রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বাপী বলল, তুই কিন্তু আমার হয়ে কিছু বলিস না ওকে। জানি , কী ভাবতে কী ভেবে বসে। আমি ওকে আশ্বস্ত করার জন্য বললাম, আমি আদৌ সেই গাড়োল নই, বাপী মহাশয়!
বাপী অপ্রস্তুত হয়ে একটা সিগারেট এগিয়ে দিয়ে বলল, ধর।
সাদারল্যাণ্ড অ্যাভেনিউয়ের ওপর ফ্ল্যাটটা নীলুর দাদা সন্তুর। লণ্ডনের অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন, সংক্ষেপে ‘ডবল এ’-তে ডে অ্যাণ্ড নাইট শিফটে কাজ করে সন্তু। প্রধানত নাইট শিফটেই। দিনে লিঙ্কনজ ইন-এ আইন পড়ে। ক-দিন হল বাবলি ওখানে এসে থাকছে, বলল বাপী। তারপর একটু রহস্য যোগ করে বলল, ভাসুরঠাকুরের আশ্রয়ে। কিন্তু আমার হাসি পেল না। আমি নীরবে সিগারেট ফুকতে ফুকতে বাপীর পাশাপাশি হাঁটছি।
সন্তুর এই ফ্ল্যাটটা বাস্তবিকই গর্জাস। বার কয়েক আমি আর বাপী এখানে পার্টি করতে এসেছি। মস্ত মস্ত ঘর, ফ্রেঞ্চ উইণ্ডো দিয়ে বাগানের থেকে আলাদা করা। ফ্ল্যাটের দু-খানা বড়ো ঘর নিয়ে থাকে সন্তু, বাকি দু-খানায় একটা ইংরেজ যুবতী। লম্বা-চওড়া সুন্দরী মেয়ে, নাইটক্লাবে নাচে। এবং দেখে-শুনে মনে হয় ফাঁকা সময়ে সন্তুকেও নাচায়। সন্তুর খুব ঝোঁক ওর ওপর, কিন্তু বিশেষ এগোতে পারে না সিলভিয়ার ক্যারিবিয়ান প্রেমিকের ভয়ে। সে এক ছ-ফুট সাত ইঞ্চি কৃষ্ণাঙ্গ পপ সিঙ্গার। মাল খেয়ে থাকলে সিলভিয়াকেও দু-চার ঘা বসিয়ে দেয় মর্জি মতো। সন্তু ওর প্রেমিকার দিকে হাত বাড়াচ্ছে জানলে জ্যান্ত চিবিয়ে খেয়ে ফেলবে বাঙালিনন্দনকে।
সম্ভর ফ্ল্যাটে বেল টিপতে টিপতে বলল, এখনও সন্তুর নাইট ডিউটি করে ফেরার সময় হয়নি। বাবলি একাই থাকবে। কথা বলতে সুবিধেই হবে।
কিন্তু বেল-এ সাড়া নেই। বাপী ফের বেল টিপল। তারপর আবার। চতুর্থবার যখন টিপতে যাবে তখন কুট করে আওয়াজ হয়ে দরজা খুলে গেল। আর দরজা খুলে চোখ রগড়াতে রগড়াতে শোয়ার পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে নীলু।
সিলভিয়ার প্রেমিক সেই কালো দৈত্যটাকে দেখলেও আমরা এর চেয়ে বেশি অবাক হতে পারতাম না। বাপী বা আমি দু-জনেই এত বোকা বনে গেছি যে, মুখে কোনো হাসি বা কথা জোগাচ্ছে না। প্রিয়, পরিচিত ছেলেটাকে দেখে আমাদের কোনো প্রতিক্রিয়াই প্রায় হচ্ছে না।
শেষে নীলুই বরফ ভাঙল, কী, কেমন আছ তোমরা?
সামাল দেবার জন্য বাপী বলল, কী, সন্তু ফেরেনি এখনও?
