এই যন্ত্রণা কলের একটি বিশেষ অংশ ছিল রেবন্তের মতে ওই সহস্রকোণ পাথরটা। কিছু পাথুরে আয়নার কথাও লেখা আছে। তবে সবচেয়ে গুরুত্ব যেহেতু দেওয়া হয়েছে ঘাতকের মানসিকতাকে আমরা ধরে নিতে পারি ব্রহ্মাচার্য উল্লেখিত এই নিপীড়ন মূলত মানসিক। অনুমানটা আরো জোর পায় এই কারণে যে, এই যন্ত্রের প্রথম এবং শেষ বলি ছিলেন সুধাবতী যাঁর সঙ্গে ব্রহ্মাচার্যের প্রেমদ্বেষের সম্পর্কের ইঙ্গিত আমরা রেবন্তের লেখার বহু ক্ষেত্রেই পেয়েছি।
ব্রহ্মাচার্যের মৃত্যু হয় রেবন্তের হাতে। একথা রেবন্ত নিজেই কবুল করেছে তার ‘গুরুচরিত’-এ। সে-অংশের কিছুটা হালফিলে অনুবাদ আমরা এই সুযোগে পড়ে নিতে পারি।
‘গেল তিন দিন যাবৎ গুরুদেবের বিটলেমি চরমে উঠেছে। অকথ্য গালিগালাজ এবং ননাংরামি ওঁর স্বভাবে দাঁড়িয়েছে। কিছু না খেয়েও লোকটা এত পায়খানা করেন কী করে? তবে এটা এখন সুনিশ্চিত যে, গুরুদেব নির্ভেজাল মহাপুরুষ। উনি নিজের ভাবনার কোনো ছায়াপাত করতে চান না পরবর্তীকালের চিন্তার ওপর। ওঁকে এই অবসরে স্তব্ধ বা হত্যা না করলে অচিরেই ‘অনুসন্ধান ক্রীড়া চেলা কাঠের উনুনের কাজে যাবে। ভবিষ্যতের মানুষের কথা ভেবে ইদানীং আমি গুরুদেবের প্রাণ হরণের কথা চিন্তা করতে বসেছি।
তবে এখানেও একটা সমস্যা থেকে যায়। গুরুদেব হয়তো এখনই কোনো মহৎ আবিষ্কারের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছেছেন। সে-আবিষ্কারের কিছু মৌলতত্ত্ব হাতে না আসা অবধি কাজটা বোধ হয় ঠিক হবে না। তা ছাড়া গুরুদেব বেঁচে না থাকলে গুরুমাতা এবং সুদক্ষিণার সংসারভার আমার ওপরই বর্তাবে। কোনোরকম বৈজ্ঞানিক কি দার্শনিক তত্ত্বের মূলধন হাতে না থাকলে আমার মতো অপদার্থের পক্ষে এই দায়ভার মেটানো মুশকিল। অগত্যা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করব বলেই স্থির করলাম অপদার্থ রেবন্ত এই লেখার পর বেশ কিছুকাল অপেক্ষায় ছিল। ব্রহ্মাচার্যের মতিগতির হালচাল দেখতে দেখতে সময় কাটছিল ওর। অবশেষে ও বিরক্ত হয়ে যায় গুরুর চরিত্রের একটা অস্বাভাবিক ব্যতিক্রম দেখে। নিপীড়ন যন্ত্র সৃষ্টি করতে করতে গুরু হঠাৎ পদ্য লিখতে বসলেন কেন? যে পদ্য কিনা প্রথাসিদ্ধ কাব্যের যোজন দূর থেকে চলে যায়। কালিদাস, অমরু শ্রীভতৃহরি এসমস্ত সৃষ্টি দেখলে মূৰ্ছা যেতেন। এতে পবিত্র সংস্কৃত ভাষার শ্রাদ্ধকর্ম হচ্ছে।
সম্ভবত ব্রহ্মাচার্যের কবিতা দ্বারা নিপীড়িত হয়েই রেবন্ত গুরুকে হত্যা করে। মূঢ় রেবন্ত সেদিন বুঝতেও পারেনি। ব্রহ্মাচার্যের নিপীড়ন যন্ত্রের সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিশীলন ছিল এই কবিতা। সংস্কৃত কাব্যরীতির সমস্ত প্রকরণকে বর্জন করে রত্নাকর ব্রহ্মাচার্য একটা সহজ, গম্ভীর এবং গভীর কবিতার দিকে এগোচ্ছিলেন। প্রতিটি পঙক্তি সেখানে মন্ত্রের