মেয়েদের স্বাভাবিক কৌতূহল বোধে জিজ্ঞেস করে বসল, সেই হেয়ার স্টাইলটা কী?
মহিলা বললেন, বুফান।
জোজির মা বলল, সেজন্যই কি আজ বুফান…
কথা শেষ করতে দিলেন না মহিলা। কথার মধ্যে কথা ঢুকিয়ে বলতে লাগলেন, কাল আমি বুফান করতে ও দাঁত খিঁচিয়ে উঠে বলল, এক্ষুনি খোলো ওই খোঁপা। আমি মাথায় হাত চাপা দিয়ে বললাম, মনে করো না আমি কণিকা নই, শর্মিষ্ঠা। আর তৎক্ষণাৎ ও পরদার রডটা খুলে নিয়ে বলল, তা হলে শর্মিষ্ঠার মাথায় যেমন পড়েছিল রডের বাড়ি তেমন পড়ক তোমার মাথায়। আর উঃফ!
মহিলার এই ‘উফ! চিৎকার আচমকা কাঁপিয়ে দিল গোটা পার্লারটাকে। ভয়ে চমকে উঠে ওই অন্ধকারে জোজি, জোজির মা, বিনু, বেবি সবাই সবার দিকে ছুটে গেল সঙ্গ পাবার জন্য। আর ঠিক তখনই ঘরে আলো জ্বলে উঠল এবং সবাই চোখ বড়ো বড়ো করে দেখল যে, বেসিনের চেয়ারে কেউ নেই। বস্তুত, সারা পার্লারেই মহিলা নেই। কিন্তু সাদা বেসিন ভেসে যাচ্ছে রক্তে আর তার ধারে ধারে ছড়িয়ে আছে রক্তে চিট গোছা গোছা কালো চুল। জোজির মা তার হাতের দিকে চোখ ফেলতে দেখতে পেল সেখানে বেশ খানিকটা রক্তমাখা চুল লেপটে আছে। ওরা সকলে সকলের মুখ চাওয়াচাওয়ি করল কিছুক্ষণ, তারপর পার্লারের কাচের দরজার বাইরে চোখ চালাতে দেখতে পেল ওই মহিলাই যেমনটি এসেছিলেন ঠিক সেই চেহারাতেই নীল মারুতি স্টার্ট দিয়ে নিঃশব্দে মিলিয়ে যাচ্ছেন ঝিরঝিরে বৃষ্টি আর অন্ধকারে।
পরদিন সকালে বিখ্যাত শিল্পপতি নরেশ সান্যালের পুত্রবধূ কণিকা সান্যালের মৃত্যুর খবর বেরোল আনন্দবাজারে। কারনানি হাসপাতালে মৃত্যু, সময় সাড়ে ছটা। অর্থাৎ যখন কণিকা কাচের দরজা ঠেলে এসে ঢুকেছিলেন পার্লারে।
তো এই হচ্ছে জোজির প্রথম ভূতের গল্প আমার নিজের ভাষায় বানিয়ে তোলা। জোজির দ্বিতীয় ভূতটিও যুবতী, বয়স হয়তো আরও কম, সুন্দরীও বটে (জোজির মায়ের পার্লারের সব খদ্দেরই সুন্দরী!) এবং এসেছিল মুখের সৌন্দর্যচর্চায়, যাকে বলে ফেসিয়াল। আর এসেছিল সন্ধ্যেবেলাতেই কারণ ওই সময়টাতেই জোজি পড়াশুনো সেরে পার্লারে যাওয়ার অনুমতি পায়। মেয়েটি এসে বসেছিল একটা আয়নার সামনে, পিছনে একটা সোফায় বসে জোজি ওকে আয়নার মধ্যে থেকে দেখছিল। ততক্ষণ মেয়েটির মুখে ফেসপ্যাক লাগিয়ে ফেলেছে বিনু। সাদা মাস্কে মেয়েটিকে যেন একটা ভূতের মতো লাগছে, ভাবছিল জোজি। মনে মনে একটু হাসিও পাচ্ছিল ওর। মেয়েটিও চোখের ওপর চাপা দেওয়া তুলো সরিয়ে আয়নার মধ্য দিয়ে একবার জোজির দিকে তাকাল আর অমনি ভয়ে কাঠ হয়ে গেল জোজি। কারণ ও স্পষ্ট দেখল মেয়েটির তখনকার সাদা আইসক্রিমের মতো মুখের মতো চোখ দুটোও বিলকুল সাদা। তাতে কোনো মণি নেই।
