খটাস করে দরজা খুলে গেল আমার চিন্তার মধ্যে। হাতে একটা লম্ফ নিয়ে এক বৃদ্ধা, যাকে এতকাল পরেও, চেহারা ও চুলের সমস্ত পরিবর্তন সত্ত্বেও আমার রুক্মিণী বলে চিনতে অসুবিধা হল না। আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, তার আগেই ও বলল, আইয়ে ডাগডারসাব, আপহি কা ইন্তেজারমে থে হাম। রেচেলকা বিমারি আউর ভি বঢ়ি।
বুঝলাম বেচারি রুক্মিণীর দৃষ্টিশক্তি গেছে, এই অন্ধকারে স্যুট-পরা, অ্যাটাচি হাতে আমাকে ডাক্তার ঠাউরেছে। আমি নিঃশব্দে ওর পিছন-পিছন গেলাম। খুব ইচ্ছে করছিল ওকে জিজ্ঞেস করি, এ বাড়ি ভাঙা হলে তোমরা কোথায় যাবে? কিন্তু তার আগে ওই জিজ্ঞেস করে বসল, ডাগডারসাব, ক্যা ইয়ে সচ হ্যায় কি ইয়ে মকান তোড়া যায়েগা! বললাম, তাই তো শুনেছি। তোমরা কিছু শোননি?
আমরা করিডর তখনও শেষ করিনি, রুক্মিণী ঘুরে দাঁড়িয়ে কাঁদতে শুরু করল, সাব আপ হি না বোলে থে কি রেচেল বিটিয়া কি জিন্দেগি খতম হোনেওয়ালি হ্যায়। জেয়াদা সে জেয়াদা দো মহিনা?
আমি ঘেমে উঠেছি ওই শীতের মধ্যেই। আমি তো কিছুই জানি না এসব। অথচ কৌতূহলে আনচান করছে মনটা। লাঠি না ভেঙে সাপ মারার জন্য বললাম, তো?
রুক্মিণী বলল, অব তো ও বঁচেগি নহি ডাগডারসাব।
বললাম, কেন?
—সুবহে নিউজপেপার পড়কর বিলকুল থক গয়ি বিটিয়া।
সর্বনাশ! আমি ভিতরে ভিতরে শিউরে উঠলাম। রেচেল তাহলে জেনে গেছে এ বাড়ির পরমায়ু ফুরিয়ে গেছে।
হঠাৎ পাশের ঘর থেকে শব্দ এল গরর গরর। যেন কোনো বেড়াল গজরাচ্ছে। রুক্মিণী বাতি নিয়ে পথ দেখিয়ে আমায় ঢুকিয়ে নিয়ে গেল ঘরটায়। লাল কাপড়ের শেড দেওয়া টেবিলল্যাম্পের আলোয় দেখলাম বিছানায় গুটিয়ে একটা বৃহৎ বিড়ালির মতো বসে রেচেল। কুটি কুটি করে ছিঁড়ে খবরের কাগজটার উপর হাত দুটোকে থাবার মতো করে চেপে ধরে গর্জে যাচ্ছে মহিলা। আরও স্পষ্ট করে নজর করতে বুঝলাম আমার ভুল হয়েছে, বিড়ালি নয়, সাক্ষাৎ বাঘিনির মতো নিজের আলো-আঁধারি জুড়ে বসে আছে রেচেল।
আমি স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে পড়েছি। দেখি মেয়েটার সেই কোঁকড়া, কালো চুল সব ফুরফুরে সাদা হয়ে গেছে। চুল ঝরেও গেছে বিস্তর, ফলে কদমফুলের চেহারা নিয়েছে ওর মাথা। হাতের আঙুল সরু, লিকলিকে লম্বা হয়ে গেছে, তাদের নখগুলোও অস্বাভাবিক ধারালো ও লম্বা। মুখে ভাঁজ বিশেষ পড়েনি রেচেলের, কিন্তু স্তন দুটি শুকিয়ে মিলিয়ে গেছে পাঁজরে। ওর বসার ভঙ্গিও মানুষের মতো নয়, উবু হয়ে যেন নিজেকেই পাহারা দিচ্ছে জগতের লোক। আর ওর ওই দুই চোখ! সম্পূর্ণ বাঘিনি মায়া তাতে, কেবল পূর্বের সেই হিংস্রতায় জায়গায় এসেছে আতঙ্ক আর ভয়। আমাকে দেখে ভয়েও গর্জন করতে লাগল, ও তো আর আমাকে ডাক্তার বলে ভুল করছে না।
আমি ওকে শান্ত করার জন্য স্নেহের স্বরে ডাকলাম, রেচেল!
—রেচেলও ফের মৃদু গর্জন করল, গরর, গরর।
ফের ডাকলাম রেচেল!
-গরর! গরর!
-রেচেল!
-গরর!
গরর! পিছন থেকে রুক্মিণী বলল, আজ সুবহসে উসকি বাত বন্ধ হো চুকি হ্যায়। সির্ফ ইয়েহি আওয়াজ নিকল রহা হ্যায়।
জানি না হঠাৎ কী দুর্মতি হল আমার, আর নাম ধরে না ডেকে ওর নকলে গরর আওয়াজ দিলাম।
রেচেল যেন ঘাবড়ে গেল। একটু চুপ করে থেকে ফের একটু যেন আদুরে স্বরে ডাকল গরর!
