জোজির ভূতগুলোতে আসার আগে আমার নিজের ছেলেবেলার ঘটনা দুটো বলি। দুটোই সত্যি ঘটনা, সে-সময় খুব গা ছমছমও করেছিল এবং এর কোনোটিতেই জোজির গল্পের রক্তারক্তি, কঙ্কালনৃত্য নেই। আমার এই কাহিনি দুটো আমি কোনোদিন জোজিকে শোনাইনি কারণ ওর অতি অবশ্য মনে হবে, এমা! এতে ভূত কোথায়? বাবা যে কী সব আবোল তাবোল বলে।
যাকগে, আমার কথায় আসি। তখন আমার বছর বারো বয়স। ভীষণ নেশা জমেছে ভূত আর ডিটেকটিভ গল্পে। হঠাৎ করে আবিষ্কার করে বসেছি দাফনে দু-মোরিয়ের নামের লেখিকাকে। আমার ইস্কুলের পড়াশুনো ছাড়াও যত্ত যা গল্প-কবিতা পড়া সব বাড়ির ছাদের চিলেকোঠায়। ছাদখানা প্রায় ফুটবল গ্রাউণ্ডের সাইজের আর তারই এক পাশে ফুট আষ্টেক উঁচু এই চিলেকোঠা। একসময় দাদার দেড়শো, দুশো পায়রার আস্তানা ছিল এই কোঠায়, পরে বাবা মারা যেতে দাদা একটা একটা করে পায়রা উড়িয়ে দিচ্ছিল নিরুদ্দেশে। তাদের কিছু কিছু আবার ফিরে ফিরে আসত, বাড়ির মায়া কাটাতে পারত না। চিলেকোঠায় আমি যখন পড়তে যাওয়া শুরু করলাম তখন পায়রার সংখ্যা নেমে নেমে পনেরোয় এসে ঠেকেছে। এদের দু-চারটের কাজ ছিল দাদার প্রেমপত্র নিয়ে ওর বান্ধবী নন্দিনীদিকে পৌঁছে দেওয়া, বাকিরা ছাদের অলংকার হয়ে সারাদিন ছোলাদানা ঠুকরে বেড়াত। সন্ধ্যেবেলা আমি যখন লাইট জ্বেলে বই নিয়ে বসতাম ওরা এক্কেবারে নিশ্ৰুপ হয়ে থাকত ঘুমে। বিশাল অন্ধকার ছাদে একলা থাকলে যে গা শিরশিরে অনুভূতি তার কিছুটা রদ হত আমার ওই জ্যান্ত, ঘুমন্ত জীবগুলোর কথা ভেবে।
তো এই পরিবেশে এক সন্ধ্যায় খুলে বসেছি দাফনে দু-মোরিয়েরের সদ্য পাওয়া ‘কিস মি এগেন স্ট্রেঞ্জার’ বইটা। আর সবে পড়ে উঠেছি বইয়ের প্রথম গল্প ওই ‘কিস মি এগেন স্ট্রেঞ্জার। গল্প লণ্ডনের এক নির্জন পল্লির সিনেমা হলের দ্বাররক্ষীকে নিয়ে। যাদের বলে আশার। গল্পের আশারটির হঠাৎ আলাপ হয়েছে নাইট শোয়ে ছবি দেখতে আসা এক পরমাসুন্দরী তরুণীর সঙ্গে। সেদিন বাইরে বেশ বৃষ্টি, হলে লোকজন খুবই কম। শো শেষে হল বন্ধ করে আশার ছেলেটি বাড়ি ফেরার পথে সঙ্গী সুন্দরী মেয়েটির। ওরা বাসস্টপে এসে দাঁড়াল। মৃদু রোমান্টিক কথোপকথনে একে উভয়ের প্রতি খুব টান অনুভব করতে লাগল। একসময় বাস এল এবং বাসে চড়ে ছেলেটির খুব শখ হল মেয়েটির বাড়ি দেখে আসে। সে কথা তুলতে মেয়েটিও আপত্তি করল না, বরং একটু যেন খুশিই হল। অতঃপর যে স্টপে এসে ছেলেটির হাত ধরে মেয়েটি নামল সেও এক অত্যন্ত নির্জন, নিবু নিবু আলোর