জোজির ভূতরা কিন্তু খুব স্পষ্ট ব্যাপার, স্মৃতির বা অনুভূতি কিংবা শুধু ভয়ের ভাবের ওপর নির্ভরশীল নয়। জোজি তাদের স্বচক্ষে দেখে, বোঝে, ভয় পায় বা পায় না। এবং এই সব ভূতের সঙ্গে দেখা হয় ওর মা-র বিউটি পার্লারে। সেজন্য ভূতদের আমি নাম দিয়েছি বিউটি পার্লারের ভূত। এদের সংখ্যাও এত বেশি যে, নামে এদের পরিচয় করাতে গেলে উদোর পিন্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপানোর সম্ভাবনা আছে। তাদের কাহিনি দিয়েই তাদের মনে রাখার চেষ্টা করেছি আমি। তাও সব মনে রাখতেও পারি না। কখনো ভুলে যাই, কখনো আবার চমৎকার মনে পড়ে যায় তাদের। কোনটার পর কোন ঘটনা এই আগে-পরের ব্যাপারটা মাঝেসাঝে গুলিয়ে যায় জোজির, কিন্তু ঘটনাগুলো ও কিছুতেই ভোলে না। কারণ সে-সব যে তার চোখে দেখা!
প্রথম ঘটনাটা এক সন্ধ্যায়। বর্ষণমুখর সন্ধ্যা। পড়াশুনো সেরে জোজি বিউটি পার্লারে মা-র কাছে এসে বসেছে। পার্লারে খদ্দের নেই, লোক বলতে জোজি, জোজির মা, দু-জন বিউটিশিয়ান বিনু আর বেবি। খদ্দের নেই দেখে জোজির মা, বিনু আর বেবি জিরোচ্ছে, জোজি একটা মেয়েদের ম্যাগাজিন খুলে কটা বাচ্চার ছবি দেখছে। হঠাৎ একটা নীল মারুতি গাড়ি এসে দাঁড়াল পার্লারের সামনে আর তার থেকে এক পরমাসুন্দরী মহিলা নেমে ছুটে এসে ঢুকলেন পার্লারে। এসেই বললেন, ভাগ্যিস পার্লারটা খুঁজে পেলাম। অনেকদিন ধরেই ভাবছি আসব আসব। আসা হচ্ছিল না। তা আজ আমাদের বিয়ের অ্যানিভার্সারি তাই ভাবলাম আজ এখানে এসে পড়তেই হবে। তাও কী বিচ্ছিরি বৃষ্টি নামল মাঝপথে।
খদ্দের দেখে উঠে দাঁড়িয়েছিল জোজির মা, বিনু আর বেবি। জোজির মা এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, কী করবেন আপনি? মহিলা নিজের খোঁপা খুলতে খুলতে বললেন, শ্যাম্পু করে, ভালো করে একটা বুফান করে দিন চুলের। আর বলেই গিয়ে বসে পড়লেন শ্যাম্পু করার ওয়াশ বেসিনে। আর বসে পড়েই ফের বললেন, কাজটা কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি সেরে দিতে হবে। ঠিক আটটায় আমাদের ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি পার্টি শুরু হচ্ছে। আই মাস্ট বি দেয়ার বাই সেভেন থার্টি।
জোজির মা বিনুকে বলল, তুই হেয়ার ড্রেসিং-এর জিনিস নিয়ে তৈরি হ, আমি চট করে শ্যাম্পু করে দিচ্ছি। জোজির মা-র হাতে শ্যাম্পু খোলে খুব চমৎকার, সময়ও লাগে কম। এই বলে দামী হার্বাল শ্যাম্পু ছড়িয়ে জোজির মা যেই না মহিলার চুল ঘষতে শুরু করেছে অমনি লোডশেডিং। অন্ধকার হতেই জোজি, জোজির মা, বিনু আর বেবি সবাই ‘হায়! হায়!’ করে উঠল। ভদ্রমহিলার এত তাড়া, তার মধ্যেই কিনা হতচ্ছাড়া লোডশেডিং! মরণ কাকে বলে। নতুন পার্লারে এয়ার-কণ্ডিশনার থাকলেও জেনারেটার বসানো হয়নি এখনও। আলো নেই দেখে রীতিমতো লজ্জিতভাবে জোজির মা বলল, আপনি কি একটু অপেক্ষা করবেন? আমরা দেখি মোমবাতি জ্বেলে আপনার কাজটা সেরে দিতে পারি কি না।
