আমি রেগে না গিয়ে শান্তভাবে বললাম, না সেটাও হবে না, বাপী। আমি দেশে ফিরেই বিয়ে করছি। ভেবেছিলাম তোকে কিছু না বলে সময়মতো সারপ্রাইজ দেব। তো…
বাপী একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, আমি জানি। আমি তোর ওয়ালেটের ছবিটা তোকে না জানিয়ে বেশ কবার দেখেছি। আর তোকে লেখা নন্দিনীর চিঠিগুলো লুকিয়ে চুরিয়ে পড়েওছি।
এইবার রাগটা এল আমার মাথায়। চিঠি পড়া বা ছবি দেখার জন্য নয়। কেন ও তাহলে এই কথাটা বলল। বেশ ঝাঁঝের সঙ্গে বললাম তাহলে বাজিয়ে দেখছিলি মন টলে কি না।
বাপী হাতড়ে হাতড়ে অ্যাশট্রের জায়গা মতো সিগারেটের টুকরোটা গুঁজে দিতে দিতে বলল, তা একেবারেই নয় নীতিন। ভাবছিলাম ও যদি এমন কাউকে বিয়ে করে যাকে আমি চিনি তাহলে ইচ্ছেমতো বাড়ি গিয়ে ওকে দেখে আসতে পারব। সেই কথাটাই হয়তো ফসকে গিয়ে…
বাপীর গলা জড়িয়ে আসছিল। কথাটা ও শেষ করতে পারল না। আমার আর বুঝতে বাকি রইল না যে, বাপী প্রেমে পড়েছে। আমি ওর পিঠে আলতো করে হাত রেখে বললাম, তুই শুয়ে পড়। কাল তোর অফ-ডে। কাল রবিবারও। সকালে লিটল ভেনিস কাফেতে ব্রেকফাস্ট করব চল। একটা সলিউশন বার করতেই হবে।
কীরকম অসুস্থ লোকের মতো ধড়াস করে বিছানায় পড়ল বাপী। কতক্ষণ পর ও ঘুমোল আমি জানি না। শুধু সকালে চোখ মেলে দেখলাম বেচারি অকাতরে ঘুমোচ্ছে। ডাকতে গিয়েও কীরকম মায়া হল। হয়তো সারারাত ছটফট করেছে অনিদ্রায়। ভোর রাতের ক্লান্ত ঘুম হয়তো। আমি গায়ের লেপ সরিয়ে ঘরের এক কোণে বেসিনের দিকে পা বাড়ালাম মুখ পোব বলে। আর তখনই কীরকম ধড়মড় করে জেগে উঠল বাপী। যেন প্রচন্ডভাবে কেউ ধাক্কা দিয়েছে ওকে। আর জেগে উঠেই আমার দিকে কীরকম ক্লান্ত, অসহায় দৃষ্টি মেলে বলল, কই, লিটল ভেনিস যাবি না?
একটা সুন্দর খালের পাশে ঘন সবুজ উইলো আর এভারগ্রিন গাছের হাতছানির মধ্যে শিল্পীদের নিজস্ব কাপে লিটল ভেনিস। জলে-ঘেরা পল্লির এই একটেরে কাফের দেওয়াল সাজানো আছে তেলরং, জলরং, স্কেচ, ড্রয়িং, লিথোগ্রাফে। শিল্পীদের ভালোবাসার উপহার সব। আমরা দু-জনে গিয়ে বসলাম একেবারে জানালার গায়ে। আমি জানালার বাইরে জল আর গাছপালা দেখছিলাম। সেই ফাঁকে কখন একসময় ব্রেকফাস্ট অর্ডার করে বসে আছে বাপী। আমি বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে টেবিলের মেনুটা খুঁজতে গিয়ে দেখলাম বেকন, হ্যাম, অমলেট ও কফিতে সাজানো আছে টেবিল। আর টেবিলের উলটো দিকে আমার দিকে চেয়ে বসে আছে বাপী। আমি যেন সেই ডেলফাইয়ের ওরাকল। যার উচ্চারণের ওপর নির্ভর করছে ওর সব সুখ, সব অনুভূতি, সব সাফল্য ও ব্যর্থতা ও সারা জীবন।
আমি কালো কফিতে একটা চিনির কিউব ফেলে গুলতে গুলতে বললাম, বাপী, তুই ওকে বিয়ে কর।
বাপী বোকা ছেলে নয়, ও নিশ্চয়ই আশা করেছিল আমি এরকম কিছু একটা বলব। তা সত্ত্বেও ও চমকে উঠে বলে ফেলল, আমি!
