলে তা থেকে নিষ্কৃতি নেই। তুমি তালাটা খেয়াল করে দেখোনি; অমন তালা এ শতাব্দীর জিনিস বলেই মনে হয় না। অনিরুদ্ধ এবার সিগারেটটা ধরিয়ে ফেলে উদাস স্বরে বলল, ঠিকই বলেছেন। এই তক্তপোশও এই শতাব্দীর নয়, জলের কলসিটাও নেই নেই করে একশো বছরের পুরোনো হবে।
আমাদের কথার ধ্বনি ভেদ করে ঘরের মধ্যে ভেসে এল দূরে কোথাও বাজানো রেডিয়োতে আজকের দিনের হিন্দি ফিলমের গান। কীরকম একটা ছন্দপতনই ঘটে গেল যেন। বাই-ঠুংরির সেরা পীঠ লখনউয়ের চৌক পল্লিতে বোম্বাইয়ের খাজা গান! আমি ‘ধুত্তোর!’ বলে সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে বললাম, আমরা ঘুম লাগাই, অনিরুদ্ধ। এই পরিবেশে, এই সুন্দর নীল অন্ধকারে শুয়ে শুয়ে আজগুবি হিন্দি গান শোনা অসম্ভব। এর চেয়ে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে পুরোনো লখনউয়ের স্বপ্ন দেখাও ঢের শ্রেয়।
অনিরুদ্ধ বলল, যা বলেছেন। আমাদের লেখার পক্ষে এই জবরজং কান্ড হয়তো কাজে আসবে, কিন্তু মেজাজের পক্ষে বিপর্যয়। আমিও ঘুমোলাম, শংকরদা। সাতটার আগে ওঠা নেই।
কতক্ষণ ঘুমিয়েছিলাম খেয়াল নেই, হঠাৎ মাথার কাছে একটা হিমেল হাওয়া। কম্বলের ভেতর থেকে কোনোমতে হাতটা গুটি গুটি বার করে কপালে রাখলাম। সঙ্গে সঙ্গে টের পেলাম কপালে একটা ঈষদুষ্ণ বাতাসের ছোঁওয়া পড়ছে, যা শীতের রাতে একটা শিরশিরে ভাব ছড়াচ্ছে শরীরে। উষ্ণ হলেও হাওয়া তো, তায় শীতের রাতে। আমি উঠে বসে দেখতে পেলাম জানালা বন্ধ পায়ের দিকে, কিন্তু কপালে হাওয়া লাগছে কোত্থেকে এসে।
আর উঠে বসেই দেখলাম ঘরের অন্য তক্তপোশে কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘাড় নীচু করে বসে আছে অনিরুদ্ধ। আমি উঠে বসেছি দেখে প্রশ্ন করল, ঘুম ভেঙে গেল, শঙ্করদা? বললাম, তুমিও তো জেগে আছ দেখছি?
—জাগব না? সেই কখন থেকে একটা বাতাস পড়ছে মাথায়!
—সে কী? তোমারও মাথায় বাতাস! আমিও তো সেইজন্যই জেগে পড়লাম। অনিরুদ্ধ চিন্তিত স্বরে বলল, কিন্তু ভেবে দেখেছেন কী যে পায়ের কাছে জানালা, অথচ মাথার ওপর হাওয়া নামছে? মাথার দিকের দেওয়ালে কি ফাটল ধরল নাকি?
ওর কথার জবাব দেওয়ার ফুরসত পাইনি, তার আগেই দু-জনের খাটের মাঝখানে একটা ভারী নিঃশ্বাসের আওয়াজ পেলাম। অনেকক্ষণ চেপে রাখার পর নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে যেমনটি শোনায় কোনো নিঃশব্দ কক্ষে তেমন একটা নিঃশ্বাস আমাদের মাথার পাশ থেকে ধীরে ধীরে সরে গিয়ে পায়ের কাছে ঝরে পড়তে লাগল। তারপর নিঃশ্বাসটা চলতে শুরু করল আমার তক্তপোশের পায়ের দিকে এবং আসতে আসতে এগিয়ে এল আমার খাটের বাঁ-পাশে। অনিরুদ্ধ আর আমি দু-জনে এতক্ষণ নিঃশ্বাস আটকে বসেছিলাম, ধ্বনিটা আমার বাঁ-দিকে এসেছে দেখে ধরা গলায় অনিরুদ্ধকে বলতে শুনলাম, কী ব্যাপার বলুন তো, শংকরদা!