আমি ফের ডাকলাম গরর! যেন খেলায় মেতেছি। দেখলাম একটা হাসির ঝিলিক ওর ঠোঁটে।
আমি এক পা, দু পা করে এগোলাম ওর দিকে। আস্তে করে হাতের অ্যাটাচি কেসটা নামিয়ে রাখলাম মাটিতে। তারপর এগোচ্ছি…
হঠাৎ বিকট আওয়াজ করে একেবারে বাঘিনির মতো রেচেল লাফ দিলে আমার শরীর লক্ষ করে। আমি কিছু বোঝার আগেই ওর দেহটা এসে পড়ল আমার উপর, আর ওকে নিয়েই আমিও ছিটকে পড়লাম মাটিতে। কিন্তু কই, আমার তো লাগল না। মেয়েটার শরীরের কোনো ওজনই টের পেলাম না। মানুষ নয়, একটা বড়োসড়ো বেড়ালের ওজন। মাটিতে মোচড়ানো কান্না। আমি মহিলার মাথায় সস্নেহে হাত বুলোতে বুলোতে বললাম, ডোন্ট ক্রাই ডিয়ার, আই উইল টেক কেয়ার অফ ইউ।
রেচেল আমার কোলে ছোট্ট শিশুর মতো সঙ্কুচিত হয়ে যেতে যেতে ধ্বনি তুলল—গরর।
ওর শরীরে উষ্ণতা আর চোখের জলের ছোঁয়া পাচ্ছি আমি, আমার ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। আমি শুধু বলতে পারছি গরর! রেচেল আমাকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরছে, গরর ধ্বনি তুলতে গিয়ে দম ফুরিয়ে এল ওর। বুঝলাম রুক্মিনী বলছে, সাব কুছ কিজিয়ে! বিটিয়া কা দম নিকল রহা হ্যায়।
কিন্তু আমি কী করব! আমি তো ডাক্তার নই। রুক্মিণীকে বললাম, এখানে ওর চিকিৎসা হবে না, ওকে হাসপাতাল নিয়ে যেতে হবে। এসো, আমার সঙ্গে এসো।
বলে রেচেলকে কোলের শিশুর মতো আগলে ধরে ঘন অন্ধকারের মধ্যেই দুদ্দাড় এগোচ্ছ সিঁড়ির দিকে। মিন্টো রো-টা পার করলেই তো ক্যাম্বেল হসপিটাল। যন্ত্রণায় বুক মোড়াচ্ছে আমারও, কিন্তু তাও কোথায় যেন এক অব্যক্ত আনন্দ। আমার কোলে এই মুহূর্তে রেচেল, থুড়ি বাঘিনি, থুড়ি স্বপ্ন। আমার সমগ্র বাল্য-কৈশোরকে বুকে ধরে আমি অন্ধকারে এগোচ্ছি, বাঘিনির কোনো সাড়াশব্দ নেই। পিছনে শুধু কান্না জুড়ে দৌড়োতে দৌড়োতে আসছে রাতকানা রুক্মিণী।
বিউটি পার্লারে ভূত
জোজি আমার পাঁচ বছর পাঁচ মাসের মেয়ে। আর এই বয়সের মধ্যেই ওর বাবার থেকেও ঢের বেশি ভূত ও দেখে ফেলেছে। ছেলেবেলায় আমার নিজেরও ভূত দেখার একটা বদভ্যাস ছিল। বয়সে বয়সে সেইসব ভূত জীবন থেকে সরে গেছে, তাদের কিছু কিছু স্মৃতি হয়তো এখনও ভাঙা খেলনার মতো মনের কোণে, গর্তে অনাদরে শুকিয়ে পড়ে আছে। জোজি যখন ওর ভূতগুলোর কথা রসিয়ে রসিয়ে শোনায় আমাকে আমার ভেতরটা কীরকম চিনচিন করে, বালিকাটিকে আমি হিংসে করতে শুরু করি। জোজি জানে না, ও শুধু জানে বাবা অফিস থেকে ফিরে ওর সেদিনকার দেখা ভূতটার কথা জানার জন্য গা-হাত-পা ধোয়া আর রাতের খাওয়ার মাঝখানে একটা ঘণ্টা সময় বার করে নেবেই। খাওয়ার আগে কাহিনি শেষ না হলে রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়েও বাকি অংশ শোনা চলবে। কোনো কোনো গল্পের খেই হারিয়ে ফেলে জোজি, তখন আমিই বিবেচনামাফিক সেইসব ঘটনার জোগান দিতে থাকি। গল্প খুব ভীতিপ্রদ হয়ে উঠতে থাকলে পাশে শোয়া জোজির মা বলে ওঠে, দেখো, তোমরা আর ভয় বাড়াবে না। আমার ভারি টেনশন হয়, ঘুম নষ্ট হয়। জোজির মা এভাবে আত্মসমর্পণ করলে আমরা দু-জনাই ভেতরে ভেতরে ভয়ানক তৃপ্তি বোধ করি এবং ৬০০ রান করা ক্রিকেট দলের ক্যাপ্টেনের মতো কিছুটা করুণা, কিছুটা তাচ্ছিল্যের ভাব নিয়ে গল্পের ইনিংস ডিক্লেয়ার করে দিই সে-রাতের মতো।
