সাহেব সেখানে লিখছেন—একটা গোটা পাতায় শুধু একটি বাক্য!—’আমি কাল রাতেও রৌশন বাইয়ের পায়ের ঘুঙুরের ধ্বনি শুনেছি আমার মাথার পাশে যদিও ঘরের দরজা এবং দুটো জানালাই পাট পাট করে আটকানো ছিল।
সাহেব নয়, এবার আমারই ঘুম ছুটে যাওয়ার পালা। অনিরুদ্ধকে বললাম, তোমার ওই বিজ্ঞানের বইটাকে সুটকেসে ভরে ফেলো। এখন থেকে শুধু এটাই পড়তে হবে। ও একটু অবাক হয়ে বলল, তার মানে? আমি ভোলা পাতাটা ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললাম, কিছু বুঝছ?
ও ওই বাক্যটার দিকে একমনে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শেষে ওর দাড়ি-গোঁফে আচ্ছন্ন মুখে একটা নিষ্পাপ আনন্দের হাসি ফুটে উঠল। আমার মনে হল আমি মাথার ভেতরে এরই মধ্যেই নূপুরনিক্কণ শুনতে পাচ্ছি।
২.
নিকোলা ফেরির লখনউ বাসের সময়টা বাস্তবিকই চাঞ্চল্যকর। ডায়েরির একটা বিশেষ দিনের কথা শুরু হচ্ছে এভাবে :
কাল থেকে মনটা ভার হয়ে আছে। ছেলেবেলায় সেটোনিয়স, লিভি, পোল্লিয়ো, প্লুটার্ক প্রমুখ ঐতিহাসিকের রচনায় রোমক শাসকদের খুন বা মৃত্যুর কথা পড়ে রোমাঞ্চিত হতাম। কিন্তু কখনো ভাবিনি স্বচক্ষে একজন নৃপতির বিতাড়ন দেখতে পাব। এটা একেবারেই কোনো বাঞ্ছনীয় দৃশ্য নয়। কাল লখনউয়ের সিংহাসনচ্যুত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহকে তাঁর প্রিয় শহর থেকে বিতাড়িত হতে দেখলাম। নবাব মিছিল করে শহরের কয়েকটি পল্লি ভ্রমণ করে জলপথে রওনা হলেন কলকাতার দিকে। শহরের মানুষ এই দৃশ্য দেখে বিহবল বোধ করছিল। একজন নবাবের মুখ যে কত করুণ হতে পারে তা কাল ওয়াজেদ আলি শাহের মুখ না দেখে থাকলে কেউ কল্পনাও করতে পারবে না। আমি নিজেও কি তা পারতাম? সাহিত্যে পড়েছি জ্বলন্ত ট্রয় নগরী থেকে ঈনিয়স পিঠে তাঁর পিতাকে বহন করে মাতৃভূমি ত্যাগ করেছেন। সেই দৃশ্য কল্পনা করে খুবই উদবেল হয়েছি, কিন্তু বাস্তবে সে-দৃশ্য যে কত মর্মান্তিক হয় তা কাল বুঝলাম। সেই থেকে মনে মনে খুব দুঃখী হয়ে আছি।
ডায়েরির এই এন্ট্রিটা পড়ার পর আমি আর অনিরুদ্ধ মুখ চাওয়াচাওয়ি করে বসে রইলাম। অনিরুদ্ধ বলল, শংকরদা, এ তো উপন্যাসের চেয়েও রোমাঞ্চকর হয়ে দাঁড়াবে মনে হচ্ছে।
আমি বললাম, ইতিহাস সেভাবে লেখা হলে তা-ই তো হয়। অনিরুদ্ধ ওর লম্বা চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলল, কিন্তু এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ ডায়েরি ভদ্রলোক এভাবে ফেলে রেখে গেলেন কেন—সেটাও ভাবার। আর এতকাল ধরে বস্তুটি কেনই বা থেকে গেল এহেন এক বারোয়ারি ঠেক-এ তাও চিন্তার বিষয়। আমার কেন জানি না মনে হল এবং সেটাই বলে ফেললাম তড়িঘড়ি, সেসব প্রশ্নের জবাবও নিশ্চয়ই লুকিয়ে আছে ডায়েরির কোথাও না কোথাও।
