মেয়েটি কীরকম ম্লান হাসল, কিছু বলল না। জোজি ফের জিজ্ঞেস করল, কই, বললে না তো? মেয়েটি এবার ফট করে খাটে সোজা হয়ে বসল আর বলল, আমি পুতুল বানাই।
একটা পাঁচ বছর পাঁচ মাস বয়সের মেয়ের কাছে এর থেকে রোমাঞ্চকর খবর পৃথিবীতে নেই। জোজি এক মুহূর্তের মধ্যে ভুলে গেল যে, এই মেয়েটিকে একটু আগে ও ভূত বলে সন্দেহ করেছিল। যে পুতুল বানায় সে কি ভূত হতে পারে? বড়ো জোর পরি। জোজি এবার উঠে ওর খাটের পাশের মোড়াটায় গিয়ে বসল আর বলল, কীভাবে পুতুল বানাও তুমি? একটু দেখাবে? কিছু এনে দেব?
না, না, না, ও সব কিছু লাগবে না। আমি তোমায় খালি হাতেই দেখিয়ে দিচ্ছি বলে মেয়েটি নিজের মাথার সব চুল এক ঝটকায় ছিড়ে নিয়ে কুন্ডলী পাকাতে লাগল। অবাক হয়ে গিয়ে জোজি বলল, ও মা! তোমার সব চুল–
-ওটা চুল না, পরচুলা।
—কিন্তু ওই উইগ দিয়ে পুতুল বানালে তুমি, বাড়ি ফিরবে কী করে?
মেয়েটি কোনো উত্তর করল না। শুধু পরনের নীল শিফন শাড়িটা পড়পড় করে ছিড়ে পুতুলের পোশাক বানাতে লাগল। তারপর নিজের বাঁ-হাতের চামড়া ও মাংস খুলে পুতুলের বাঁ-হাত বানিয়ে দিল। নিজের বাঁ ও ডান পা খুলে-জোজি শুধু অবাক হয়ে দেখছে। মেয়েটি নিজের যাবতীয় বেশভূষা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দিয়ে ঠিক নিজের মতো ও নিজের সাইজের পুতুল বানিয়ে ফেলল। নিজের মুন্ডুটা ছিড়ে লাগিয়ে দিল পুতুলের মাথায় আর সব শেষে নিজের কাজের ডান হাতটা জুড়ে দিল পুতুলে। তখন জোজির সামনে একটা মানুষের সাইজের মস্ত পুতুল, কিন্তু মানুষটা কোথাও নেই।
এবার সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেছে জোজি। ও দুদ্দাড় করে পা চালিয়ে নেমে এল পার্লারের একতলায়। আর ততক্ষণে সেখানেও একটা খেলা শুরু হয়ে গেছে। বিনু খদ্দেরের মুখের মাস্ক যত খোলে সেখানে চামড়ার বদলে ফুটে ওঠে হাড়। কঙ্কালের হাড়। এভাবে একের পর এক পোচ তুলতে তুলতে সুন্দরীর মুখটার জায়গায় ফুটে উঠল নিরেট এক কঙ্কালের মুখ! শেষে চোখ দুটোর ওপর থেকে খসে পড়ল তুলো আর বেরিয়ে এল এক জোড়া গর্ত, অন্ধকারে নিরেট। কঙ্কালটা এরপর ব্যাগ থেকে দুটো একশো টাকার কড়কড়ে নোট বার করে টেবিলে রাখল আর গটগট করে হেঁটে উঠে গেল দোতলায়। সেখানে সদ্য সমাপ্ত নীল শাড়ি পরা পুতুলটা কোলে তুলে নিল সে আর ঠিক সেভাবেই গটগট করে হেঁটে বেরিয়ে গেল পার্লার থেকে। কাচের দরজা ঠেলে বেরোবার মুখে ঈষৎ অনুশোচনায় একবার ঘুরে তাকাল জোজির দিকে আর তারপর মিলিয়ে গেল বাইরের অন্ধকারে। কঙ্কালের কোলে চড়ে পুতুলটাকে চলে যেতে দেখে চোখে জল এসে গেল জোজির। পুতুলটা ভীষণ মনের মতো হয়েছিল ওর!
জোজির এইসব ভুতের গল্পের পাশে আমার কোনো গল্পই দাঁড়ায় না বলে এখন ভেতরে ভেতরে বেশ দমে থাকি। আবার খুব আনন্দও হয়। কোন বাবা মেয়ের মুখে এত সুন্দর সুন্দর ভূতের গল্প শুনতে পায়?
