ব্ৰহ্মাচার্য যৌবনে একবার কাশীর পন্ডিত ভবাদিত্যের কাছে শুনেছিলেন যেকোনো বিশেষ কালের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী পুরুষের নাভিমূলই সেই বিশেষ সময়ের বিশ্বের কেন্দ্র। এ ব্যাপারে অবশ্য ভবাদিত্যের মতানৈক্য ছিল কাঞ্চী প্রদেশের পন্ডিত আগ্লালুর সঙ্গে। যিনি বলতেন, কোনো বিশেষ কালের বিশ্বকেন্দ্র সে-সময়ের শ্রেষ্ঠ রূপসীর যোনিতে। ব্রহ্মাচার্য ম্লানচিত্তে সে-সমস্ত শুনেছেন। কিন্তু কিছুই জানেননি। তবে জনশ্রুতি আছে আগ্লালুর শিষ্য চেল প্রদেশের যুবরাজ বিশ্বের কেন্দ্র আবিষ্কার করার মানসে অন্তত একশো পরম রূপসী যুবতীর সতীচ্ছেদ করেন। এবং শেষপর্যন্ত পোর্তুগিজ জলদস্যু গোলায়ার শরীরে সে-কেন্দ্র খুঁজে পান। কিন্তু এ মতটুকুর সপক্ষে বলার কিছুই নেই কারণ কোচিনের অদূরে নোঙর করা গোলায়ার জাহাজ থেকে যুবরাজ জীবিত ফেরেননি। অষ্টাদশ শতকে গোলায়ার স্মৃতিকথা যখন পিয়ের লুইয়ের হাতে ফরাসিতে অনূদিত হয় তখনই কেবল পৃথিবীর লোক জানতে পারে গোলায়ার জীবনের প্রথম এবং শেষ সংগম ভারতীয় এক যুবরাজের সঙ্গে। যার পুরুষাঙ্গ এবং জিহ্বা ছিল অসম্ভব রকম দীর্ঘ। সে-যুবরাজ আচমকা বজ্রাঘাতে মারা যান সোলায়ার জাহাজ থেকে নিজের রণতরীতে ফিরে যেতে যেতে।
প্রৌঢ় বয়সে ব্রহ্মাচার্য ফের ভাবতে বসলেন বিশ্বব্রহ্মান্ড এবং জীবের যৌনজগতের আণবিক কোনো সম্পর্ক আছে কি নেই। পঠনপাঠন তাঁর গোল্লায় গেল, ছাত্রদের আশ্রম থেকে মেরে তাড়াতে লাগলেন। সতী স্ত্রী সুধাবতীকে অহর্নিশি উলঙ্গ করে দেখতে লাগলেন নারীর দেহ আসলে কী?
ব্ৰহ্মাচার্যের একটা চমৎকার পাথর ছিল। যার সহস্র কোণ দিয়ে আলো ঠিকরে পড়ে ঘর আলো করত। সম্ভবত জীবনের এই সময়টায় ব্রহ্মাচার্য আলোর বিশ্লেষণ নিয়েও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। রেবন্তের ‘গুরুচরিত’-এ উল্লেখ আছে ব্রহ্মাচার্য ওই আলোক প্রস্তর দিয়ে সুধাবতী এবং যুবতী কন্যা সুদক্ষিণার যোনি অধ্যয়ন করতেন। স্ত্রী কন্যা উভয়েরই আপত্তি ছিল এই বীভৎস পরীক্ষানিরীক্ষায়। কিন্তু কট্টর শাস্ত্রজ্ঞ ব্রহ্মাচার্য মেয়ে লোকের আপত্তি শুনতেন না।
ঠিক এই সময় কাশীর রাজা যখন ব্রহ্মাচার্যকে উপঢৌকন পাঠানোর প্রস্তাব দেন, ব্রহ্মাচার্য দশটি কুমারী প্রার্থনা করেন। বিরক্ত এবং বীতশ্রদ্ধ কাশীরাজ এরপর পন্ডিতের মুখদর্শন অবধি বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
দিকে দিকে রটে গেল রত্নাকর ব্রহ্মাচার্য পাগল। কেউ কেউ বলল সেয়ানা পাগল। কেউ কেউ বলল বদমায়েশ। দেখতে দেখতে ব্রহ্মাচার্যের আশ্রম বন্ধ হয়ে যায়। একমাত্র পড়ে রইল রেবন্ত। ঘরে স্ত্রী কল্যাণী ততদিনে পালিয়ে গিয়েছে দুষ্ট বীরেন্দ্রর সঙ্গে। ব্রহ্মাচার্য দিনরাত ধ্যান করেন, স্ত্রী কন্যা ঘাঁটেন আর মনে যা আসে তাই লেখেন। গুরুকে নিয়ে জীবনচরিত লেখে রেবম্ভ, অতিরিক্ত কামতাড়িত হলে সহবাস করে সুদক্ষিণার সঙ্গে।
