বাবলি চলে যেতেই বাপী বলেছিল, ও হল নীলুর বউ। নীলুকে তো তুই চিনিস।
চিনি বই কী। নীলুকে চিনব না। ক-দিন আগেই তো নিউক্যাসল থেকে উইক-এণ্ডে এসে কীরকম হইচই করে গেল। আর কী দেবদূতের মতো চেহারা! এত সুন্দর নিটোল ফর্সা ধবধবে চেহারা যে হঠাৎ দেখলে মেয়ে মনে হয়। তার ওপর পরেছিল লাল টকটকে। ফুলহাতা সোয়েটার। সোয়েটারের ‘ভি’ কাট কলারের কাছে কালো টাই ঝকঝক করছে সাদা শার্টের ওপর। দেখে বুঝেছিলাম ছেলে খুব শৌখিন আর সেলফ কনশাস। বিয়ার খেতে খেতেও বেশ তাকিয়ে নিচ্ছিল পেছনের আয়নায়।
আমি লেপের ভেতরেই পাশ মুড়লাম বাপীর দিকে। বললাম, দেখলাম তো বাবলিকে। কেন কী হয়েছে?
বাপী বলল, নীলু ওর থেকে ডিভোর্স চেয়েছে।
হঠাৎ করে আমাদের উষ্ণ বিছানায় কে যেন ঠাণ্ডা জল ঢেলে দিয়েছে। শুধু বিস্ময় নয়, কীরকম একটা আতঙ্ক হল ভেতরে, অত সুন্দর একটা মেয়েকে ছেড়ে দিতে চায়! কেন, কী হতে পারে ওদের মধ্যে? এই তো সবে বিয়ে করে এল।
বললাম, ডিভোর্স কেন? নীলু কি কোনো মেমসাহেব নিয়ে পড়ল?
বাপী বলল, মেমসাহেব নয়, জাস্ট সাহেব।
–তার মানে!
–নীলুর প্রেমিক একটি পুরুষ। নীলুর অধ্যাপক।
–কী বলছিস কী? ইউ মিন নীলু ইজ আ হোমোসেক্সয়াল?
–হ্যাঁ। আরও চলতি ভাষায় বলতে গেলে হি ইজ আ গে। গে কথাটা শুনেছিস? আমি এতই অবশ হয়ে গেছি ভেতরে ভেতরে যে বাপীর কথার উত্তর দিতে ইচ্ছে হল । বাপী ভালো করেই জানে যে ইংরেজি ডিকশনারির কোনো শব্দই প্রায় আমার অজানা নয়। ওটা বলে ও বোধ হয় আমাকে একটু চটাতে চেয়েছে। আমি গা করলাম না। চুপ করে রইলাম।
বাপী ফের বলল, ট্র্যাজেডিটা কী জানিস? নীলু আর বাবলির প্রেম সাত-আট বছর বয়স থেকে। দু-বছর আগে যখন বিলেতে পড়তে এল নীলু তার আগে ওদের আশীর্বাদও হয়ে গেছে। কিন্তু ছ-মাস আগে যখন ও দেশে ফিরল বিয়ে করতে ও পুরোদস্তুর গে।
উত্তেজিত হয়ে আমি কথার মধ্যেই জিজ্ঞেস করে বসলাম, তো সে-কথা ও জানাবার প্রয়োজন বোধ করল না বাবলিকে?
অন্ধকারের মধ্যে বালিশের আশপাশ হাতড়ে বাপী সিগারেটের প্যাকেট বার করল। একটা নিজে ধরিয়ে আরেকটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। ঘুমের দফারফা তো হয়েইছে, সে-ক্ষেত্রে আরেকটু ধূমপান হলে মন্দ কী? আমিও সিগারেট ধরালাম।
একটা লম্বা সুখটান দিয়ে বাপী বলল, নীলু সবিস্তারে সব জানিয়েছিল। ব্যাপার-স্যাপার জেনে বাবলির বাবা-মা বিয়ে ভেঙে দিতে চায়। কিন্তু বাবলি দেয়নি। বলেছিল ওকে ছাড়া আমি কাউকে বিয়ে করতে পারব না। ওর গোঁ ছিল ও বিয়ে করে বরকে শুধরোবে।
আম বললাম, পারেনি?
বাপী মাথা নাড়ল। বাপী সিগারেট খাবে বলে উঠে বসেছিল। জানালার বাইরে থেকে স্ট্রিট লাইটের এক মৃদু রশ্মি ঘরের একটা দেওয়ালে এসে পড়েছিল। তাতে ততটুকুই আলো হচ্ছিল যাতে মানুষকে ছায়া হিসাবে ঠাওর করা যায়। আর তাতেই আমি বুঝলাম বাপী মাথা দুলিয়ে না বলছে।
আমি ফের বললাম, অগত্যা?
