আমি আর অনিরুদ্ধ দু-জনেই একটা রহস্যের গন্ধ পেলাম কথাটায়। অনিরুদ্ধ আর উত্তেজনা চাপতে না পেরে বলেই ফেলল, কেন, কোনো খারাপ, অশুভ ব্যাপার আছে নাকি ওর গল্পে? জারিনা বললেন, গল্প তো নয়, সবই সত্যি। তবে ঘটনাটা তো খুব ভালো নয়।
এবার আমার আর উত্তেজনা চেপে রাখার উপায় রইল না। বললাম, কেন, কোনো খুন টুনের ব্যাপার ছিল?
-না, খুন নয়। আত্মহত্যা।
—আত্মহত্যা? তা সেকথা বলতে অসুবিধে কী?
আসলে সেই থেকে রৌশনের আত্মা চৌক পল্লি ছেড়ে যায়নি। এখনও লোকে বলে যে, ওর কথা সূর্য ডোবার পরে তুললে রাতে ও ফিরে আসে চৌকে।
এবার অনিরুদ্ধ আর আমি দু-জনেই চমকে উঠে বললাম, সে কী! এই সওয়া-শো বছর পরেও সে ফিরে আসে? জারিনা একটা স্লান হাসি হেসে বললেন, আসে। সেজন্যই তো চৌকের একটা বাড়ির ঘর আজও ভাড়া হয় না। বছরের পর বছর খালি কোঠা হয়ে পড়ে আছে। কেউ এক রাতও সেখানে থাকেনি বহুকাল।
জিজ্ঞেস করলাম, চৌকের কোন বাড়ি সেটা? জারিনা বললেন, চৌকের যে গলি দিয়ে ঢুকে আমাদের এই ‘মুনির মঞ্জিল’-এর দিকে আসেন সেই বাঁকের থেকে একটু পশ্চিমে। নীচে একটা গয়না, তামাক আর গন্ধের দোকান আছে। ওই ঝরঝরে বাড়িটার তিনতলার ঘর সেটা। গোটা তিনতলায় ওই একটাই ঘর।
আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার চলাচল শুরু হয়ে গেছে। আমি আর অনিরুদ্ধ চোখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। জারিনা যে ঘরটার কথা বলছেন সেই ঘরের বাসিন্দা আমরা গত তিনদিন। আমি ফের জিজ্ঞেস করলাম, কিন্তু ওই ঘরেই কি থাকতেন রৌশন? জারিনা মাথা নেড়ে বোঝালেন ‘না। মুখে বললেন, ওখানে থাকতেন এক বিলাইতি সাহাব। ডাক্তার ছিলেন। রৌশনের চিকিৎসা করেছিলেন। কিন্তু বাঁচাতে পারেননি। পরে রোজ রাতে রৌশনকে দেখতেন, ওঁর ঘরে নাচের পোশাক আর ঘুঙুর পরে আসত রৌশন। শেষে …
অনিরুদ্ধ অধীর আগ্রহে জিজ্ঞেস করল, শেষে? জারিনা হাতজোড় করে বললেন, না থাক, বাবুসাহেব। সন্ধ্যের পর ওসব কথা বলতে চাই না। আমার ক্ষতি হবে। ছেলেপুলে নিয়ে বাস করি। রাতে অশুভ ব্যাপার চাই না এখানে।
আমরা আর জোরাজুরি করলাম না। চা আর পান খেয়ে নমস্কার জানিয়ে বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় নেমে অনিরুদ্ধকে বললাম, এখন তা হলে ঘরে ফিরে ডায়েরি চর্চা হোক? আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই সোৎসাহে ও বলল, সে আর বলতে! এইমাত্র যা শুনলাম তারপর ওই ডায়েরি ছাড়া আর কোনো কিছুতেই আমার আর কোনো ইন্টারেস্ট নেই।
ছেলেটার এই ব্যাপারটাই আমার খুব ভালো লাগে, আমার সঙ্গে মেলে। বিজ্ঞানের ছাত্র হয়েও অলৌকিকের প্রতি এক দুর্বার টান।
ঘরে ঢুকে সুইচ টিপতে কিন্তু আলো জ্বলল না। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অনিরুদ্ধ বলল, ব্যাপারটা কী হল বলুন তো, শংকরদা? বললাম, আমিও তো সেটাই ভাবছি। ডুমটা কাটল তো? অনিরুদ্ধ পূর্ণিমার জ্যোৎস্নার আলোয় বালবটা খোলার চেষ্টা শুরু করল।
আমি স্পষ্ট গন্ধ পেলাম একটা খুব দামি আতরের। যেন আশপাশেই কোনো মহিলা মজুদ আছেন। গন্ধটা একটু একটু করে চড়া হচ্ছে। বাইরে চৌকের রাস্তা থেকে হাঁক শোনা গেল বেলফুলওয়ালার। বেলফুল! বেলফুল! অথচ আমাদের এখন ভীষণ দরকার একটু আলো।
৪.