ব্রহ্মাচার্যের সেইসব এলোমেলো লেখা ভারতীয় শাস্ত্রে বা সাহিত্যে অদ্বিতীয়। পাস্কালের ‘পাঁজে’ দেকার্তের ‘ডিসকোর্স অন মেথড’ কিংবা এক বিশেষ অর্থে নিৎসের ‘বিষণ্ড গুড অ্যাণ্ড ইভল’-এর সঙ্গেই তার তুলনা চলে। বহু আধ্যাত্মিক এবং বৈজ্ঞানিক তত্ত্বের সূত্র এবং আলোচনা তাতে আছে, যদিও কোনোটারই কোনো উত্তরোত্তর বিশ্লেষণ, ব্যাখ্যা বা উত্তরণ নেই, কারণ ব্রহ্মাচার্য ধরেই নিয়েছিলেন মানুষ কিছুই জানতে পারে না। জানা সম্ভব না। শুদ্ধ বুদ্ধিসম্পন্ন লোকেরা এক-একটা জটিল সমস্যা দিয়ে নিজেদের বুদ করে রাখেন, কারণ সেটা একটা মস্ত খেলা। সমস্ত ক্রীড়ার শিরোমণি, অনুসন্ধান।
ব্রহ্মাচার্য তাঁর সেই এলোমেলো কড়চার নাম দিয়েছিলেন ‘অনুসন্ধান ক্রীড়া। কিংবা এ নাম হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর রেবন্তরই দেওয়া। কিন্তু নামটা ভারি আশ্চর্য রকমে সংগত, এবং আধুনিক। সংগত কারণ সমস্ত লেখাটাই খেলার ছলে। আধুনিক, কেবল ভাবনার চাকচিক্যেই নয় রসেও। অনুসন্ধান ক্রীড়া’ বই-এ যৌনসংগমের তেরোটা প্রতিবেদন আছে যা বোকাচ্চিও, আরেতিনো বা কাসানেভাকে মুগ্ধ করতে পারত। অথচ এই তেরোটা বিবরণই ব্রহ্মাচার্য তাঁর এবং সুধাবতীর ক্রিয়াকান্ড থেকে ফলিয়েছেন। হালকা রসের এই শিখর থেকে কী করে আমাদের ঈশ্বর গুপ্তে পতন হল তা ভাবতেও অবাক লাগে।
‘অনুসন্ধান ক্রীড়া’ কিন্তু শেষপর্যন্ত সবচেয়ে নিকট হয়ে পড়ে গোগোলের ‘ডায়েরি অব এ ম্যাড ম্যান’-এর। কড়চার অন্তভাগের উনত্রিশটা বয়ানে ব্রহ্মাচার্যের উন্মাদনা স্পষ্ট। ব্রহ্মাচার্য স্থানে স্থানে সুধামতীকে মা ডাকছেন। শিশু হয়ে ফিরে যেতে চাইছেন ওঁর যোনিতে। গভীর বিশ্বাস জাগছে আসলে তিনিই কাশীরাজ বৈকুণ্ঠনাথ। চক্রান্তের বশে আজ তিনি ব্রাহ্মণ পন্ডিত আর পিরিলাল কাহার নামের পথেও ভিখারিটি রাজা।
ব্রহ্মাচার্য নিজের দাবির সপক্ষে খাড়া করেছেন তিনটি যুক্তি। এক, তাঁর রাজকীয় হস্তরেখা। দুই, একটা স্বপ্ন। তিন, একটা স্মৃতি। সে-স্মৃতিতে আছে কুমার রত্নাকর একটা বাঁকানো চাকু দিয়ে তাঁর আটজন পূর্বপুরুষের সুন্দর সুন্দর ছবিগুলি কেটে কেটে তছনছ করছেন। কিন্তু নবম পুরুষ, মানে নিজের ছবির সামনে এসে থমকে দাঁড়াচ্ছেন। ছবিটা ওঁর না। বৈকুণ্ঠনাথের!
ভাগ্যিস এ লেখার খাতায় বৈকুণ্ঠনাথের হাত পড়েনি। নিশ্চিত বেঘোরে প্রাণ যেত ব্ৰহ্মাচার্যের। কিন্তু তা বলে ব্রহ্মাচার্যের মৃত্যুটা কম অদ্ভুত নয়। সেটা আমরা জানতে পারি রেবন্তের লেখায়। ব্রহ্মাচার্য একটা মারণাস্ত্র আবিষ্কারের কথা লিখেছেন যাতে ঘাতক নিপীড়িতের সমস্ত যন্ত্রণা অর্ধেক কল্পনা এবং অর্ধেক অঙ্কের বলে হিসেব করতে পারেন। যন্ত্রণা দেওয়াটাও যে একটা বিশেষ শিল্প এই যন্ত্রের পরিকল্পনা তা প্রমাণ করে। ব্রহ্মাচার্য লিখেছেন, সংগমক্রিয়া যেমন একই সঙ্গে নর এবং নারীকে তৃপ্তি দেয় এই যন্ত্র একই দুর্ভোগে আবদ্ধ করবে ঘাতক এবং নিপীড়িতকে। উপরন্তু ঘাতক পল পল অনুভব করতে পারবেন তাঁর নিপীড়িতের যন্ত্রণা।