এলাকা। মেয়েটি পা চালিয়ে ঢুকে পড়ল একটা বাগানে, সম্ভবত বাড়ির পথ শর্টকাট করতে। ছেলেটিও এল পিছন পিছন। হঠাৎ মেয়েটি পরনের স্কার্ট সামলে বসে পড়ল একটা পাথরের ওপর। ভাবখানা এমন যেন রাত তো সবেই শুরু, আরেকটু প্রণয়ের সময় নিশ্চয়ই পেরিয়ে যায়নি। আর এমন একটা ভাব কোনো যুবকের মনে পুলক সঞ্চার না করে পারে? ছেলেটিও বসল মেয়েটির পাশে, দু-জনে আলিঙ্গনাবদ্ধ হল। দুজন দুজনকে চুম্বনে ভরিয়ে দিতে থাকল। তারপর হঠাৎই মেয়েটির মনে পড়ল যে বড্ড দেরি হয়ে গেছে, এবার বাড়ি ছোটা দরকার। সে নতুন পাওয়া বন্ধুটিকে বলল, এবার আমি যাব। তার আগে আমায় আরও একটা চুমু দাও, অচেনা বন্ধু। ছেলেটি তার ঠোঁটে ফের চুম্বন করল এবং তার পরমুহূর্তে মেয়েটি যে পাথরটার ওপর বসেছিল সেটা এক হাতে তুলে তার মধ্যে সেঁধিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল। ওই কবরের পাথরের নীচেই তার বাস!
বারো বছর বয়সে ভয়ানক শিহরণ হয়েছিল গল্পটা পড়ে এবং মনের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছিল মেয়েটার চেহারা, তার রূপ, তার পাথরের নীচে হারিয়ে যাওয়া। এইসব ভাবতে ভাবতে কিংবা ভয়ে কিছুটা অবশ হয়েই হয়তো ঘুমে ঢুলে পড়েছিলাম। কতক্ষণ ঢুলেছিলুম তাও বলতে পারব না, আর ওই ঢুলুনি হয়তো সহসা কাটত না যদি-না বাড়ির রাঁধুনি বড়োঠাকুরদা একতলা থেকে জোরসে চিল্লিয়ে উঠত, সাহেব, খাবে এসো। মাংস তৈরি হয়ে গেছে। বোঠাকুরদার হাঁকে যেই চোখ খুলেছি, দেখলাম গল্পের নায়িকার সেই সুন্দর সাদা হাত, অনামিকায় একটা লাল চুনি, আস্তে করে আমার পড়া পাতাটা উলটে নতুন গল্পে পৌঁছে দিল আমায়। আমি স্পষ্ট দেখলাম সেই হাত, আর ওইটুকুই। তারপর হাতটা যে কোথায় গেল আমি জানি না। আমার মনে পড়ে ভূতে পাওয়া বইটাকে গরম ইটের মতো কোনোমতে হাত থেকে ছুড়ে ফেলে আমি দুদ্দাড় করে বাঁকানো, অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলাম নীচে। আমার মুখ-চোখের কী ভাব ছিল জানি না, কিন্তু আমাকে দেখামাত্র বড়োঠাকুরদা বলে উঠল, কী সাহেব, এত ভয় পেয়েছ কেন? কী হয়েছে?
আমার এই গল্প জোজিকে বলতে সাহসই হয় না, কারণ এতে জোজির মনের মতো কোনো ভূত নেই। বললে বলবে, তুমি ভীতু, তাই এমনি এমনি ভয় পেয়েছ। আর আমার দ্বিতীয় গল্পটা শুনে হয়তো হেসেই উঠবে। ভূত নেই, অথচ ভয় পাওয়াটা ও একদম পছন্দ করে না। বস্তুত, ভূতকে ও সবসময় যথেষ্ট ভয়ডর করে না। ভূত দেখে আনন্দ পায়, এই যা!
