ঘুরে দেখি একটা আকাশি নীল ড্রেসিং গ্রাউন পরে পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে বাবলি। একটু আগের সেই রাগী চেহারাটা কোথায় মিলিয়ে গেছে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি এখন খেলা করছে ওর ওই সুন্দর মুখে। ও যেন আরও সুন্দরী হয়েছে।
আমি এক মনে ওকে দেখতে দেখতে ঘরের সোফাটায় গিয়ে বসলাম। বাপীও এসে বসল। ‘আই উইল গো ড্রেস আপ মাইসেলফ’ বলে অত্যন্ত সুদর্শন সাহেব ঘরের বাইরে চলে গেল। ওর দিকে আলতো দৃষ্টি ফেলে বাবলি বলল, অ্যামেরিকান ছেলে। জিমের বন্ধু, ডাক্তার। কালই পরিচয় হল।
আমরা কেউ কিছু বললাম না উত্তরে। এই অ্যাণ্ডি সম্পর্কে আমাদের দুজনের কারোরই কোনো কৌতূহল নেই। কিছুক্ষণের নীরবতার পর না-রাগ, না-আনন্দ, না-দুঃখ এমন একটা মনোভাবে বাবলি বলল, লাস্ট নাইট উই স্লেপ্ট টুগেদার। আমি ওর সঙ্গে শুয়েছি।
আমাদের পক্ষে কোনো শব্দ করারও জো নেই। আমরা শুধু বাবলিকে দেখছি। আস্তে আস্তে কীরকম পাথরের মতন হয়ে যাচ্ছে বাবলি। ড্রেসিং টেবিলের আয়নাটার দিকে স্থির তাকিয়ে বলছে, জিম ভালো ব্যাবসা করেছে। আমার নীলুকে কেড়ে নিয়ে অ্যাণ্ডি তুলে দিয়েছে। স্ট্রং, হ্যাণ্ডসাম, অ্যামেরিকান ইয়ুথ। আই শুড বি হ্যাপি। আমার কী সৌভাগ্য নীতিনদা।
আর থাকতে পারছি না ঘরে। গলার কাছে মোচড়াচ্ছে কীরকম। বাবলি দু-হাতে চোখ ঢেকেছে। আঙুলের ফাঁক দিয়ে জল গড়াচ্ছে। নীল কার্পেটের ওপর দৃষ্টি এঁটে মনোরোগীদের কায়দায় আপনমনে বিড়বিড় করে কীসব বলে যাচ্ছে বাপী। আমি একটা বড়ো স্টেপে ঘরের বাইরে গিয়ে টয়লেটটা খালি পেয়ে ওখানেই ঢুকে গেলাম। পিছনে দরজা টেনে দিয়ে দোনামনায় পড়লাম। এই ছোট্ট এক চিলতে টয়লেটে দাঁড়িয়ে আমার কী উপকার হবে? তার চেয়ে…
আমি পাশ ঘুরতেই বেসিনের আয়নাটাকে সামনে পেলাম। আর আয়নার মধ্যে নিজেকে। আর, আমার চোখে জল। গন্ডদেশ দিয়ে গড়াচ্ছে। কেন? কার জন্যে? কতটুকু?
আমি দেখছি আমি কাঁদছি। বাপী কাঁদতেও পারে না। তাই বোবা মেরে বসে আছে। বাবলির সামনে। বাবলিও কাঁদছে, কিন্তু ও চায় না আমরা দেখি। আমি চোখ মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসছি টয়লেট থেকে, ফের আয়নার একটা অংশে চোখ গেল। লাল লাল দাগ কীসব। আমি কাছে গিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। লাল লিপস্টিকে আঁচড় কাটা। নিশ্চয়ই বাবলির। কিন্তু কার জন্য? আমি আরও ঘনিষ্ঠ হলাম আয়নার। আর স্পষ্ট দেখছি ফেয়ারওয়েল নীলু! আই স্টিল লাভ ইউ।
ভেতরে কীরকম প্রতিরোধ হচ্ছে একটা। নীলু, নীলু, নীলু। পাষন্ড, বাস্টার্ড, সোয়াইন। ও কোনোদিন বুঝবে না ভালোবাসা কী। ও কোনোদিন বুঝবে না বাবলিই বা কী। শুধু ভালোবাসার জন্যই ভালোবেসে-বেসে মরে যাবে মেয়েটা।
আমি পকেটের রুমাল বার করে আয়নার লেখাগুলো ঘষে ঘষে মুছতে লাগলাম। নীলুর প্রাপ্য নয় এই ভালোবাসা।
ভুলভুলাইয়া
ভাঙা তক্তপোশটা ঠুকে জোড়া দিতে গিয়ে ডায়েরির জিরজিরে খাতাটা চোখে পড়ল। কীভাবে কে জানে সেটা তক্তপোশের একটা পায়ার ভেতরের দিকে ঠুসে দেওয়া ছিল। ঠোকাঠুকিতে নড়ে গিয়ে ঝুপ করে মাটিতে পড়ল। অনিরুদ্ধ সেটা হাতে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করে দেখল; তাতে ওর কৌতূহল বিশেষ মিটল বলে মনে হল না। শেষে ডায়েরিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, দেখুন তো শংকরদা, এটা কী ভাষা!