-অগত্যা ডিভোর্স। তার আগে একটা শেষ চেষ্টা করব কি না ভাবছি।
—শেষ কী চেষ্টা?
–ওই সাহেবটাকে বোঝানোর।
—কী বোঝাবি? আর সে-চেষ্টা কি বাবলি করেনি ভাবছিস।
-না, মোটেও তা ভাবছি না। কারণ বাবলি তা করেছে। ওকে নাকি জিম বলেছে যে, কেউ যদি তোমার প্রেমিককে কেড়ে নিতে চায় তাতে কি তুমি সম্মতি দেবে?
কথাটা শুনেই কেমন রি রি করে উঠল গা-টা। সামনে লোকটা থাকলে হয়তো ঠেসে চড় কষিয়ে দিতাম। কথার ছিরি কী পুরুষ মানুষের।
বললাম, তাহলে আর কী চেষ্টা করবি তুই?
বাপী গলা নামিয়ে বলল, চেষ্টা আর কী! গিয়ে তিন ঠুসো মারব। চোয়াল ভেঙে দেব। প্রচন্ড ঝামেলা পাকাব।
আমার মনের ওপর ঝিলিক দিয়ে গেল সেই বাপী। নকশাল আন্দোলনের আগুন আর বোমার মাঝখানে হাতে পেটো নিয়ে দাঁড়িয়ে একরোখা ছেলেটা ফুঁসছে।
আমি ওর আজগুবি উচ্ছাসে জল ঢালার জন্য বললাম, তাতে আর কী সুবিধে হবে বাবলির? নীলু যদি হোমোসেক্সয়ালই হয়ে থাকে তাহলে সবার আগে সারানো উচিত তো ওই হারামজাদাকে। সাহেবকে মেরে ভাগাতে কতক্ষণ? কিন্তু তাতে কি ঘরের ছেলেটার চরিত্র সংশোধন হবে? সে তো আবার একটা পুরুষ ধরবে।
রাগের মাথায় প্রিয় বন্ধু সম্ভর ছোটো ভাইটাকে খিস্তি দিয়ে ফেলল বাপী, শালা মাদী কোথাকার।
আমি বললাম, এসব তো তোমার লণ্ডনের কালচার বাপু; ওকে আর দোষ পেড়ে কী হবে? তা ছাড়া এটা তো ঠিক কারও চরিত্রের ব্যাপার নয়। একটা রোগও। কাল বাদে পরশু তুইও যে হবি না তার কোনো…
থাম তো! বাজে বকিসনি! গর্জে উঠল বাপী। একটা কনস্ট্রাকটিভ চিন্তা কিছু নেই, শুধু ফোড়ন কাটা।
এবার আমার খুব হাসি পেয়ে গেছে। বললাম, কনস্ট্রাকটিভ চিন্তা বলতে কী বোঝাচ্ছিস?
-যাতে মেয়েটার দুরবস্থা কিছু ঘোচে।
—মেয়েটার দুরবস্থার একটাই সুরাহা। ওই অপদার্থটাকে ডিভোর্স দিয়ে দেশে ফিরে যাওয়া।
অন্ধকারের মধ্যেই দেখলাম বাপী ফের মাথা নাড়ছে। একটুক্ষণ পর মুখে বলল, না, সেটা হবে না।
–কেন?
–ওকে এখানেই থাকতে হবে। যা ও চায়। ফলে ওকে চাকরিও করতে হবে। আর যদি অন্য কাউকে…
—বিয়ে?
–হ্যাঁ। তুই করবি?
–তার মানে!
–আমি তোরও চাকরির ব্যবস্থা করব যদি তুই…
আমি কী যে বলব ছেলেটাকে বুঝে পেলাম না। আমি এসেছি মাস কয়েকের কাজে, দেশে ফিরে বিয়ের কথা। গার্লফ্রেণ্ডের ছবি রাখি পার্সে। দিনে একলা থাকলে বার করে দেখি। আর এই হতভাগা কিনা…একটু হোঁচট খেলাম ভেতরে কোথায়। সত্যি তো। আমি তো কোনোদিন ওকে আমার বান্ধবী বা বিয়ের কথা কখনো বলিনি। অথচ দেখতে দেখতে কাটিয়ে দিয়েছি তিনটে মাস এক ঘরে।