আমার দ্বিতীয় কাহিনির পটভূমিও ওই চিলেকোঠা। সেও এক সন্ধ্যা, আমি আপন মনে কী একটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম তখন। ওখানে বসে থাকার বা ওখান থেকে নেমে আসার কোনোই কারণ ছিল না, ফলে আমি কেন যে ওখানে ছিলাম কিংবা কেন যে একতলায় নেমে আসছিলাম না তার কোনো হদিশও এতদিন পর আমি দিতে পারব না। আর এই রকম অনির্দিষ্টভাবে, অহেতুক বসে থাকলে মনটাও যে কোথায় উড়ে যায় তা বলা মুশকিল। আমার মন কোথায় ছিল আমি জানি না। হঠাৎ ‘সাহেব! সাহেব!’ বলে আমার বাবার কণ্ঠের ডাক। কী ভীষণ পুলক হল মনে বাবা ডাকছে! আমার একবারটি মনেও পড়ল না যে বাবা বছর তিনেক হল গত হয়েছেন। ছাদ থেকে বাবার এই ডাক আমার এত প্রিয় ও পরিচিত যে,আমি ভাববারও অবসর পেলাম না ডাকটা সত্যি কার। আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুট লাগিয়ে অন্ধকার, ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলাম এক নিমেষে। সন্ধ্যা নেমেছে, অথচ বাড়ির কোথাও কোনো আলো জ্বলেনি। নীচের যে চাতালে দাঁড়িয়ে বাবার ডাকার কথা, সেখানটাও অন্ধকার এবং বাবা নেই। বাবা যে ওখানে থাকতে পারে না একবারও মাথায় এল না। আমি একের পর এক ঘরে ঢুকে দেখতে লাগলাম বাবা কোথায়। বাবা তো কোথাও নেই-ই, আমি ছুটোছুটি করে ক্রমশ আবিষ্কার করতে থাকলাম যে, বাড়ির সব ঘরই খাঁ খাঁ করছে, একটিও মানুষ কোথাও নেই। মা নেই, কাকা নেই, দাদা-দিদিরা নেই, কাজের একটা লোকও নেই। বাইরের কোনো অতিথিও এসে কোথাও বসেননি। আর ঠিক তখনই আমার খেয়াল হল যে, বাবার তো সত্যি কোথাও থাকা সম্ভব নয়। বাবা তো অনেকদিনই নেই। আর তখনই আমার শিরদাঁড়া দিয়ে ভয়ের সেই শীতল হাওয়াটা ওঠা-নামা করতে লাগল। ভয় পেলে ঠাকুরের নাম নিতে হয় জেনে আমি ছুট্টে গেলাম বাড়ির ঠাকুরঘরে। আর সেখানকার দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলাম মেঝেতে অচৈতন্য হয়ে পড়ে আছে মা। বাবার মৃত্যুর পর থেকেই মা-র এই অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার হিস্টিরিয়া রোগ। মাঝেমধ্যেই হয় বলেই আমরাও ততদিনে জেনে গিয়েছিলাম কী করে মা-র জ্ঞান ফেরাতে হয়। হয় কাকার আলমারি থেকে স্মেলিং সল্ট-এর শিশিটা এনে নাকের কাছে ধরতে হবে নয়তো পুরোনো জুতো ধরতে হবে নাকের অদূরে আর নয়তো ন্যাকড়া পুড়িয়ে ধোঁয়া ঘোরাতে হবে মুখের আশেপাশে। মাকে অজ্ঞান দেখে মুহূর্তের মধ্যে আমার সব ভয় উবে গেল। আমি জ্বলন্ত প্রদীপের আগুন থেকে পাশে পড়ে থাকা সলতে ন্যাকড়া পুড়িয়ে মা-র নাকের কাছে ধরলাম। একটু বাদে মা-র জ্ঞান ফিরল আর তার একটু বাদে কাকার পাম্প শু-এর মচ মচ শব্দ পেলাম। কাকা আপিস থেকে বাড়ি ফিরল। কিন্তু আজ অবধিও আমি জানি না ‘সাহেব! সাহেব’ বলে বাবার কণ্ঠের ওই ডাকটা ছিল কার!
