‘আজ সকালে যখন গুরুদেব স্নান সারতে সরস্বতীর দিকে যান আমি তাঁর পিছন পিছন গেলাম। তিনি যখন উলঙ্গ হয়ে জলে নামলেন আমি এক মুহূর্তের জন্য চমকে গেলাম। ওঁর যৌনাঙ্গ অসম্ভব দীর্ঘ। উনি যখন আচমন করলেন আমি একটা ভয়ংকর দৃশ্য দেখলাম। ওঁর জিহ্বাও অমানুষিক লম্বা। কিন্তু ওই জিহ্বা তো আগে আমার এত বড়ো ঠেকেনি। তাহলে কোনো সূত্রে ইনিই কি চেল প্রদেশের সেই যুবরাজ যার কথা এখনও কেউ জানে না?
গুরুদেব যখন জলে ডুব দিচ্ছিলেন তখন আমি সহসা বানরের মতো লাফ দিয়ে ওঁর কাঁধে চড়ে বসলাম এবং ওঁর মুন্ডটা ঠেসে ধরলাম জলের মধ্যে। সে-অবস্থাতেও উনি বহুক্ষণ জীবিত ছিলেন। অতক্ষণ কোনো মানুষ পারে না। কিন্তু আশ্চর্য! উনি নিজেকে বাঁচানোর কোনো চেষ্টাই করলেন না। আমার মনে হল আমি একটা মৃত লোককে হত্য করতে উদ্যত হয়েছি।
বাড়ি ফিরে এসে আর সুদক্ষিণাকে খুঁজে পাচ্ছি না।
রেবন্ত গুরুহত্যার দিনটির বিবরণে সুদক্ষিণার কথা উল্লেখ করেছে। কিন্তু সেখানে উল্লেখ নেই সুধাবতীর। আমাদের ধারণা হয় সুধাবতীর মৃত্যু এর অনেক আগেই হয়েছিল ব্রহ্মাচার্যের নিপীড়ন যন্ত্রে। সেই নিপীড়ন যন্ত্র, যার দু-টি বিশেষ উপকরণ ওই সহস্রকোণ পাথর এবং সুদক্ষিণা। মৃত্যুটা এত সহজ অথচ অপ্রত্যাশিত ছিল যে, লোকের ধারণা হয়েছিল সুধাবতী উন্মাদ হয়ে আত্মহত্যা করেছেন। শেষের দিকে তিনি বস্ত্র বর্জন করেছিলেন। জলের দিকে তাকালে তিনি নিজের মুখের জায়গায় সুদক্ষিণার মুখ দেখতে পেতেন। সুদক্ষিণার সঙ্গে স্বামীকে সংগম করতে দেখলে মনে করতেন ওই সুদক্ষিণাই হলেন তিনি। সেই মতন তাঁর রতিতৃপ্তি ঘটে থাকত। ক্রমশ তিনি নিজের এবং সুদক্ষিণার মধ্যের তফাতটুকু হারিয়ে ফেলেন। এবং জীবনের শেষ দিনটিতে তিনি কন্যার ওপর অত্যন্ত রেগে গিয়ে সুদক্ষিণা মনে করে নিজের গলায় নিজে দড়ি পরিয়ে দেন। এরপরই ব্রহ্মাচার্যের নিপীড়ন যন্ত্র কবিতার দিকে প্রসারিত হয়।
আশ্চর্যের ব্যাপার, মার হাতে তার মৃত্যু হয়েছে ভেবে সুদক্ষিণাও এই থেকে সুধাবতীর মতো আচরণ করতে গুরু করে। স্বামীজ্ঞানে যত্ন করতে থাকে ব্রহ্মচার্যকে, এবং এক কালের প্রেমিক রেবন্তকে সন্তানের মতো বাৎসল্য প্রদর্শনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। রেবন্তের জীবনে চরম ব্যর্থতাবোধের শুরুও এইখানে।
একটা অন্য রকম ব্যর্থতাবোধও রেবন্তের মধ্যে কাজ করছে আমরা বুঝতে পারি ওর গুরুহত্যার পাদটীকা পড়লে। ব্রহ্মাচার্যের মৃত্যু ওভাবে হয়নি মেনে নিলেও রেবন্তর ওই পাদটীকাকে অবজ্ঞা করা যায় না। রেবন্ত যেখানে বলেছে, ‘গুরুদেব জলে মগ্ন থেকেও প্রতিবাদ করলেন না কেন? উনি কী ওঁর সেই পূর্বপ্রতিশ্রুত স্বপ্নে ডুবে গেছিলেন? যে স্বপ্নে গিয়ে তিনি হঠাৎ জগত্সংসারের জীবনটাকেই একটা স্বপ্ন হিসেবে দেখতে পেতেন। যে স্বপ্নে তিনি সেই ব্রহ্মাচার্য, যিনিও একটা স্বপ্নে মগ্ন আছেন। যে স্বপ্নে স্বপ্নস্থ ব্ৰহ্মাচার্য দেখতে পাচ্ছেন এক রেবন্ত তাঁকে জলে ঠেসে ধরে শ্বাসরুদ্ধ করতে উদ্যত এবং অসহায় পন্ডিত স্বপ্নের মধ্যে হাত বাড়াতেও ভুলে গেছেন।
তাহলে আমি কী শেষমেষ একটা স্বপ্নের চরিত্রকেই নিহত করলাম? তাহলে আমি যে আসল একটা মানুষ তার প্রমাণ কী? একটা স্বপ্নের চরিত্রকে তো খুন করতে পারে শুধুমাত্র আর একটা স্বপ্নের চরিত্র। কেউ কি আমায় বলে দেবে না আমি ইহজগতের জ্যান্ত রেবন্ত না রত্নাকর ব্রহ্মাচাৰ্যর স্বপ্নজগতের মায়াপুরুষ?