আমি ভাব দেখালাম যেন সত্যি কিছু হয়নি। বললাম, হ্যাঁ, তুই।
মনের বাসনা অন্যে বুঝে গেলে খুব পুরুষালি লোকেরও লজ্জা হয়। বাপীও বাদ গেল না। ও লজ্জায় পড়ে বেকনের একটা বড়ো চোকলা মুখে তুলে জোরে জোরে চিবোতে লাগল। আমি আর কিছু বলছি না দেখে ফের বলল, আমি?
বললাম, কেন, অসুবিধে কী?
ফের মাথা নামাল বাপী। জুল জুল করে খাবারগুলো দেখছে আর কী ভাবছে। কিছু বলতেও চাইছে, কিন্তু মুখে কথা জোগাচ্ছে না। আমি সাহায্য করার জন্য বললাম, রাজি হবে না ভাবছিস?
বাপী মাথা নাড়ল।–সে তো অনেক পরের কথা। আমি ভাবছিলাম ব্যাকগ্রাউণ্ডগুলো। ও শিল্পপতির মেয়ে, আমি ইস্কুলের হেডমাস্টারের। বিদেশে অবিশ্যি এসব কাউকে ভাবতে দেখি না। আবার ভাবি, রক্ত। রক্তের চরিত্র কি অন্য সমাজে গিয়েও পালটায়?
—কিন্তু এখানে তো তুই ত্রাণকর্তার ভূমিকায়। তোর কী বড়ো ল্যাটা অন্যের বউয়ের সমস্যা মাথায় নেওয়ার?
বাপী একটু চুপ করে থেকে ফের শুরু করল, এ ছাড়াও তো সমস্যা আছে, নীতিন।
-কীরকম?
–ও যে এখনও ভীষণ ভালোবাসে নীলুকে। ডিভোর্স নিলে আলাদা থাকতে তো ওকে হবেই। কিন্তু ফিরে বিয়ে করতে চাইবে কি না বলা মুশকিল।
—তাহলে তুই আমাকে বলেছিলি কেন বিয়ের কথা?
-বললাম তো হঠাৎ করে মুখে এসে গেল। তা ছাড়া…তা ছাড়া কোথায় যেন একটা ভীষণ মিল দেখলাম তোর আর নীলুর মধ্যে। সফিস্টিকেটেড, নীচু স্বরে কথা, চেহারা…।
আমি চটেমটে বলে উঠলাম, এনাফ ইজ এনাফ! আই অ্যাম নট আ হোমোসেক্সয়াল ইন দ্য ফাস্ট প্লেস।
বাপী হাত দেখিয়ে আমাকে থামিয়ে বলল, প্লিজ! আমাকে ভুল বুঝিস না। এগুলো হল জাস্ট ফাস্ট ইম্প্রেশনজ। তোর সঙ্গে মিশলে বোঝা যায় যে তুই একেবারে অন্য ধরনের মানুষ। কিন্তু এবার তুই আমায় বল, তোর কেন মনে হল আমার ওকে বিয়ে করা উচিত?
খুব সাদামাটাভাবে বললাম, কারণ তুই ওর প্রেমে পড়েছিস এবং সম্ভবত ওকে বিয়েও করতে চাস।
বাপী খাবার আর কফির কাপ-ডিশ পাশে সরিয়ে একটা ক্যামেল’ সিগারেট ধরাল। একটা আমায় দিয়ে বলল, নে। তারপর ব্রেকফাস্টের দাম ও টিপস টেবিলে গুছিয়ে রেখে বলল, চল, সাদারল্যাণ্ড অ্যাভেনিউতে বাবলির ফ্ল্যাটে একবার যাই।
আমি ‘হ্যাঁ’, ‘না’ কিছুই বললাম না, কারণ এত সবের পর বাবলিকে স্পষ্ট করে দেখার উদগ্র বাসনা হচ্ছিল। কীরকম বাসনা হচ্ছিল ওর নিজের মুখে ওর সমস্যাগুলো শুনি। দেখি পুরাতন প্রেম কীভাবে টিকেবর্তে আছে ওই একরত্তি মেয়ের মধ্যে। কতই বা আর বয়স? টেনেটুনে উনিশ-কুড়ি।
