এই দ্বিতীয় মতটার সপক্ষে এত মানুষ জুটল কী করে তা বাস্তবিকই ভাববার বিষয়। যুগ যুগ ধরে লোক অবাক বোধ করেছে এই ঘটনায়। হতাশ এবং বিরক্ত কিছু ঐতিহাসিক থেকে থেকে রেবন্তের বর্ণনাকেই সত্য বলে মেনে নিতে প্রস্তুত হয়েছেন। শেষপর্যন্ত একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন মহামহোপাধ্যায় লসতীশচন্দ্র শুক্ল। যাঁর সঙ্গে গিরিশ ঘোষ, রমেশ দত্ত, দীনবন্ধু মিত্র, গৌর বাউল প্রমুখের নিকট আলাপ ছিল শোনা যায়। তিনি চমৎকার আলোচনা করেছেন ব্রহ্মাচার্যের ‘অনুসন্ধান ক্রীড়া’-র একাংশের, যাকে বইটির গোধূলি পর্যায় বলা যায়। বুদ্ধি এবং অনুভবে সম্পৃক্ত এই পর্যায় সুস্থতা এবং উন্মাদনার মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে। হিন্দু পন্ডিত যেখানে লিখেছেন, সর্বশ্রেষ্ঠ খুন ভেতরের জ্বলুনি থেকে হয়। যে জ্বালা কেবল নারী সংক্রান্ত ঘটনার থেকে উঠে আসে। এইসব খুন মাঝরাতেই হওয়া শ্রেয়। খুনি যে সময় নারী এবং ঘটনাসংলগ্ন পুরুষকে একই সঙ্গে পাবে। তাদের সংগমরত অবস্থাতে আঘাত করাই পৌরুষের লক্ষণ। ভালো হয় যদি সে আঘাত তলোয়ার, কুড়োল কিংবা বল্লম দিয়ে হয়। তবে এ খুন সমাপ্ত হবে না যতক্ষণ প্রেমিক যুগলের দেহ টুকরো টুকরো করে ছিড়ে ফেলা হচ্ছে। তবে এই খুনের আদত সমাপ্তি ঘাতকের আত্মহত্যায়। কারণ সেভাবে সে তুরীয় অবস্থায় পোঁছোয়। নিজেকে শেষ করতে না পেরেই, সতীশচন্দ্র বলেছেন, রেবন্ত মিথ্যে বিবরণের আশ্রয় নেয়। তবে ওরও যে তুরীয় অবস্থা এসেছিল তা প্রকট হয় পরবর্তী ঘটনায়। ও বেশিদিন সুস্থ থাকতে পারেনি।
ভালোবাসিবে বলে ভালোবাসিনে
টিভিতে একটা দারুণ হরর ছবি দেখা হচ্ছিল হাতে বিয়ারের কৌটো নিয়ে। ভয় বা সাসপেন্স কোথাও কম হলে বাপী যেন কিছু বলি বলি ভাব করেও থেমে যাচ্ছিল।
একবার দু-বার ভেবেছিলাম ও বলতে চাইছেটা কী? অন্ধকার ঘরে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছিলাম ওর মুখের হাবভাব। মনটা একরকম ডুবেই আছে টিভির হররে। আবার কিছুটা ভেসেও আছে কোথায় যেন একটা। ভয়ের ছবির টেনশনের সঙ্গে অন্য কী একটা টেনশনও যেন মিশেছে।
কিন্তু বাপীর টেনশন। টেনশন কথাটাই যেন ওর ডিকশনারিতে নেই। যেকোনো পরিস্থিতিতেই ঠাণ্ডা মাথায় টেনে টেনে কথা বলাই ওর স্টাইল। টুকিটাকি ব্যক্তিগত হিসেব লেখার সময়ও হালকা করে চালিয়ে রাখে বব ডিলান কী মেহেদি হাসানের গান। দাড়ি কামাবার সময়ও জ্বলন্ত ‘ক্যামেল’ সিগারেট একটা শোয়ানো থাকে বেসিনের ধারে অ্যাশট্রেতে। গোটা কয়েক ব্লেডের পোঁচ দিয়েই সাবান-লেপা মুখে দু-এক টান দিয়ে নেয় সিগারেটে। যা টেনশন থেকে নয়, আরামে।
ও যখন ছুটির দিন দুপুরে লাঞ্চের পর লেনিন বা মাওদের বই মুখে নিয়ে আরাম কেদারায় বসে তখন ক্ষণিকের জন্য টের পাই ও আসলে কী ছিল কলেজে। ডাকসাইটে নকশাল অ্যাক্টিভিস্ট। বোম ছুড়ছে, ছুরি চালাচ্ছে, পুলিশের বন্দুক কাড়ছে, একেক রাত একেক পল্লিতে শুচ্ছে, ক্কচিৎ কখনো কফিহাউস বা কলেজ স্ট্রিটের গলিগালায় দেখা হলে সোৎসাহে কুশল জানছে, তোরা বেঁচে আছিস তো?