স্পষ্টতই অনুমান করা যায় গুরুদেবকে হত্যার পর রেবন্তরও বুদ্ধিভ্রংশ হতে শুরু করে। ‘গুরুচরিত’-এর অন্তিম অংশে তাই সে ক্রমাগত নিজের সত্তা সম্পর্কিত প্রশ্ন তুলতে থাকে। স্থানে স্থানে গুলিয়ে ফেলে তার এবং গুরুদেবের নাম-ধাম পরিচয়। এবং এইরকম এক অসংলগ্ন মুহূর্তে শেষ বারের মতো ব্রহ্মাচার্যকে উৎখাত করার জন্যে সে সরস্বতীর জলে গিয়ে নিজের মাথাটা ঠেসে ধরে। সম্ভবত সে সমানে ভেবেছিল, সে গুরুদেবকে ইহজগৎ থেকে অপসৃত করছে। পাশের লোকেরা যারা স্নানাদি সারতে ব্যস্ত ছিল নদীতে ধরেই নিয়েছিল এ বুঝি রেবন্তের এক যোগাভ্যাস। কেউ তাকে বাঁচাতে আসেনি তাই। কেবল উদ্দালক নামের এক অঙ্কনশিল্পী দৃশ্যটিকে খুব মজার ভেবে পাড়ে বসে সেটিকে একাগ্রচিত্তে এঁকে ফেলেছিল।
ব্যাপারটা যে জনৈক উন্মাদের আত্মহত্যা সেটা বোঝা যায় ‘গুরুচরিত’-এর শেষ ক-টি কথা পড়ে। রেবন্ত লিখেছিল, নিজের অস্তিত্ব নিয়ে এত সংশয়ে থাকা যায় না। আজই গুরুর মুন্ডটা শেষবারের মতো সরস্বতীর জলে চেপে ধরব। অনন্তকালের মতো। আমি বা তিনি কে যে স্বপ্ন তাতেই প্রমাণ পাবে। এ মুঠো আর আমি আলগা করব না।
জনশ্রুতি আছে রেবন্তের হাত তার নিজের গলায় এত জোরে ধরা ছিল যে হাজার চেষ্টাতেও তা আলগা হয়নি। নিজের গলা এভাবে চেপে ধরা চিকিৎসকদেরও অবাক করেছিল। অনেকের মতেই তা নাকি অপ্রাকৃতিক ব্যাপার ছিল।
তা সে যাই থেকে থাকুক এ ঘটনার পর অনেকেই রেবন্তর গুরুহত্যার বিবরণ নিয়ে ভাবতে শুরু করে। যারা রেবন্তর নিজের কথাই মেনে নিল তারা তো সহজেই সমাধান পেয়ে গেল। যারা ওর মৃত্যুর পর ব্রহ্মাচার্যের আশ্রমে গিয়ে সুদক্ষিণার কোমরবন্ধ ও তার মধ্যে গোঁজা ব্রহ্মাচার্যের পদ্যগুলি পেল, তারা নতুন কোণ থেকে ব্যাপারটা সাজিয়ে তুলতে শুরু করল। বলল, রেব কুড়োল দিয়ে সংগমরত পিতা ও কন্যাকে হত্যা করেছে। খুঁজে-পেতে এরা একটা কুড়োলও বার করল রেবন্তের কুলুঙ্গি থেকে। একটা পুরোনো তোরঙ্গ থেকে বার করল কিছু রক্তাক্ত নেকড়ার পুঁটুলি। বলল, এতে বেঁধে ছিন্নভিন্ন দেহগুলি রেবন্ত শকুনকে খাওয়াতে নিয়ে যায়। পরে স্মৃতি হিসেবে এগুলো ফিরিয়ে আনে ঘরে। কিন্তু ওই থেকেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে নদীর জলে হাত ধোয়া ওর একটা বাতিক হয়ে ওঠে। ও রকম একটা বাতিকগ্রস্ত মুহূর্তে ওর নিজেকে নষ্ট করার ইচ্ছে জেগেছিল। তাই ওই মৃত্যু।