গলা শুকিয়ে এসেছে আমারও, তবুও দম নিয়ে বললাম, কেউ একটা ঘরে হেঁটে বেড়াচ্ছে বলে মনে হয় না? অনিরুদ্ধ বলল, ঠিক তাই! কিন্তু লোকটা ঢুকল কী করে ঘরে? নাকি আগে ঘরে ঢুকে বসেছিল? আমরা তো অন্ধকারে দেখিইনি খাটের তলায় কেউ কোথাও সেঁধিয়ে আছে কি না!
ফের নিঃশ্বাসটা এগিয়ে আসছে আমাদের খাটের মাঝখানে, মাথার দিকে। তারপর আওয়াজ হল কলসির মাথার গেলাস ওঠানোর, জল ঢালার, শেষে কলকল কলকল করে জল খাওয়ার। এ সময়ই আমরা আওয়াজ পেলাম চুড়ির। কলসির মাথায় গেলাস বসিয়ে ফের নিঃশ্বাসটা একটু একটু করে সরে যেতে লাগল পায়ের দিকে। যখন অনিরুদ্ধ চাপা স্বরে প্রশ্ন করে উঠল, কে! কে আপনি; সঙ্গে সঙ্গে আমিও বলে উঠলাম, কে? কে?
তৃতীয়বার ‘কে?’ বলা আর হল না। ততক্ষণে মৃদুমন্দ ঘুঙুরের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। ছম ছম ছম ছম ছম … আমরা দুজনেই মাথার বালিশ বুকের কাছে টেনে নিয়ে টান টান হয়ে দেয়ালে পিঠ ঠেসে বসলাম। যেকোনো মুহূর্তে একটা অভাবনীয় কিছু হওয়ার আশঙ্কায় দু-জনেই স্তব্ধ হয়ে আছি। আমি অনুভব করলাম যে, ওই কঠিন শীতের রাতেও আমার কপাল জুড়ে ঘাম ঝরছে। কানের কাছগুলো অসম্ভব গরম হয়ে উঠেছে। আর পায়েলের আওয়াজ মিলিয়ে যেতে মগজ জুড়ে ধ্বনিত হচ্ছে আমার হৃৎস্পন্দের আওয়াজ।
এরপরই একটা গোঙানির মতো আওয়াজ এল, ক্ষণিকের মধ্যে খেয়াল হল ওটা অনিরুদ্ধর কণ্ঠস্বর। ও কিছু বলতে যাচ্ছিল আমাকে, সেই কথাটাই গলায় আটকে গিয়ে গোঙানির চেহারা নিয়েছে। আমি উদবিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করতে গেলাম, কী হয়েছে, অনিরুদ্ধ? কিন্তু আমার গলাতেও স্বর আটকে গেল। মনে হল আমিও গোঙাতে শুরু করেছি। শরীরটা কীরকম অবশ হয়ে আসছে, পিঠের বালিশ হেলে পড়ল, আমি বালিশটা টানতে গিয়ে শুনলাম অনিরুদ্ধ ধপাস করে শুয়ে পড়েছে ওর বিছানায়। আমিও কীরকম হড়কে হড়কে পড়ে যাচ্ছি খাটে। আর ঠিক তখনই আপনা থেকে জ্বলে উঠল ঘরের আলোটা অহেতুকভাবে। আমরা দুজনে দু-জনের দিকে চেয়ে বসে রইলাম।