আমরা তখন মনে মনে হাসি। কেন, আমাদের মরার কী হয়েছে? আমরা কি রাজনীতি করে বেড়াচ্ছি? আর সেই প্রশ্ন শুধোচ্ছে কি না রাজনৈতিক শত্রু আর পুলিশের হাত থেকে পালিয়ে-বেড়ানো বাপী।
তারপর একসময় পালাতে পালাতে বাপী এই লণ্ডনে। মস্তবড়ো হোটেলে বড়োসড়ো চাকরি আর রেকর্ড, বই নিয়ে ভুলে আছে সবকিছু। আমি কাজের যোগাযোগে মাস কয়েকের জন্য লণ্ডন এসে প্রথম ওকে খবর দিলাম, তোদের বোধ হয় পালিয়ে-বেড়ানোর ইতি হল। বামফ্রন্ট সরকার তোদের বিরুদ্ধে যাবতীয় কেস উঠিয়ে নিয়েছে।
কথাটা শুনে বাপী খুশি হয়েছিল, না হয়নি বোঝার উপায় ছিল না। সাদামাঠাভাবে শুধু বলেছিল, ভালো।
আর বাপী এখন আমার পাশে মোটা লেপ চাপা দিয়ে নরম কার্পেটে শুয়ে। ঘুমোয়নি যে তার যথেষ্ট ইঙ্গিত ওর থেকে থেকেই এপাশ-ওপাশ করা, যা কখনোই করে না। হোটেলে কাজ করার দরুন বিয়ার-হুইস্কিটা প্রায় নিখরচায় হয়। নেশায় থাকে বলে বিছানায় পড়ে আর ঘুমোয়। যেটা আজ হচ্ছে না।
এপাশ-ওপাশ করতে করতে একবার আমার দিকে পাশ ফিরে ডেকে উঠল বাপী অ্যাই নীতিন, ঘুমিয়ে পড়লি?
আমি মোটেও ঘুমিয়ে পড়িনি, কিন্তু দর বাড়ালাম প্রথম ডাকে সাড়া না দিয়ে। বাপী ফের ডাকল, অ্যাই নীতিন।
আমি ঘুম জড়ানো গলায় ভান করে বললাম, কী?
বাপী বলল, সকাল বেলায় বাবলিকে দেখলি?
বাবলিকে সেদিন সকালেই দেখেছিলাম বাপীর ফ্ল্যাটে। ভারি সুন্দর মেয়েটি। যাকে বলে বিউটি। একটু চাপা গায়ের রং, যাতে রূপ আরও ফুটেছে। একটু মেমসাহেব মেমসাহেব ভাব আছে চেহারায়। স্মার্ট কথাবার্তা, দারুণ ইংরেজি অ্যাকসেন্ট। যদিও মাত্র মাস কয়েক হল বিয়ে হয়ে লণ্ডনে এসেছে। একটু বুঝি গর্ব করেই বলছিল, আমি কিন্তু লণ্ডনের প্রোডাক্ট নই, নীতিনদা। ষোলোআনা কলকেতে। লোরেটো মিডলটন।
কিন্তু আমি নজর করেছিলাম আরও একটু বেশি কিছু। হাসিখুশি মেয়েটা আসলে বেশ বিষণ্ণও। সুন্দর মুখে সেরকম একটা ছায়া আছে। অনেকক্ষণ কথা বললে হঠাৎ হঠাৎ ‘আহা’! ‘উহু’-ও বেরিয়ে আসে। ব্যাপারটা আমি নজর করেছিলাম, কিন্তু আমল দিইনি। অন্যের। ব্যাপারে ও ধরনের শৌখিন গোয়েন্দাগিরি ভালো নয়। আমার আসেও না।
