অনিরুদ্ধ এবার পড়া থামিয়ে প্রশ্নসূচকভাবে আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, ঠিক বলেছি কি না? ডায়েরির মধ্যেই লেখক লুকিয়ে আছেন। অনিরুদ্ধ বলল, কিন্তু ওঁর লেখা পড়ে তো মনে হচ্ছে আমরাও এক্ষুনি বেরিয়ে পড়ি রাস্তায়। জিজ্ঞেস করলাম, তাতে লাভ? সে লখনউ কি আর আছে? অনিরুদ্ধ বলল, কিন্তু সেই খুঁজে বেড়ানোটাই লাভ হবে। তাই? স্বীকার করতেই হল ছেলেটার মগজ আছে। হারিয়ে যাওয়া শহরটাকে খুঁজতে খুঁজতেই তো চমৎকার একটা ভ্রমণ হয়ে যাবে। অনিরুদ্ধ যোগ করল, সেই সঙ্গে রসদও জোগাড় হয়ে যাবে আমাদের লেখাটার।
অনিরুদ্ধ ডায়েরি বন্ধ করে ফেলেছে। আমরা আর সময় ব্যয় না করে বেরিয়ে পড়লাম পুরোনো লখনউয়ের খোঁজে। থুড়ি, ডা. নিকোলা ফেরির লখনউয়ের খোঁজে।
বাইরে যেন বিকেলের রোদ নরম হয়ে এসেছে।
৩.
বিকেলের রোদে আমরা বসে বসে গোমতী নয়, ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম ইংরেজদের বাস এবং কর্মকেন্দ্ৰ রেসিডেন্সি। অনেকটাই প্রায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, প্রভূত যত্ন করে সেসব নতুন করে গড়ে তোলা হয়েছে। বাড়ির চেহারা-চরিত্র পাক্কা ইংরেজ, এই রেসিডেন্সি আক্রমণের ঘটনা নিয়ে লেখা কবি টেনিসনের কবিতা বড়ো ব্লো-আপ করে টাঙানো আছে দেয়ালে। যেসব গোলা এসে আছড়ে পড়েছিল বাড়িটায় তার কিছু কিছু সংগ্রহ করে সাজিয়ে রাখা আছে এখানে-ওখানে। অনিরুদ্ধ তেমন একটা গোলা হাতে তুলে বলল, বাপরে! এই পদার্থ বুলেটের মতো এসে পড়লে কী কেলেঙ্কারিটাই যে হয়
আমি বললাম, এরকম একটা গোলাতেই এই ঘরে মারা পড়েছিল এক যুবতী।
ব্যাপারটা আমার আবিষ্কার নয়, দেওয়ালেই সেই তথ্য মুদ্রিত হরফে ঝোলানো আছে। সেনানায়ক লরেন্স কীভাবে এই রেসিডেন্সির প্রতিরক্ষা করেছিলেন তারও বর্ণনা আছে।
এরপর বাড়ির তলার সুড়ঙ্গ পথ ধরে আমরা নামছিলাম। সেই সিঁড়ি ধরে অন্ধকারে নামতে নামতে হঠাৎ কেন জানি না মনে পড়ে গেল ফেরির ডায়েরিটা। চোখের সামনের সব বাস্তব, সব ইতিহাসের চেয়ে ঢের বেশি ঔৎসুক্য তৈরি হয়ে গেছে ফেরি বর্ণিত পুরোনো লখনউয়ে। অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে এগোতে এগোতে অনিরুদ্ধকে বললাম, বাসায় ফিরে একবার দেখলে হয় ফেরি কী লিখে গেছেন রেসিডেন্সি নিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে আমাকে অবাক করে ছোকরা বলল, ঠিক একথাটাই ভাবছিলাম একটু আগে। ভীষণ ইচ্ছে করছে ঘরে বসে আরও পড়ি সাহেবের খাতাটা। তাতে শহরটা সম্পর্কে খানিকটা গবেষণাও হয়ে যাবে।
রেসিডেন্সির ফটক পেরোচ্ছি যখন আমরা, তখন আমিই তুললাম কথাটা : ফেরি শহর বেড়িয়ে বাড়ি ফিরতেন করিমের দোকানে মাংস-পরোটা খেয়ে। আমরাও তাই করি কী বলো?