মতো সংযত এবং দৃপ্ত। প্রতিটি ভাগ দুঃখ, বেদনা এবং ঈশ্বর তথা জীবনজিজ্ঞাসায় সম্পৃক্ত। একটা মহৎ বৃত্ত যেন সম্পূর্ণ হতে চলেছে। ব্রহ্মাচার্য যেন আভাস পাচ্ছেন একটা মহান অস্তিত্ব এবং সংসারের। তিনি পুনরায় বিশ্বাস করতে চলেছেন জ্ঞান বলে একটি বিশেষ অর্থে কিছু আছে। জ্ঞান বলে তখনই কিছু থাকে যখন জ্ঞাতব্য বিষয় হল স্বয়ং ঈশ্বর কিংবা ঈশ্বরপ্রতিম কোনো দ্বন্দ্ব, কোনো সংশয়, কোনো তিতিক্ষা। রত্নাকর ব্রহ্মাচার্য এক অর্থে জ্ঞান বিষয়টিতে একটা মাত্র যোগ করতে চলেছিলেন। তার্কিকরা যখন ধরেই নিয়েছিলেন জ্ঞান হল কোনো বিষয় সম্পর্কে ধারণা, যা দেখা, শোনা, বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে, ব্রহ্মাচার্য জাহির করতে উদ্যত হলেন, না-জানার সংশয় থেকেই জ্ঞানের সূত্রপাত। জ্ঞান ততক্ষণই যতক্ষণ জানার চেষ্টার মধ্যে যন্ত্রণা, দহন এবং সমর্পণ আছে।
কাজে কাজেই আমরা বড়ো একটা আশ্চর্য হতে পারি না যখন জানি ব্রহ্মাচার্য তাঁর কবিতাগুলি লিখেছিলেন তাঁর নিজের রক্তে। রোজ ভোরে তিনি ছুঁচ দিয়ে বুকের একটা অংশ থেকে রক্ত বার করতেন। টপটপ করে সে-রক্ত নিকোনো মাটিতে পড়ে জমাট হত, পরে খাগের কলমে জল ছুঁইয়ে চুঁইয়ে জমাট রক্ত তরল করে পদ্য লিখতেন। অতিনাটকীয় এই পদ্য লেখার পদ্ধতি কিন্তু আমরা ক্ষমা করে দিই যখন আসল পদ্যগুলি পড়ি। একেবারে অব্যর্থভাবে তখন মনে আসে ফের একজন পাশ্চাত্য পুরুষকে। রিল্কে এবং তাঁর দুয়িনো কবিতাগুলি। রত্নাকর ব্রহ্মাচার্যেরও সেই প্রশ্ন, জীবন কী এই একটা? দ্রুত এবং নশ্বর এই জীবন অনন্তের রূপরেখায় কি বদলাতে পারে? এই একটিমাত্র যাওয়া এবং আসার ইতিহাস কি মোছা যায়? দেবদূত দেখতে চাইলে কী দেখাতে পারে তাঁকে মর্ত্যজন? সাধারণ, নিয়মিত জীবনও এত বিস্ময়কর কেন? মৃত্যুই কি অতঃপর সমস্ত শুরুর শেষ? ব্রহ্মাচার্য একটা আধুনিক নামও দিয়েছিলেন এই কড়চা অঙ্গের কবিতাগুলির। রোজ রোজ লেখা কবিতা।
ব্রহ্মাচার্যকে হত্যা করার পর রেব যত্ন করে অনুসন্ধান ক্রীড়া’-র পান্ডুলিপি নিজের কাছে রেখেছিল। কিন্তু কয়েকটা পদ্য ছাড়া ব্রহ্মাচার্যের কবিতাগুলি সে নষ্ট করে ফেলে। যে দুটো একটা আমরা এখন পড়তে পাই তা সুদক্ষিণার কোমরবন্ধে লুকোনো ছিল বলে রক্ষা পেয়ে যায়। টীকাকারদের মতে সে-সমস্ত প্রেমের কবিতা ব্রহ্মাচার্য সুদক্ষিণাকে লিখেছিলেন। এইসব টীকাকারদের আরও একটা মত আছে। সুদক্ষিণার ভালোবাসা নিয়েই ব্রহ্মাচার্য এবং রেবন্তর মধ্যে আদত ঝগড়া। রেবন্ত যখন আবিষ্কার করল সুদক্ষিণার অনুরাগ দিন দিন পিতার দিকে ঘুরে যাচ্ছে তখনই সে অধৈর্য হয়ে উভয়কে এক সন্ধ্যায় কুড়োল দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে। এবং পৃথিবীকে উলটো বোঝানোর জন্যে তার ‘গুরুচরিত’-এ একটা অন্য বিবরণ খাড়া করে।