বিশ্বের কেন্দ্রে একজন পুরুষ
তা বেশ কয়েকশো বছর আগে হিন্দু পন্ডিত রত্নাকর ব্রহ্মাচার্য ঘোষণা করেছিলেন জ্ঞান বলে কোনো বস্তু নেই। আসলে মানুষ কিছুই শেখে না। শেখা যায় না। চারপাশের বিশ্বজগতে সমস্ত কিছুই ঘটনা, ঘটে যাচ্ছে। তার কিছু কিছু দেখে-শুনে কেউ কেউ চ্যাঁচাচ্ছে, আমি এই দেখেছি, আমি এই জানালাম।
ব্রহ্মাচার্যের শিষ্যকুল গুরুর এই সমস্ত বাতুল কথা শুনে হতাশ হয়ে পড়ল। অন্যান্য জ্ঞানপীঠের পড়ুয়াদের সঙ্গে এবার ওদের কথা বলাই দুষ্কর হবে। পাঠশালার সামান্য ছাত্ররাও জানে—দেখা, শোনা, বিশ্বাস করা, এসমস্ত থেকেই জ্ঞানের উৎপত্তি। প্রতিটি মানুষ তার সীমার মধ্যে কিছু না কিছু জানছে প্রতিনিয়ত। আর ব্রহ্মাচার্য বলেন কিনা জ্ঞান বলে কোনো বস্তু নেই। আরে এতশত যে দিনরাত ঘটছে চোখের সামনে সেও তত জ্ঞানের বিষয়।
কেউ কিন্তু সে-সময় ব্রহ্মাচার্যের আসল যন্ত্রণাটুকু বুঝতে পারেনি। বোঝা সম্ভবও ছিল না। ব্ৰহ্মাচার্য বিশাল ব্রহ্মান্ড এবং গভীর গহন মনোজগতের কথা ভেবে নিরাশ হয়ে পড়েছিলেন। শিষ্য রেবন্তকে বলেছিলেন, অমরু এক জীবনে নারী এবং অপর জীবনে পুরুষ হয়ে প্রেমের আগে-পিছের কিছু ঘটনা দেখলেন। উভয় লিঙ্গের জীবনে সংগমের বেদনা হয়ত কিছু অনুভব করলেন। কিন্তু আরেক পদ এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করলে অমরু নীরব। তাহলে তুমি শেষ অবধি জানলেটা কী?
নববিবাহিত যুবক রেবন্ত চুপই রইল। ইদানীং সে বড়ো পড়াশুনায় ব্যস্ত। স্ত্রী কল্যাণীর প্রতি খুব একটা খেয়াল দিতে পারে না। কানাঘুষো শোনে ব্রহ্মাচার্যের ফাঁকিবাজ শিষ্য বীরেন্দ্রের প্রতি তার নাকি অনুরাগ জন্মেছে। গোধূলি লগ্নে ওরা নাকি দেখাসাক্ষাৎ করে সরস্বতী নদীর ধারটায়।
একদিন রেবন্ত নিজেকেও প্রশ্ন করেছে, আমার কি কোনো ভালোবাসা নেই?
ব্রহ্মাচার্যের দ্বিতীয় চিন্তাটা বড়োই ভয়ংকর। এই বিশাল বিশ্বজগতের কোনো কেন্দ্রবিন্দু আছে কিনা জানার উপায় কী? অঙ্কশাস্ত্রও যদি তার হদিশ না দেয় তবে জ্ঞানের মূল্যই বা কী?
আমরা যারা বড়ই আধুনিক এবং বড়ই জ্ঞানী, জানি শয়ে-শয়ে বছর ধরে এই প্রশ্ন তোলপাড় করেছে পাশ্চাত্যের চিন্তাকে। বিশ্বজগতের কেন্দ্র নিয়ে চিন্তার একটা বিরাট ইতিহাস সেখানে আছে। অবশেষে একটা চমৎকার বাক্যে মহাজ্ঞানী পাস্কাল বিষয়টিকে বর্ণনা করেছিলেন। বললেন, এই ভয়াবহ বিশ্বের কেন্দ্র সর্বত্র, কিন্তু তার পরিধি কোথাও নেই। পাস্কাল তাঁর সেই অনুপম বাক্যে ভয়াবহ কথাটা কিন্তু বেশ জোরের সঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন। বিস্ময়ও যেখানে পৌঁছোয় না তা নিশ্চয়ই ভয়াবহ।