অনিরুদ্ধ বলল, তারপর চলুন পান খাই। একটু গন্ধ মাখি। তারপর গিয়ে দাঁড়াই কোনো বাইজির বাড়ির তলায়। আর গান শুনি।
শেষের কথাগুলো বলার সময় অনিরুদ্ধর গলা একটু ধরে এল। কারণটা সুবোধ্য। সবই ঠিক আছে, কিন্তু বাইজির গান শোনা সম্ভব নয়, কারণ গোটা লখনউয়ে একটিও বাইজি নেই আর। ১৯৫৮-য় আইন করে নিষিদ্ধ হয়ে গেছে বাইজিদের গান-বাজনা, নাচ, মুজরা। মুজরা বা জলসা বসালে আইনের দন্ডভোগ করতে হবে। তাই শহরের এক পুরোনো বাই-ঘরের শেষ প্রতিনিধি জারিনা বাইয়ের সঙ্গে লেখার ব্যাপারে কথাবার্তা হলেও তাঁর গান শোনার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি।
আমি বললাম, গান না শুনতে পাই, জারিনা বাইয়ের কাছে পূর্বের দিনের কিছু কাহিনি অন্তত শুনতে যেতে পারি। তাই না? অনিরুদ্ধ হাসল। বলল, সেটা মন্দ বলেননি, শংকরদা।
আমাদের সিঁড়ি ধরে উঠতে দেখেই লখনউয়ের উষ্ণ আতিথ্যের কণ্ঠে বলে উঠলেন জারিনা বাই, আইয়ে পরিয়ে। আসুন, বসুন। কী মনে করে হঠাৎ? আমরা ঘর অবধি উঠে এসে বললাম, এই এলাম আপনার সঙ্গে একটু গল্প করতে। ভদ্রমহিলা বালিকার মতো মুখে হাত চাপা দিয়ে বললেন, হায় আল্লাহ! গল্প শুনতে আমার কাছে? আমি আবার কী গল্প বলব? আমার গল্প তো সাবেক দিনের বড়ড়া বড়ো গায়িকা, নর্তকীদের নিয়ে। সে অতশত শুনে আর আপনাদের কী লাভ? অনিরুদ্ধ বলল, সেই গল্প শুনব বলেই তো আসা। জারিনা বাই খুশি হয়ে বললেন, তা হলে বসুন। আমি একটু চা আর পানের ব্যবস্থা করতে বলে আসি।
জারিনা ফিরে এলেন, একটু পরে চা আর পান এল। তিনি ভালো করে গালিচায় গুছিয়ে বসে বললেন, বলুন, কোন গায়িকার কথা জানতে চান আপনারা?
আমি তেমন কিছু ভাবনাচিন্তা না করেই বলে বসলাম, রৌশন বাইয়ের কথা। অমনি বড়ো বড়ো চোখ করে মহিলা বললেন, হায় আল্লাহ! রৌশন বাই তো তিনজন ছিলেন লখনউয়ে। একজন আমার মায়ের মাসি। তিনি একজন সাধুবাবার ভক্ত হয়ে বেনারসে ভজনগায়িকা হয়ে যান। তাঁরও অনেক আগে ছিলেন এক রৌশন আরা বাই যিনি নবাব বংশের ফতেহ আলি খাঁর মেহফিলে গান গেয়ে এত নাম করেছিলেন যে, নবাব তাঁকে গাইতে বারণ করে দেন। শুধু তাঁরই জন্য গাইতেন রৌশন আরা। ফলে পৃথিবীর কাছে তাঁর পরিচয় মুছে যায়। আর ছিলেন এক রৌশন বাই নবাব ওয়াজেদ আলি শাহের সময়…
এইবার জারিনা বাই একটু চুপ করলেন। যেন গর্হিত কোনো বিষয় নিয়ে বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু অনিরুদ্ধ ছাড়বার পাত্র নয়। খেই ধরাবার জন্য বলল, হ্যাঁ, আর ওই তৃতীয় রৌশন বাই। জারিনা কিন্তু তারপরও চুপ করে রইলেন, বিষয়টা নিয়ে কিছু বলায় বেশ অনীহা দেখা গেল তাতে! একটু পর জারিনা বললেন, থাক না আজ ওই রৌশনের কথা। আমি বললাম, কেন, কোনো অসুবিধে আছে? জারিনা মুখে একটা কিন্তু কিন্তু ভাব করে বললেন, অসুবিধে ঠিক না। তবে সন্ধ্যের দিকে …