মহিলার কিন্তু কোনো উচ্চবাচ্য নেই। উনি কি মাথায় শ্যাম্পু ঘষার আরামে ঘুমিয়ে পড়লেন? জোজির মা ফের বিনীতকণ্ঠে কী একটা বলল, কিন্তু তাতেও কোনো উত্তর নেই মহিলার। জোজির মা তখন বেসিনের টেলিফোন শাওয়ারটা দিয়ে ওঁর মাথাটা ধুয়ে দিতে উদ্যোগ করল, কিন্তু যত ধোয় ততই যেন হাতটা চ্যাটচেটে হয়ে যায়। জোজির মার মনে বেশ সংশয় হল, ফলে বলে বসল, ম্যাডাম, আপনার চুলে বেশ আঠা হয়েছে। আরেকটু শ্যাম্পু করা দরকার। আর তখনই, এতক্ষণ পর, কথা বললেন মহিলা—না, না, ওটা চুলের আঠা নয়, রক্ত।
আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল জোজির মা, সে কী! রক্ত কোত্থেকে? মহিলা বললেন, আমার স্কালের বাঁ দিক থেকে। ততক্ষণে সমস্বরে চেঁচিয়ে উঠেছে বিনু আর বেবিও, কী করে হল? মহিলা বেশ নিরুত্তাপভাবে বললেন, মাথায় রডের আঘাতে। জোজির মা এই শুনে মহিলার চেয়ারের পিছন থেকে ছিটকে দূরে গিয়ে দাঁড়াল। কিন্তু ওর হাতে উঠে এসেছে চিটচিটে একগুচ্ছ চুল। তা সে যতই হাত ঝেড়ে ফেলতে চায় ততই যেন হাতে মাখামাখি হয়ে লটকে যায়। তখন বিরক্ত হয়ে প্রায় বলে বসল জোজির মা, আর আপনি এই অবস্থাতে হাসপাতালে না গিয়ে চুল বানাতে এসেছেন?
অমনি এক দমকা খিলখিলে হাসি ভেসে এল বেসিনের পাশ থেকে। কাচের গেলাস মাটিতে পড়ে চৌচির হলে যেমন ধ্বনি হয় ঠিক তেমন কিছু। তারপর হাসি থামিয়ে মহিলা ফের শান্ত কণ্ঠে বললেন, আমি তো সুখলাল কারনানি হসপিটালেই আছি। বিয়ের তারিখটা ফসকে যাবে ভেবে প্রায় জোর করে কেটে বেরিয়ে এলাম। আই কান্ট মিস দিস ডেট। ইটস টু প্ৰেশাস ফর মি।
বিস্ময়ে বোবা হয়ে যাওয়ার কথা জোজির মা-র, তবু সে অঢেল মনের জোর সংগ্রহ করে বলল, ওই রডের বাড়ি কে মেরেছিল আপনাকে? মহিলা নিরুত্তাপ কণ্ঠে বললেন, আমার স্বামী।
-আপনার স্বামী! কেন?
—ওই বাচ্চা মেয়ের সামনে সেটা কি বলা যাবে?
এ কথা উঠতেই জোজি প্রতিবাদ করে উঠল, আমি মোটেই বাচ্চা মেয়ে নই। আর আমি তোমাদের কোনো কথাই শুনছি না। যা খুশি বলতে পারো তোমরা।
কিছুক্ষণের নীরবতা নেমে এল অন্ধকার পার্লারে। তারপর ফের ভেসে উঠল মহিলার সেই উদাসীন কন্ঠ। উদাসীন কণ্ঠ ঠিকই, কিন্তু এবার তার কোথায় যেন একটা ঈষৎ বেদনার ছোঁয়া। তিনি বললেন, আমি এক বিশেষ ধরনের চুলের সাজ করলেই ও ভয়ানক রেগে যেত কারণ তাতে ওর এক পূর্বেকার বান্ধবীকে মনে পড়ত। সে-মেয়ের পেটেন্ট ছিল ওই হেয়ার ডু। ওকে খেপাতে হলে ওই চুলের স্টাইলটা করতাম আমি।