ডুমটা খুলে অনিরুদ্ধ দেশলাই জ্বালল। দেখা গেল বালবে কোনো গোলমাল নেই। তখন দু জনে মিলে ফের নামলাম একতলায় জব্বর খাঁর সেরেস্তায়। এবাড়ির নায়েব বলা যায় জব্বর খাঁকে। তিনিই কিছুটা মুখ ভেটকে বলেছিলেন, চৌক মহল্লায় কোনো কোঠা খালি পাওয়া যায়। না। আপনারা অন্য কোথাও হোটেলে থাকছেন না কেন? আমরা বলেছিলাম, সে তো আমরা চাইলেই থাকতে পারি। কিন্তু একটা কাজের জন্য চৌকের কোথাও একটা থাকা খুব দরকার। তখন ঝাঁঝিয়ে উঠে জব্বর বললেন, কিন্তু আমি কী করতে পারি, বাবুসাহাব?।
আমি ওঁকে শান্ত করার জন্য নরম করে বলেছিলাম, আমরা শুনেছি আপনার তিনতলার ঘরটা খালি থাকে সারাবছর।
-তা থাকে ঠিকই। কিন্তু ও ঘর কিরায় যায় না। এবার অনিরুদ্ধ বেশ শান্ত স্বরে বলেছিল, কিন্তু কেন?
—কারণ কিছু নেই। কিন্তু দিই না।
ঠিক তখনই আমি কড়কড়ে পাঁচটা এক-শো টাকার নোট ওঁর সামনে রেখেছিলাম। ভদ্রলোক একদিকে ইতস্তত করছেন, অন্যদিকে জুলজুল করে নোটগুলো দেখছেন। শেষে ঝটকা মেরে বললেন, ঠিক আছে থাকুন, কিন্তু দু-জনে থাকুন। একজনকে দেব না।
আমরা স্বস্তি বোধ করে বলেছিলাম, তা হলে চাবিটা দিন। এরপর জব্বরের সঙ্গে আসতে যেতে বার কয়েক দেখা হয়েছে। ভদ্রলোক যেন একটু অবাক হয়েই দেখেন আমাদের আর দস্তুরমতো বলে যান—সালাম আলেকুম। আমরাও দস্তুরমতো তাঁর সম্ভাষণ ফিরিয়ে দিই আলেকুম সালাম বলে। ভদ্রলোক আমাদের দেখে কী ভাবেন জানি না, কিন্তু আমরা ভাবি ওঁর এত অবাক হওয়ারই বা কী আছে! একটা তালাচাবি আঁটা ধূলিমলিন, করুণ চেহারার ঘর আশাতীতরকম বেশি টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়েছি, এই তো? তাতে এত অবাক হওয়ার কী আছে? কেবল টাকা পোড়াবার জন্য এটা করছি, তেমন বোকা গর্দভ তো আমরা নই।
কিন্তু এখন যখন সেরেস্তায় নেমে দেখছি কপাটে তালা ঝুলছে, এমনকী, জব্বরের নৌকর ছও ধারেপাশে কোথাও নেই তখন নিজেদের বোকা গর্দভ ভাবতে শুরু করেছি। ভাগ্যিস শীতকাল! না হলে ওই হাওয়াবন্ধ ঘরে তো সারারাত নেয়েধুয়ে যেতাম আমরা। লাইনের গন্ডগোল যখন, তখন সকাল হওয়া অব্দি অপেক্ষা করা ছাড়া তো উপায় নেই। ইচ্ছে ছিল। কম্বলের নীচে ঢুকে দু-জনে মিলে জমিয়ে ডায়েরি পড়ব; তা না, এখন মুড়িসুড়ি দিয়ে ঘুম লাগাতে হবে।