মণি ছাড়া চোখ দেখেই জোজি বুঝল দারুণ একটা গন্ডগোল বাধতে চলেছে। ও চুপি চুপি উঠে মা-র পাশে গিয়ে ফিসফিস করে বলার চেষ্টা করল। কিন্তু মা তখন এত ব্যস্তসমস্ত যে, তার জোজির কথা শোনার সময় নেই। জোজির মা বলল, জোজি, তুমি চুপ করে সোফায় বসো নয়তো তোমায় বাড়ি পাঠিয়ে দেব। জোজি যে কিছু একটা সন্দেহ করছে যুবতী খদ্দেরটা হয়তো তা আঁচ করতে পেরেছিল কারণ ততক্ষণে ফের ও ওর চোখের তুলোর পাশ থেকে আয়নার পিছনের দৃশ্যটা দেখতে লাগল। এবং সেই চাহনিও জোজির চোখ এড়িয়ে গেল না। মেয়েটি এবার জোজির উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, খুকি, তোমার নাম কী? জোজি খুব অনিচ্ছুকভাবে বলল, জোজি।
বাঃ! কী সুন্দর নাম।
ঠিক এই সময় বাড়ি থেকে ডাক এল দুধ খাওয়ার জন্যে। কিন্তু পার্লার ছেড়ে যাবার বিন্দুমাত্র বাসনা নেই জোজির তখন। দারুণ সন্দেহজনক কিছু একটার গন্ধ পেয়েছে জোজি। ও বাড়ির কাজের মেয়ে পাঞ্চালীকে বলল, তুমি যাও, আমি পরে যাচ্ছি। আমি ওই দিদিটার মাস্ক ভোলা হলে যাব। বলে ও আঙুল দিয়ে সিটে বসা যুবতী খদ্দেরটিকে দেখাল। ওর কথা শুনে রীতিমতো প্রফুল্ল মেয়েটি বলল, ও থাক না, আমার চেহারা কী বদলায় দেখতে চায় যখন।
বলা যেতে পারে মেয়েটির জন্য জোজি সে-যাত্রায় রক্ষে পেয়ে গেল। আরও আধ ঘণ্টা পার্লারে থাকার পারমিশন। কিন্তু তার মধ্যে কি মেয়েটির মাস্ক ভোলা হবে? কারণ বিনু তো তখনও একটার পর একটা প্রলেপ দিয়ে যাচ্ছে মুখে। মাস্ক কতটা পুরু হল দেখার জন্য জোজি ব্যগ্র হয়ে মেয়েটির চেয়ারের পাশে চলে গেল। যেতে গিয়ে একটা মৃদু ধাক্কাও লাগল বিনুর সঙ্গে। মৃদু বকুনির সুরে বিনু বলেও উঠল, জোজি, তুমি এদিকে এসো না, সোফায় গিয়ে বসো। এই ভর্ৎসনা জোজির পছন্দ হয়নি মোটেই, ও রাগে গজগজ করতে করতে পার্লারের দোতলায় উঠে গেল। এটা মেজানিন ফ্লোর, সেখানে আরও কিছু আয়না, সিট এবং একটা ছোট্ট খাটও আছে। এই খাটে মাঝে মাঝে জোজি গিয়ে শোয়, আর কমিকস পড়ে। ও ওপরে উঠে আলো জ্বেলে খাটের দিকে পা বাড়াতেই দেখল নীচের মেয়েটাই ওখানে আরামে শুয়ে ওর দিকে মিটি মিটি হাসছে। জোজি বুঝতে পারল না ও কী করবে? কী করা উচিত। এই মেয়েটি কি নীচের মেয়েটির যমজ বোন? নাকি—
জোজি কিছুই করল না। কেমন অবশ হয়ে গেছে ওর পা দুটো। মেয়েটিকে দেখার জন্য একটা ইচ্ছে প্রবল হচ্ছে, সেই সঙ্গে জানতেও ইচ্ছে করছে নীচের মেয়েটি তা হলে কে? একটু ঘোরে পড়ে গিয়ে জোজি একটা বেঁটে বেতের মোড়াতে বসে পড়ল। ওর চোখ কিন্তু খাটে শোয়া যুবতীটির দিকে। সত্যি, কী সুন্দর মুখ মেয়েটির! জোজি জিজ্ঞেস না করে পারল না, তুমি কী করো?