আর যায় কোথায়! অনিরুদ্ধ তৎক্ষণাৎ খাতাটা তুলে সরবে পড়তে লাগল একেবারে গোড়া থেকে। আমারও কথা বন্ধ হয়ে গেল, আমরা লখনউয়ের এক পুরোনো, মলিন বাড়ির এক নির্জন ঘরে বসে সাহেবের রচনার দাক্ষিণ্যে নিক্ষিপ্ত হলাম এক ভিন্ন সময়ে, শহরটার এক বিস্মৃত-রূপ-রস-পরিবেশে। আমরা দুজনেই ভুলে গেছি আমরা লখনউয়ে এসেছি শহরটাকে নিয়ে এক বিস্তৃত ভ্রমণরচনা লেখার বরাত নিয়ে। ভ্রমণ একটা হচ্ছে বটে, এবং তা ওই লখনউয়েই; কিন্তু সে-লখনউ ছড়িয়ে আছে তার অজস্র প্রাচীন ইমারতে, কিছু প্রবীণ মানুষের চেহারা-চরিত্র-মেজাজে এবং একটি অজ্ঞাত পরিচয় বিদেশির স্মৃতি-আলেখ্যে, অনিরুদ্ধর হাতে ধরা নিকোলা ফেরির ডায়েরিতে। শুনলাম অনিরুদ্ধ পড়ছে :
ইংরেজরা এ-শহরে দাপিয়ে আছে ঠিকই, কিন্তু এর রোমাঞ্চ ও আবেদনের স্বাদ বিশেষ পায় না। লখনউয়ের একটা স্ফুর্তি ও প্রাণের বিস্তার আছে যা একজন ইটালীয় হিসেবে আমি ক্ষণে-ক্ষণে অনুভব করি। ইটালীয় বা ফরাসিরাই লখনউয়ের প্রকৃত কদর করার উপযুক্ত মানুষ, যদিও ইংরেজদের মতো এত নিয়মানুবর্তীভাবে তারা এখানকার ব্যাপার-স্যাপারের তদারকি করতে পারত কি না সন্দেহ।
শহরটা যে খুব প্রাচীন তা নয়। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য স্থাপত্য গত তিরিশ-চল্লিশ বছরের মধ্যেই হয়েছে। কিন্তু এরই মধ্যে এর একটা প্রাচীন-প্রাচীন চেহারা ও মেজাজ তৈরি হয়েছে। বিকেলে রোদ যখন নরম হয়ে আসে আমি শহর পাক দিতে বেরোই। আর মনটা যেন এক অপরূপ বিষণ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে যায়। আমি নরম রোদে গোমতী নদীর পাশে গিয়ে বসি। নবাবদের আহ্লাদের বাগান দেখি। ফেরার পথে চৌকের মোড়ে করিমের দোকানে মাংস-পরোটা খাই। তারপর এক খিলি পান। শেষে তুলোয় করে কিছুটা আতর কানে খুঁজে এখানকার বিস্ময়কর সব বাইজিরই কোঠার নীচে দাঁড়িয়ে গান শুনি। হারমোনিতে অভ্যস্ত আমার পাশ্চাত্য কানে প্রথম প্রথম এদের মেলোডিনির্ভর গানের ধারা একটু দুর্বোধ্য এবং কিছুটা ক্লান্তিকর ঠেকত। কিন্তু গত ছ-মাস ধরে শুনে শুনে এখন বেশ আরামদায়ক এবং আকর্ষণীয় ঠেকে। অনেকেই কৌতূহলের সঙ্গে আমার দিকে তাকায়, কিন্তু রাজকাজে নিরত ইংরেজ মনে করে ঘাঁটাতে সাহস পায় না।
এতে আমার সুবিধেই হয়। আমাকে অযথা বাক্যব্যয় করতে হয় না এবং আমি বেড়ানোর ফাঁকে ফাঁকে যখন এখানকার হেকিমি ওষুধ নিয়ে উপযুক্ত লোকদের প্রশ্ন করি তারাও অযথা প্রশ্ন না করে যা জানানোর জানিয়ে দেয়। এভাবে আমি হেকিমি চিকিৎসার অনেক কিছুই জেনে গেছি। রোমে ফিরে এই চিকিৎসার কিছু পদ্ধতি প্রয়োগ করলে অঢেল লাভ হওয়ার আশা আছে। আজও ইটালিতে ভারতবর্ষ সম্পর্কে সবিশেষ বিস্ময় ও কৌতূহলবোধ আছে। ফলে এই চিকিৎসা ও ঔষধের উপকার আমি পাবই। কিন্তু সেসব অনেক পরের কথা।