ডায়েরিটাকে কেন ডায়েরি ভাবলাম সেটা আগে বলি। ভেতরে কী ছাই লেখা আছে সেটা তো পরের কথা, খাতাটা আসলে অনেক দিনের এক ডায়েরিই। পাতায় পাতায় নকশা করে তারিখ ছাপা। তারপর এধার থেকে ওধার রুল টানা। কিন্তু হাতের লেখা খুদে হরফের বলে একজোড়া লাইনের মধ্যেই দু-লাইন করে লেখা। সেটা পাতা বাঁচানোর জন্য ততটা নয় যতটা হস্তলিপির ধারা বজায় রাখার জন্য। কারণ অনেক পাতাতেই লম্বা লম্বা জায়গা বাদ রাখা হয়েছে। ভাষা নিয়ে অনিরুদ্ধর ধন্দ কেন হয়েছে তাও বুঝলাম ডায়েরিটা হাতে নিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ চোখ না বুলোলে ধরাই সমস্যা যে লিখিত ভাষাটা আসলে ইংরেজিই।
আসলে হাতের লেখার চলনটা বেশ অদ্ভুত। মাঝে মধ্যে ইংরেজির বানানগুলোও ততোধিক অদ্ভুত। যেমন ইংরেজি normal বানানটা লেখা হয়েছে normale, order বানানটা ordre, এবং আরও বিদঘুটে sky বানান skail এরকম যে কত তা পাতা চারেক ওলটাতে দিব্যি টের পেলাম। ক্রমে লেখাটা পড়তে পড়তে পরিষ্কার বুঝলাম যে, লেখক অ-ইংরেজ। যদিও ইংরেজি ভাষাটার ওপর পরিচ্ছন্ন দখল আছে। বস্তুত সেজন্যই তাঁর ইংরেজিটা বেশ সরল এবং বাগধারাবর্জিত, বলার ধরনটা নিটোল বর্ণনামূলক। এবং মানতেই হচ্ছে, একজন অ-ইংরেজের ইংরেজি হিসেবে রীতিমতো সুখপাঠ্য।
কিন্তু লেখকটি কে? নামটা কী? লেখাটা পড়ে ফেলার অদম্য কৌতূহল দমন করেই নামের তল্লাশি শুরু করলাম। তখনই অনিরুদ্ধ বলল, কাগজের মলাটটা ছিঁড়ে ফেলুন, নাম থাকলে ওখানেই থাকবে।
মন্দ বলেনি ছোকরা। আমি এবার মলাটটা ছিঁড়ে ফেললাম। আর অমনি জ্বলজ্বল করতে লাগল ধূসর রঙের মলাটের ওপর লাল কালিতে লেখা নাম-ডা. নিকোলা ফেরি। আমি বললাম, অনিরুদ্ধ, এ যে ইটালিয়ান সাহেব গো! ও রীতিমতো চমকে গিয়ে বলল, সে কী! লখনউয়ের চৌক পল্লিতে ইটালিয়ান সাহেব! তাও এরকম একটা এঁদো, ঘিঞ্জি মকানে! আমি মলাট ছেড়ে ফের ভেতরের পাতায় ঢুকলাম আর শুনলাম অনিরুদ্ধ দার্শনিকের মতো আপন মনে বলছে, তা না-হওয়ারই বা কী আছে! হাজার হোক কলম্বাস আর মার্কো পোলোর জাত তো! আর ততক্ষণে আমার চোখ আটকে গেছে একটা অদ্ভুত বাক্যে, যেন চিটে গুড়ে পিঁপড়ে।