আমাদের ফ্ল্যাটের ভেতর ঢুকিয়ে নিতে নিতে নীলু বলল, সময় হয়ে গেছে। যেকোনো মুহূর্তে এসে পড়বে। ততক্ষণে তোমরা একটু কফি খাও।
আমরা কেউ আপত্তি করলাম না।
নীলু আমাদের নিয়ে বসাল প্রথম ঘরটায় যেখানে একটা বত্রিশ-চৌত্রিশ বছরের ভদ্র চেহারার ইংরেজ লেপ মুড়ি দিয়ে শুয়ে আছে। নীলু বলল, দিস ইজ মাই ফ্রেণ্ড, টিচার অ্যাণ্ড লাভার জিম। অ্যাণ্ড দিজ আর মাই গ্রেট ফ্রেণ্ডস বাপী অ্যাণ্ড নীতিন।
একটু চোখ পিটপিট করে ঘরের আলোটা চোখে সইয়ে নিয়ে তড়াক করে বিছানার ওপর হাঁটু মুড়ে বসল জিম। আর আমাদের দুজনের দিকে করমর্দনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, হাই!
কাল রাতেই এই ব্যাটাকে পেঁদাবার কথা বলছিল বাপী। লোকটার চেহারা-চরিত্র দেখে বোধ হয় ওর সেই রাগ গলে জল হয়ে গেছে। প্রায় ইতস্তত না করেই ও ডান হাত বাড়িয়ে ধরে নিল ওর হাত। আর ঝাঁকাতে থাকল। তারপর আমার পালা। হাত ঝাঁকালাম আমিও। তারপর কোনোমতে পায়জামার ঢিলে দড়িটা টাইট করতে করতে টলমল পায়ে বিছানা থেকে মেঝের কার্পেটে নামল জিম।
কিছুটা সৌজন্য রক্ষার জন্যই আমি আর বাপী ‘এক্সকিউজ মি’ গোছের কিছু বলতে বলতে বেরিয়ে এলাম বাইরে। আমাদের দুজনেরই ইচ্ছা বাবলির ঘরে গিয়ে বসি।
বেরিয়ে করিডোর দিয়ে পাশের ঘরে যাওয়ার পথে…হ্যাঁ, ওই তো বাবলি। একটা ঢিলে ঢালা নাইটিতে কোনোমতে নিজের নগ্নতাকে ঢেকে টয়লেটের দিকে ত্রস্ত পায়ে এগোচ্ছে। আমাদের দেখে এক দন্ড থামল, প্রায় অনাবৃত বুকটাকে টেনেটুনে ঢেকে কঠিন, হিংস্র চোখে আমাদের দিকে চাইল। মুখে অস্ফুটে বলল, ও! তোমরা। তারপর ঢুকে গেল বাথরুমে। আমরা বুঝতে পারছি না এরপর আমাদের এখোননা উচিত কি না। কিন্তু বাপী সাপুড়ের বাঁশিতে ধরা সাপের মতো এগিয়েই চলল বাবলির ঘরের দিকে। সঙ্গে আমিও।
এবার আরেক সাহেব লাফ দিয়ে উঠল বিছানা থেকে। বলল, আই অ্যাম অ্যাণ্ডি। জিমস ফ্রেণ্ড। নাও বাবলিজ ফ্রেণ্ড টু।
দুটো রোবটের মতো বাপী এবং আমি হাত বাড়িয়ে হ্যাণ্ডশেক করলাম ওর সঙ্গে। একজন বললাম, ‘আই অ্যাম নীতিন’, আরেকজন, ‘আই অ্যাম বাপী। এ সাহেবও দেখি পায়জামার গিট সামলাতে সামলাতে কার্পেটে নামছে। আমি আর বাপী ভাবছি এবার পালিয়ে কোথায় চুকব।
এবার পেছন থেকে দৌড়ে এল নীলু।
—কী হে, তোমরা পায়ে পায়ে ঘুরছ কেন? বসো। এখানেই বসো। অ্যাণ্ডি ইজ আ গ্রেট ফ্রেণ্ড অব আওয়ার্স। হি হ্যাজ ফলেন হেড ওভার হিলজ ফর বাবলি। দে উইল মেক আ ফাইন কাপল।
রাগে জ্বলে যাচ্ছে আমার গোটা শরীর বাস্টার্ডটার কথায়। বাপী আঙুল মটকাতে শুরু করেছে। সেটা ওর রাগের লক্ষণ। অবস্থা গুরুতর হতে পারে দেখে আমি বাপীর পিঠে হাত রেখে বললাম, চল বাইরে বাগানে গিয়ে বসি। বাপী কিছু বলার আগে পেছন থেকে বলে উঠল বাবলি, না, প্লিজ। তোমরা আমার ঘরেই বসো।
